শ নি বা রে র বিশেষ প্রতিবেদন

বিতর্কচর্চার ফেরিওয়ালা

বরুন রায়, বেড়া (পাবনা) | আপডেট: | প্রিন্ট সংস্করণ

সঞ্চালকের টেবিলে ওমর সরকার। চলছে যুক্তি-পাল্টাযুক্তির লড়াই। ১২ জুলাই তোলা ছবি ষ প্রথম আলোপাবনার বেড়া পৌর এলাকার ভাঙাচোরা একটি ছাপরাঘর। প্রতি শুক্রবার সকালে দলে দলে ছেলেমেয়েরা ছুটে আসতে থাকে ঘরটিতে। প্রচলিত অর্থে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে নয়, তারা বসে যুক্তির লড়াইয়ে, বিতর্কচর্চার আসরে। কেটে যায় তিন-চার ঘণ্টা। যুক্তি পাল্টা-যুক্তির বিচ্ছুরণে আলোকিত হয়ে ওঠে মলিন ঘরটি।
এই ঘর ওমর সরকার নামের নিবেদিতপ্রাণ এক শিক্ষকের। তাঁর টানেই ছুটে আসে ছেলেমেয়েরা। সাত বছর ধরে তিনি খুদে শিক্ষার্থীদের মেধা শাণ দেওয়ার কাজটি করে চলেছেন, বিনা পয়সায়।
এরই মধ্যে ওমর সরকারের শিক্ষার্থীরা আঞ্চলিকতা পেরিয়ে স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে জাতীয়ভাবে। মেধা-মনন আর সৃজনশীলতার এই লড়াইয়ে তিনি পাশে পেয়েছেন স্থানীয় সুধীজনকে। ওমর সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উত্তরের এই মফস্বল জনপদে তিনি বিতর্কের চর্চাকে জনপ্রিয় করতে পেরেছেন।
ছোটবেলার স্বপ্ন: ছোটবেলা থেকেই বিতর্কচর্চার প্রতি দুর্বলতা ছিল ওমর সরকারের। বেড়ায় এইচএসসি পর্যন্ত পড়ার পর ১৯৮৫ সালে ঢাকায় বাঙলা কলেজে ভর্তি হন তিনি। সেখানে সহপাঠী কয়েকজন বন্ধুকে বিতর্কচর্চায় আগ্রহী করেন। বিএসসি পাস করে কয়েক বছর ঢাকায় কাটানোর পর ১৯৯৯ সালে বেড়া উপজেলার আলহেরা একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এখানে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বিতর্কচর্চা নিয়ে কিছু করার ইচ্ছা জাগে তাঁর। বছর সাতেক আগে তাঁর স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থী এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। উৎসাহিত হন ওমর সরকার। প্রতি শুক্রবার সকালে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। সেই শুরু, তার পর থেকে প্রতি শুক্রবার সকালে তাঁর বাড়ির ছাপরাঘরটিতে নিয়মিত বসছে বিতর্কচর্চার আসর।

প্রথম পর্যায়ে ওমর সরকারের নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই শিখতে আসত। কিন্তু এখন পৌর এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তাঁর আসরে আসছে। সেখানে বিতর্কের নিয়মকানুন শেখানোর পাশাপাশি তিনি আয়োজন করেন বিতর্ক প্রতিযোগিতারও।

পুরো বিষয়টির আনুষ্ঠানিকতা দেওয়ার জন্য ওমর সরকার উপজেলার বিতার্কিকদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন বেড়া বিতর্কচর্চা কেন্দ্র। ইতিমধ্যেই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন উপজেলার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সুধীজনেরা। এই কেন্দ্রের উদ্যোগে দুই বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিতর্ক প্রতিযোগিতা।

চাঁদের হাটে: ১২ জুলাই শুক্রবার সকালে বিতর্কের ওই আসরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে যেন চাঁদের হাট বসেছে। ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী দুভাগে বিভক্ত হয়ে যার যার পক্ষে ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে চলেছেন। বিষয়: ‘গার্মেন্টস মালিকদের অবহেলাই সাভার ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী’। ভুল হলে বা তথ্য সংযোজনের প্রয়োজন হলে ওমর সরকার তা শুধরে দিচ্ছিলেন।

ওই আয়োজন শেষ হলে ওমর সরকার বলেন তাঁর কথা, ‘ভালো বিতার্কিক হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আমি তা হতে পারিনি। কিন্তু সেই হতাশা এখন আর নেই। কারণ, আমার অনেক ছাত্রছাত্রীই আজ ভালো বিতার্কিক। ওদের মধ্য দিয়েই আমার স্বপ্ন পূরণ হয়ে চলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিতর্কের ভিত্তিই হলো যুক্তি। যুক্তি মানুষের মেধা শাণিত করে, মননশীলতা বাড়ায়। বিতর্কচর্চায় অংশ নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের যুক্তি ও জ্ঞানের ভিত্তি মজবুত হচ্ছে।’

বেড়া বিবি উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী বশিতা বলে, ‘ওমর স্যারের এখানে এসে আজ আমি বলতে শিখেছি। এখন আমি পরীক্ষায় ভালো ফল করার পাশাপাশি ভালো বিতার্কিক হওয়ারও স্বপ্ন দেখি।’

ওরা আত্মবিশ্বাসী: ওমর সরকারের বিতার্কিকেরা বাংলাদেশ শিশু একাডেমী আয়োজিত মৌসুমি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দেশসেরা হওয়ার লক্ষ্যে লড়াই শুরু করে ২০১০ সালে। ওই বছর জেলা পর্যায়ে রানার্সআপ হয়ে ফিরে আসতে হয় তাদের। ২০১১ সালে জেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে রাজশাহী বিভাগীয় (আঞ্চলিক) পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ মেলে তাদের। কিন্তু সেখানেও রানার্সআপ হওয়ায় ঢাকায় যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় তারা। কিন্তু পরের বছর জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের বাধা ডিঙিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েই বাজিমাত করে তারা। এ বছরের (২০১৩) ২৬ ও ২৭ মে ঢাকা শিশু একাডেমীতে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় দেশসেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে তারা। এই দলের চার বিতার্কিক হলো তামান্না ইয়াসমিন, সামিয়া জামান, খাদিজাতুল খুশবু ও আফসানা আক্তার। ওরা সবাই আলহেরা একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। স্কুলের হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল তারা।

এই দলের দলনেত্রী তামান্না ইয়াসমিন বলে, ‘উপজেলা থেকে ঢাকা পর্যন্ত যেখানেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি, স্যার আমাদের সঙ্গে ছায়ার মতো থেকেছেন। তিনি সব সময়, এমনকি বাসের মধ্যেও আমাদের শিখিয়েছেন ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।’

আরেক সদস্য সামিয়া জামানের কথা, ‘বিতর্কচর্চা ও প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে অনেক বিতার্কিকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। আমি দেখেছি, যারা ভালো বিতার্কিক, তারা অবশ্যই মেধাবী শিক্ষার্থী। কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের সবাই ভালো বিতার্কিক নয়।’

ওমর সরকারের কাছে বিতর্কচর্চায় এ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিয়েছে শতাধিক শিক্ষার্থী। তাদের অনেকেই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা অধ্যয়নের পাশাপাশি বিতর্কচর্চা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে এবারই ভর্তি হয়েছেন বেড়ার কৃতী বিতার্কিক নাহরীন নওরোজ। সদস্য হয়েছেন বুয়েট ডিবেটিং ক্লাবের। তিনি বলেন, ‘যেকোনো স্থান ও পরিবেশে বিতর্ক করার মতো আত্মবিশ্বাস আমার আছে। ওমর স্যারই এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছেন।’

ছড়িয়ে পড়ুক: বেড়ার অভিভাবকদের কেউ কেউ মনে করেন, বিতর্কচর্চা করতে গিয়ে বাচ্চাদের পড়াশোনার ক্ষতি হতে পারে।

এ বিষয়ে ওমর সরকার বলেন, এটা একেবারেই ভুল ধারণা। বিতর্কচর্চায় মেধা আরও শাণিত হয়। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হতে এটি সহায়তা করে। বাড়তি বই পড়তে হয় বলে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, বিতর্কের মধ্য দিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

ওমর সরকারের একান্ত চাওয়া, বিতর্কের এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে। বিতর্ক হোক যুক্তির, বিতর্ক হোক সত্যের। যুক্তির আলোয় মুক্তি হোক তরুণ প্রজন্মের।

পাঠকের মন্তব্য ( ৬ )

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনি কি পরিচয় গোপন রাখতে চান
আমি প্রথম আলোর নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
View Mobile Site
   
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোনঃ ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্সঃ ৯১৩০৪৯৬, ই-মেইলঃ info@prothom-alo.info
 
topউপরে