সব

আফসানার ঢাকা থেকে খুলনা

শেখ আল-এহসান, খুলনা
প্রিন্ট সংস্করণ

আফসানা মিমি। ছবি: প্রথম আলোগাড়ি চালিয়ে ঢাকা-খুলনা-ঢাকা অনায়াসেই যাতায়াত করেন আফসানা মিমি। বর্তমানে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করছেন। এখন আছেন খুলনা জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে। এর আগে আফসানা গাড়ি চালাতেন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায়। সংস্থাটির খুলনা কার্যালয় ছিল তাঁর কর্মস্থল। এর আগে কাজ করেছেন ঢাকায়, ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে।
আফসানার বাড়ি খুলনা নগরের আড়ংঘাটা এলাকায়। ২০০৪ সালে মাধ্যমিক পাস করেছেন আড়ংঘাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে। উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিলেন খুলনার দিবা-নৈশ কলেজে। কিন্তু পরীক্ষার আগে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আর পড়াশোনা করা হয়নি।
আফসানার সংগ্রাম শুরু বিয়ের পর থেকেই। ছাত্রী থাকার সময়ই গোপালগঞ্জ সদরের মো. হাসানুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয় আফসানা মিমির। হাসান ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প বেতনে চাকরি করতেন। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকদের ভুল-বোঝাবুঝিতে সম্পর্কের অবনতি হয়। এরপর ঢাকায় স্বামীর কাছে চলে যান তিনি। কিছুদিন পর ফিরে আসেন খুলনায়।
খুলনায় এসে ব্র্যাকের অ্যাডোলোসেন্ট ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির আওতায় শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ শুরু করেন আফসানা। স্বেচ্ছাশ্রমে করা ওই কাজে আড়ংঘাটা এলাকার দলনেতা ছিলেন তিনি। ২০১২ সালে ভাগ্য খুলতে শুরু করে। সে সময় ব্র্যাকের খুলনার এরিয়া ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন তাঁকে প্রস্তাব দেন ঢাকায় ব্র্যাকের সহায়তায় ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেওয়ার। রাজি হয়ে যান আফসানা। কিন্তু বেঁকে বসেন আফসানার মা নাহার বেগম। তবে বাবা মো. আলকাজ উদ্দীন হাওলাদার ও স্বামী রাজী থাকায় গাড়ি চালানো শেখেন ঢাকার ব্র্যাক কার্যালয় থেকে। ওই দলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে একসঙ্গে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেন ২১ জন নারী। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা ড্রাইভিং লাইসেন্সও পেয়ে যান।
আফসানা বলেন, ‘প্রশিক্ষণের পর বাড়ি চলে আসি। পাঁচ দিন পর ব্র্যাক ব্যাংক থেকে চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ডাকা হয়। পরীক্ষায় টিকে যাওয়ায় শুরু হয় প্রথমে ব্যাংকের হয়ে গাড়ি চালানো।’
চাকরি হওয়ার পর অনেকে নানা রকম কটু কথা বলেছে, কিন্তু দমে যাননি আফসানা মিমি। স্বামীর সহযোগিতায় ২০১২ সালের অক্টোবরে ব্যাংকের গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। ‘প্রথম থেকেই ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালাতে কোনো অসুবিধা হয়নি।’ বললেন আফসানা। ব্যাংকের হয়ে ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গাড়ি চালান আফসানা। তখন ১৪ আসনের টয়োটা হাই এস গাড়ি চালাতেন তিনি। এরপর পরীক্ষার মাধ্যমে ইউনিসেফে গাড়িচালক হিসেবে নিয়োগ পান। প্রথমে ঢাকায় থাকলেও পরে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয় খুলনা কার্যালয়ে। পরের বছর এপ্রিল পর্যন্ত সেখানেই চাকরি করেছেন।
আফসানা বলেন, ‘ইউনিসেফে চাকরি করার সময় গাড়ি নিয়ে ঢাকা-খুলনা করেছি বহুবার। গিয়েছি দেশের বহু দূরবর্তী এলাকায়ও। কখনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। আর সেখানে মাসে কমপক্ষে ১০ দিন বাইরে থাকতে হতো।’
২০১৫ সালে নির্বাচন কার্যালয়ে ড্রাইভার নিয়োগ দেওয়া হবে এমন বিজ্ঞপ্তি দেখে সেখানে আবেদন করেন আফসানা। টিকেও যান পরীক্ষায়। ওই বছরের ২ মে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ড্রাইভার হিসেবে যোগদান করেন তিনি। প্রথমে কয়েক মাস সেখানে থাকলেও সেপ্টেম্বরে বদলি করে পাঠানো হয় খুলনা জেলা কার্যালয়ে।
আফসানা বলেন, ‘গাড়ি চালাতে শুরু থেকেই ভালো লাগত। প্রথমে সবাই আমাকে হাঁ করে দেখত। মুরব্বিরা কেউ ভালো বলতেন, কেউ খারাপ। তবে ধীরে ধীরে সমস্যা কেটে গেছে। ঢাকায় সবাই এখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই নেয়। কিন্তু খুলনার রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হলে সবাই তাকিয়ে থাকে। অনেকে আমাকে দেখতে এগিয়ে আসে। কত দিন ধরে গাড়ি চালাই, বাড়ি কোথায় জানতে চায়। বাড়ি খুলনায় শুনে কেউ খুশি হয়, আবার কেউ বলে যে এখানকার মেয়েদের এটা মানায় না।’
বাগেরহাট জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের গাড়িচালক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘নারী-পুরুষের সমান অধিকার হিসেবে একজন নারী সহকর্মী পেয়ে আমরা গর্বিত। তাঁর গাড়ি চালানো দেখেছি। গাড়ি চালানোতে তিনি অনেক দক্ষ। সম্প্রতি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে অনুষ্ঠিত উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদের উপনির্বাচনে বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি চালিয়ে গেছেন তিনি।’ আফসানা সম্পর্কে খুলনার জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ইউনুছ আলী বলেন, অন্য দক্ষ চালকদের চেয়ে আফসানার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কম নয়।
আফসানার সাত বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। চাকরি করে খুলনায় ভাই-বোনের লেখাপড়াও করাচ্ছেন তিনি। স্বামীকে করে দিয়েছেন একটি ওষুধের দোকান। উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে না পারলেও এখন ইচ্ছা অন্তত উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার। তাঁর শেষ বক্তব্য, ‘সব মিলিয়ে এখন অনেক ভালো আছি।’

এখনো ঘুমের ঘোরে ‘মা, মা’ বলে কাঁদে বৃষ্টি

এখনো ঘুমের ঘোরে ‘মা, মা’ বলে কাঁদে বৃষ্টি

সাইবার জগতে থাকব নিরাপদ

সাইবার জগতে থাকব নিরাপদ

মন্তব্য ( ১ )

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

সাত সাহসী

সাত সাহসী

ওরা মেধাবী। ওরা যুক্ত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। যেখানেই বাল্যবিবাহের ঘটনা...
১৮ এপ্রিল ২০১৭
কালোই ছড়াচ্ছে আলো!

কালোই ছড়াচ্ছে আলো!

কপালে লাল টিপ আর পরনের লাল শাড়ি ঠিকই ছিল। কিন্তু খুলে নেওয়া হয়েছে কানের দুল ও...
১৮ এপ্রিল ২০১৭
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info