গাড়ির ভেঁপু

তপন দেবনাথ | আপডেট: | প্রিন্ট সংস্করণ

আজব শহর ঢাকা। এই শহরে অনিয়ম এতটা বেড়েছে যে নিয়মগুলো এখন খুঁজে পাওয়া দায়। জীবন যন্ত্রণার আর এক নাম হলো গাড়ির তীব্র শব্দের ভেঁপু। কোনো কারণ ছাড়াই চালকেরা অবিরত ভেঁপু বাজান। এবার বিদেশ থেকে দেশে গিয়ে আমি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে বিনা প্রয়োজনেই চালকগণ ভেঁপু বাজাতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছেন। চালকদের এই অজ্ঞতা অথবা ভয়ংকর আনন্দ পরিবেশ, অন্য মানুষের এমন কি তার নিজের জন্যও কতটা ক্ষতিকর সে সম্পর্কে তাদের সামান্যতম কোনো ধারণাও নাই। এ ক্ষেত্রে আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলছি।

কেস স্টাডি-১: সোনারগাঁও সিগন্যাল। লাল বাতি জ্বলছে। সবুজ বাতি না জ্বলা এবং সামনের গাড়ি না চলা পর্যন্ত পেছনের গাড়ি চলার কোনো সুযোগ নেই। অনেক পেছনে থাকা আমাদের গাড়ির চালক বারবার ভেঁপু বাজাচ্ছিলেন। কৌতূহলবশত জানতে চাইলাম, ভাই গাড়ি তো আপনার সিগন্যালে পড়েছে। সিগন্যাল না পড়লে এবং সামনের গাড়ি চলতে শুরু না করা পর্যন্ত তো আপনি যেতে পারবেন না। তা হলে অকারণে ভেঁপু বাজাচ্ছেন কেন? চালক তাচ্ছিল্যভাবে হেসে বলল, অভ্যাস হয়া গেছে। হর্ণ না বাজাইয়া কি করমু?

কেস ষ্টাডি-২: নিউ ইস্কাটন এলাকা। হরতালের আগের রাত। বিকট শব্দে হাইড্রোলিক ভেঁপু বাজিয়ে একটি পাঁচটনি ট্রাক মগবাজার থেকে বাংলামোটর হয়ে বিমানবন্দর সড়কের দিকে যাচ্ছে। ভেঁপুর বিকট শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত তিনটা। বিছানা থেকে উঠে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম রাস্তায় একটি গাড়ি বা একজন মানুষও নেই। তবে চালক কেন এত উচ্চশব্দে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে গেল? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। আর ঘুমাতে পারলাম না। তখন কেস ষ্টাডি-১-এর চালকের কথা মনে পড়ল। অভ্যাস হয়া গেছে। হর্ণ না বাজাইয়া কী করমু?

গভীর উদ্বেগ বা পাগলামি যা-ই বলুন গাড়ির নম্বর প্লেট খেয়াল করলে সরকারি বা বেসরকারি গাড়ি চেনা যায়। এবার ঢাকায় গিয়ে সরকারি গাড়ির চালক এমন কি সরকারি স্টাফ বাসের চালকগণকেও একইভাবে বিনা কারণে ভেঁপু বাজাতে দেখেছি। এ বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই নাকি অভ্যেস হয়ে গেছে তা বলা মুশকিল।

পরিবশে অধিদপ্তরের ২০০৬ সালের এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র রয়েছে। তা মনে হয় কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। ভেঁপুর সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ২৫ ডেসিবল কিন্তু তা বাজানো হয় ১৮০ ডেসিবল। পরিমাণটা কত বেশি তা আপনারাই অনুমান করুন।

একজন পথচারীকে সতর্ক করার জন্য সাড়ে সাত মিটার দূর থেকে ভেঁপু বাজানোর নিয়ম থাকলেও সাড়ে সাত মিটারে কত মাইল বা কত গজ তা আমাদের বেশিরভাগ চালকদের জানা নেই। ফলে তারা পথচারীর খুব কাছে এসেই ভেঁপু বাজান। শুনতে হাস্যকর মনে হলেও গাড়ি চলন্ত অবস্থাতেও চালকগণ মনের সুখে ভেঁপু বাজাতেই থাকে। এর সঙ্গে ইঞ্জিনের শব্দ যোগ হয়ে ঢাকা এখন একটি শব্দের নগরীতে পরিণত হয়েছে।

অতি সম্প্রতি পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। তাতে ঢাকা শহরে সহনীয় মাত্রার দুই গুন বেশি শব্দদূষণের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যায় যে নীরব এলাকা হিসেবে পরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অফিস এলাকায় যেখানে দিনের বেলায় শব্দের সহনীয় মানমাত্রা ৫০ ডেসিবল থাকার কথা, সেখানে সর্বনিম্ন মাত্রা ৮৪ ডেসিবল। দিনের বেলায় রাজধানীর নীরব এলাকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের সড়কে শব্দের মাত্রা ১০৪ ডেসিবল। ঢাকা শিশু হাসপাতালের কাছে এর মাত্রা ৯৫ ডেসিবল। আবাসিক এলাকায় রাতে সহনীয় মাত্রা ৪৫ ডেসিবল হলেও ধানমন্ডি এলাকায় এর মাত্রা ৮৪ ডেসিবল।

সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ দূষণের ফলে ঢাকা শহরের মানুষের শ্রবণ শক্তি ইতিমধ্যে হ্রাস পেয়েছে। আমার এই অভিমত সত্য কিনা তা গ্রামে বাস করে এমন একজন মানুষের সঙ্গে ঢাকা শহরে বাস করে এমন একজন সমবয়সী মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা পরীক্ষা করলেই আমার কথার সত্যতা পাওয়া যাবে। শব্দদূষণ নীরবে আমাদের শ্রবণ শক্তি হ্রাস করার পাশাপাশি হূদরোগসহ নানা জটিল সমস্যা তৈরি করছে। এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

 

লস আ্যাাঞ্জেলেস, আমেরিকা

<tapan1970@netzero.com>

পাঠকের মন্তব্য ( ৩ )

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনি কি পরিচয় গোপন রাখতে চান
আমি প্রথম আলোর নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
View Mobile Site
   
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোনঃ ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্সঃ ৯১৩০৪৯৬, ই-মেইলঃ info@prothom-alo.info
 
topউপরে