যে ম্যাচ শেষই হচ্ছিল না!

অনলাইন ডেস্ক | আপডেট:

এ এমন এক লড়াই, যার শেষ এনে দেয় অভাবিত আনন্দ! ছবি: এএফপিঅস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ইতিহাসে সেরা ম্যাচগুলোর একটি! ৪ ঘণ্টা ৫৬ মিনিটের ‘হাই-অকটেন’ টেনিস! অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ছেলেদের এককের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আজ যা হলো, সেটিকে এক কথায় সম্ভবত এর চেয়ে ভালোভাবে বলা সম্ভব নয়। মেলবোর্নের স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় শুরু ম্যাচটি গড়াল রাত অবধি। পৃথিবীর আরেক প্রান্ত জেগে উঠেছে, তবু এই ম্যাচ যেন শেষ হচ্ছিল না!

রাফায়েল নাদাল ও গ্রিগর দিমিত্রভ—দুই প্রতিদ্বন্দ্বী একে অন্যকে একটুও ছাড় না দেওয়ার চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞাই দেখালেন ম্যাচজুড়ে। একজনের নিজেকে প্রমাণের তাগিদ, অন্যজনের লড়াই নিজেকে ফিরে পাওয়ার। আর পুরস্কার—রজার ফেদেরারের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনাল। তাতেই হলো মহাকাব্যিক এক ম্যাচ! শেষে হাসি নাদালের। দিমিত্রভকে ৬-৩, ৫-৭, ৭-৬, ৬-৭ (৭/৪), ৬-৪ গেমে হারিয়ে উঠলেন ফাইনালে। ২০১৪ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেনের পর তাঁর প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনাল।
সেটিই টেনিসপ্রেমীদের কাছে স্বপ্নেরও ফাইনাল—ফেদেরার বনাম নাদাল। অন্যভাবে বললে, ‘বেবি ফেদেরার’কে হারিয়েই আসল ফেদেরারের সামনে যাচ্ছেন নাদাল!
বেবি ফেদেরার—বছর দুয়েক আগে নিজের নামের চেয়েও এই নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন দিমিত্রভ। রজার ফেদেরারের সঙ্গে যার অনেক মিল! এই নামে অবশ্য এখন আর খুব বেশি মানুষ তাঁকে ডাকেন না। বছর দু-তিনেক আগেও খেলার ধরন, প্রতিভা আর পারফরম্যান্স মিলিয়ে সুইস কিংবদন্তির সঙ্গে যেমন তুলনা টেনে এনেছিলেন নিজের দিকে, গত দুই বছরে সেটি অনেকটাই উধাও হয়ে গিয়েছিল। চোট ভুগিয়েছে, কোচের সঙ্গে ঝামেলা বাঁধিয়েছেন, ফর্মও হারিয়েছেন বুলগেরিয়ান তারকা। ‘বেবি ফেদেরার’ নামটা তাই সম্মানের চেয়েও বরং খোঁচা দেওয়ার অনুভূতিই হয়তো এনে দিচ্ছিল।
তবে এই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে নিজের প্রতিভার কথা যেন আরেকবার সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছেন দিমিত্রভ। আজ সেমিফাইনালে রাফায়েল নাদালের বিপক্ষেও যা বেশ চোখে পড়ল। নাদাল নিজেও বছর দুয়েক ধরে চলে গিয়েছিলেন অন্তরালে। চোটই ভোগাচ্ছিল তাঁকে। তবে চোট কাটিয়ে নতুন উদ্যমে ফেরা স্প্যানিশ ম্যাটাডোরের র‍্যাকেটে এবার ফিরেছে পুরোনো রোমাঞ্চ। কোর্টেও দেখা যাচ্ছে সেই আগের নাদালের মতো হার না মানার প্রতিজ্ঞা।
প্রথম সেটে খুব বেশি অবশ্য খাটতে হলো না র‍্যাঙ্কিংয়ে ৯-এ থাকা স্প্যানিশ তারকাকে। দিমিত্রভের দ্বিতীয় সার্ভিসেই ব্রেক করলেন, সেটও জিতে গেলেন ৬-৩ গেমে। দিমিত্রভ এ সময় দু-একবার নিজের প্রতিভার ঝলকানি দিয়েছিলেন ঠিকই, দেখতে ফেদেরারের মতো স্লাইস, ফোরহ্যান্ড রিটার্ন বা নেট প্লের চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু নাদালের পরিশ্রম, আর শক্তিশালী ফোরহ্যান্ডগুলোর সামনে কুলিয়ে উঠতে পারলেন না।
তবে দ্বিতীয় সেটে নিজের জাত চেনালেন বুলগেরিয়ান তারকা। নাদালও হাল ছাড়ার মানুষ নন। দুইয়ে মিলে টেনিস হলো দুর্দান্ত, আর পুরো সেটটাতে চলল সার্ভিস ‘ভাঙাভাঙি’র খেলা! দুজন মিলে যেন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, নিজের সার্ভিস না জিতুন, অন্যকেও তাঁর সার্ভিস জিততে দেবেন না! দিমিত্রভই বেশি ‘ভাঙচুর’ করেছেন, তিনবার ব্রেক করেছেন নাদালের সার্ভিস। নাদালও কম কী! প্রতিপক্ষের সার্ভিস ব্রেক করেছেন দুবার। শেষ পাঁচ গেমের চারটিতেই হলো ব্রেক! দুজনের চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞার ফলে বারবারই এক-একটি পয়েন্টের আগে র‍্যালি হচ্ছিল অনেক, এক-একটি গেমের আগে হচ্ছিল বেশ কয়েকটি ডিউস।
এই সেটে টেনিস তার ধ্রুপদি রূপ নিয়ে দেখা দিল দশম গেমে। নাদালের সার্ভ করা সেই গেম চলল ১০ মিনিটেরও বেশি সময়! শেষ পর্যন্ত সেই গেমটা নাদাল জিতলেও সেট আর জেতা হয়নি। ‘ভাঙাভাঙি’র নিয়ম মেনেই, সেটের দ্বাদশ গেমে নাদালের সার্ভ ব্রেক করে দিমিত্রভই জিতে নিলেন সেট।
তৃতীয় সেটেও একই অবস্থা। পঞ্চম গেমে দিমিত্রভের সার্ভিস ব্রেক করেন নাদাল, পরের গেমেই নাদালের সার্ভে সেটির শোধ নেন দিমিত্রভ। এরপর অবশ্য দুজন মিলে কিছুক্ষণ যেন বিরতি নিলেন, নিজেদের সার্ভ নিজেরাই জিতে নেন। তাতে সেট গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে অবশ্য শেষ পর্যন্ত নাদালের অভিজ্ঞতাই জিতল। টাইব্রেকারে গড়ায় চতুর্থ সেটও। যদিও যে যার সার্ভিস জেতেন (৬-৬), তবে এই সেটে নাদালের ওপর বেশ ছড়ি ঘোরালেন দিমিত্রভই। টাইব্রেকারেও তা-ই। জিতলেন শেষ পর্যন্ত ৭-৬ (৭/৪) গেমে।
চার সেট শেষে ২-২ সমতা। ফাইনালে যেতে হলে পঞ্চম সেটেই যা করার করতে হবে। এই প্রতিজ্ঞাই হয়তো তাতিয়ে দিল দুজনকে। এমনই যে, সেটের প্রথম গেমই চলল ১৩ মিনিট! ডিউসের ছড়াছড়িও হলো! তিনটি ব্রেক পয়েন্ট পেয়েছিলেন নাদাল, তবে শেষ পর্যন্ত ব্যবধানটা ঘুচিয়ে দিয়ে জিতলেন সার্ভ করতে থাকা দিমিত্রভ। তবে তাঁর পঞ্চম গেমটা ঠিকই ব্রেক করেন নাদাল। তাতেই ম্যাচের গতি গেল পাল্টে। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করেও আর ম্যাচে ফেরা হয়নি দিমিত্রভের। নাদাল সেট জিতে গেলেন ৬-৪ গেমে। ম্যাচও।
ফেদেরার হয়তো নিজের হোটেলে টিভিতে বসে খেলাটা বেশ উপভোগই করেছেন। সঙ্গে পরশু দিনের ফাইনালের আগে হয়তো কিছু যোগ-বিয়োগও করে নিয়েছেন। এত দুর্দান্ত একটা ম্যাচ, এত দুর্দান্ত একজন প্রতিপক্ষ।
ফেদেরার তৈরি তো?

 

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনি কি পরিচয় গোপন রাখতে চান
আমি প্রথম আলোর নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
View Mobile Site
   
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ই-মেইল: info@prothom-alo.info
 
topউপরে