ভালোর আলোয় আবর্তন

মুরাদুল ইসলাম | আপডেট: | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্কুল, সেনাবাহিনী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আছে শৃঙ্খলা। স্কুল ও সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা বজায় থাকে বিদ্যমান শাসন ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তি থাকায়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলার কারণ পরকালভীতি। কিন্তু কোনো শাসন, শাস্তি বা পরকালভীতি ছাড়াই মানুষ যখন ব্যক্তিচর্চায় সমাজের সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা তৈরি করে, তখন সেটা অনুকরণ করতে ইচ্ছা করে।

সেই অনুকরণীয় শৃঙ্খলা গড়ে উঠেছে ফিলিপিনোদের জীবনযাত্রায়। ট্রেন স্টেশন, বাস টার্মিনাল, জিপ স্ট্যান্ড, অফিস-আদালত, এটিএম বুথসহ সবখানে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে পালন করে শৃঙ্খলা। বাসে, জিপে বা ট্রেনে আগে ওঠার জন্য নেই কোনো হুড়োহুড়ি। নেই কোনো পেশিশক্তির ব্যবহার। নেই কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিচয়। সবাই আগে এলে আগে পাবে নীতিতে বিশ্বাসী।

একের অধিক যাত্রী গণপরিবহনের কোনো স্টপেজে গন্তব্যের জন্য অপেক্ষা করলেই একজন আরেকজনের পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যায়। এ জন্য লাঠি হাতে কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না। অধিকাংশ এটিএম বুথে নেই নিরাপত্তা প্রহরী। একের অধিক উত্তোলনকারী হলেই একজন আরেকজনের পেছনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। অফিস-আদালত, ব্যাংক, এমনকি কিছু দোকানের প্রবেশদ্বারে রাখা থাকে নম্বর। যে যখন প্রবেশ করবে, নিজ হাতে একটি নম্বর কার্ড নিয়ে ঢুকবে। অপেক্ষা করবে তাঁর নম্বরটির ডাকের জন্য।

ফিলিপাইনে স্বল্পদূরত্বে যাতায়াতের জন্য জিপ গাড়ি প্রধান বাহন। তাতে চালক ছাড়া আর কেউ থাকেন না ভাড়া আদায়ের জন্য। যাত্রীরা নিজেরাই হাত বাড়িয়ে ভাড়া দেয় চালকের হাতে। ছাত্র ও বয়স্করা তাঁদের কার্ড দেখিয়ে ছাড়কৃত বিশেষ ভাড়ার সুবিধা ভোগ করেন। বাস বা জিপে ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষির দৃশ্য অকল্পনীয়। আমি ফিলিপাইনে আছি সাত বছর। একটিবারের জন্যও কাউকে দেখিনি ভাড়া নিয়ে কেউ তর্ক করছে বা পরে এসে আগে যাওয়ার সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

শৈশব-কৈশোর থেকেই তারা দেখছে—এটাই নিয়ম। অনুরোধ বা ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিয়ম ভাঙাও তাদের জন্য লজ্জার। এটা তারা শিখেছে পরিবার থেকে, পরিবার শিখেছে অন্য কোনো দেশের কাছ থেকে। বিপুলসংখ্যক ফিলিপিনো কাজের জন্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। অর্থ আয়ের পাশাপাশি তাঁরা নিজেদের সমৃদ্ধ করছে অন্য দেশের ভালো কিছু শিক্ষা ও অভ্যাস রপ্ত করে।

ফিলিপিনোদের মতো না হলেও আমরা বিপুল বাংলাদেশি কর্মরত আছি পৃথিবীর অনেক সভ্য দেশে। প্রতিটি জাতিরই কিছু না কিছু ভালো গুণ থাকে। অন্তত তাদের আচার-আচরণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সততা ইত্যাদি আমরা অনুকরণ বা অনুসরণ করতে পারি। এসবের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি নিজ পরিবারে। আমরা যারা প্রবাসী, তারা শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়; সব ক্ষেত্রেই আমাদের মাতৃভূমিকে গড়ে তুলতে পারি পৃথিবীর কাছে অনুকরণযোগ্য হিসেবে। আর এ জন্য শুরু করতে হবে নিজ নিজ পরিবার থেকে। একবার ভেবে দেখুন, আমরা এই বিপুল প্রবাসী জনগণ যদি আমাদের নিজ নিজ পরিবারকে শৃঙ্খলাপূর্ণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সততায় গড়ে তুলতে পারি, তাহলে আমার-আপনার পরিবার থেকে এই ভালোটা বিস্তার করবে পাশের পরিবারে। তারপর একদিন পুরো সমাজ, দেশ আবর্তিত হবে এই ভালোর আলোয়।

 

কনসালটেন্ট, কার্ড এসএমই ব্যাংক ইনক, ফিলিপাইন

<murad_8226@yahoo.com>

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনি কি পরিচয় গোপন রাখতে চান
আমি প্রথম আলোর নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
View Mobile Site
   
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোনঃ ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্সঃ ৯১৩০৪৯৬, ই-মেইলঃ info@prothom-alo.info
 
topউপরে