সব

শখের হাঁড়ি নিয়ে জাপানে

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী
প্রিন্ট সংস্করণ

নিজস্ব ঢঙে শখের হাঁড়িতে নিত্য নকশা এঁকে যান কারুশিল্পী সুশান্ত পাল। ছবি: প্রথম আলোশখের হাঁড়ি তৈরি করেন সুশান্ত পাল। এটি তাঁর নিছকই শখের কাজ নয়, ভালোবাসার কাজ। বেঁচে থাকার অবলম্বন। তবে তাঁর বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে মৃতপ্রায় মৃৎশিল্পে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। বাঁচার জন্য এই সংগ্রাম তাঁকে এনে দিয়েছে বিরল সম্মান। একাধিকবার দেশের সেরা কারুশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হয়ে গেছেন জাপানে। জাপানি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে তাঁর ছবি। শুধু তা-ই নয়, পঞ্চম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইতেও রয়েছে সুশান্ত পালের ছবি।
গুণী শিল্পীর বাড়ি
রাজশাহীর পবা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামে। বয়স হয়েছে ৫৭ বছর। বাবা ভোলানাথ কুমার পাল বেঁচে নেই। তবে সুশান্ত পালের স্ত্রী মমতা রানী পাল, দুই ছেলে  সঞ্জয় কুমার পাল ও মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল, এক মেয়ে সুচিত্রা রানী পাল এবং দুই ছলের স্ত্রী মুক্তি রানী পাল ও করুণা রানী পাল সবাই এখন কারুশিল্পী।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন, সুশান্ত পাল শখের হাঁড়ির অগ্রদূত। এ কাজে দেশে তাঁর জুড়ি নেই। তিনি অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
জাপানি পত্রিকায় সুশান্ত পালের কাজের ছবিকারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, জাতীয় জাদুঘর, কারিকা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনসহ (বিসিক) সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৩০টি সনদ রয়েছে তাঁর। ২০১১ সালে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী হিসেবে তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করে। পুরস্কারের সঙ্গে নগদ ৩০ হাজার টাকাও দেওয়া হয়। বিসিক নকশা কেন্দ্রের ‘আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকা’ জাতীয় মৃৎশিল্প প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগী হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। এর আগে তিনি দুবার বিসিকের শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী নির্বাচিত হয়েছেন। গত বছরও বিসিক তাঁকে শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী নির্বাচিত করেছে।
২০১৩ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত এক কারুশিল্পের প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছিলেন সুশান্ত পাল। সেবার জাপানের তাকামাশু শহরের সেতুছি টার্মিনালে ৪০ দিন ধরে তাঁর শখের হাঁড়ির প্রদর্শনী হয়েছিল। জাপানের পত্রপত্রিকায় তাঁর ছবি ছাপা হয়েছিল। আমাদের পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্য আমার বাংলা বই-এর ৩৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘শখের মৃৎশিল্প’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি কারুশিল্পের মেলার ছবি দেওয়া রয়েছে। এই ছবিটিই সুশান্ত পালের।
নিজেদের শখের হাঁড়ি নিয়ে এবার সুশান্ত পাল ছিলেন সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের তিন দিনের বৈশাখী মেলায়। বড় ছেলে সঞ্জয় কুমার পাল ছিলেন বাংলা একাডেমিতে। সেখানে ১৪ এপ্রিল থেকে ১০ দিনব্যাপী মেলা হয়েছে। ছোট ছেলে মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল ছিলেন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত মেলায়। এখানে চ্যানেল আই ১৩ ও ১৪ এপ্রিল মেলার আয়োজন করে।
রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে পবা উপজেলার একটি নিভৃত গ্রাম বসন্তপুর। প্রায় পুরো গ্রামই বাঁশঝাড়ে ঘেরা। গ্রামে গিয়ে রাস্তা থেকেই সুশান্ত পালের বাড়ি চিনতে মোটেও অসুবিধা হয় না। বাড়ির বাইরে আঙিনাই বলে দেয় এই বাড়ি শখের হাঁড়ির।
কিছুদিন আগে সুশান্ত পালের বাড়ি গিয়ে দেখা গেল চারদিকে মেলে রাখা রয়েছে হাঁড়ি। বাড়ির ভেতরে ঢুকেই দেখা গেল কর্মযজ্ঞ। কেউ মাটি ছেনে কাদা তৈরি করছেন, কেউ চাকে বসে হাঁড়ির মাথার অংশ তৈরি করছেন, কেউ গোটা ও পিটনা দিয়ে কাঁচা হাঁড়িকে পিটিয়ে পাতলা করছেন, কেউ মাজনা দিয়ে মসৃণ করছেন। অন্যেরা সব রং করতে ব্যস্ত। বাড়ির উঠানজুড়ে শুকাতে দেওয়া রয়েছে কাঁচা হাঁড়ি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মমতা রানী পাল গিয়ে উল্টে-পাল্টে দিয়ে আসছেন। আবার এসে বারান্দায় পুতুলে রং লাগাতে বসছেন। সুশান্ত পালের ভাষায়, ‘ছায়ে-পায়ে কুমার, বাপ-ব্যাটায় কামার’ অর্থাৎ দুজন না হলে কামারের লোহা পেটানো হয় না। আর ছেলে-পুলে  সবাই না লাগলে কুমারের কাজ করা যায় না।
সুশান্ত পালের বাড়িতে তৈরি হচ্ছে শখের হাঁড়ি-সাজি, পঞ্চসাজি, চুকোই, মাটির পুতুল, ঘোড়াসহ নানা রকমের দৃষ্টিনন্দন মাটির তৈজসপত্র। এগুলো ন্যূনতম ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। ১০ টাকায় বিক্রি হয় চুকোই। আর ৬০০ টাকায় বিক্রি হয় বড় শখের হাঁড়ি। চুকোইয়ে বাচ্চারা পয়সা জমিয়ে রাখে। আর শখের হাঁড়ি ঘরে টাঙিয়ে রাখা হয়।
সুশান্ত পাল আক্ষেপ করে বলেন, জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। প্রশংসাপত্র পেয়েছেন বলতে গেলে এক বোঝা, কিন্তু শুধু পুরস্কার দিয়ে মৃৎশিল্পকে বাঁচানো যাবে না। সবাই যদি দেশের এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চান, তাহলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পুরস্কার ও উপহারসামগ্রী হিসেবে মৃৎশিল্পকে ব্যবহার করতে হবে।
টানা ২৯ বছর নিজের হাতে শখের হাঁড়ি তৈরি করতে গিয়ে সুশান্ত পালের কোমর ও ঘাড়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর মাটিতে বসতে পারেন না। তাঁর চিকিৎসার জন্য যে টাকার প্রয়োজন, তা জোগাড়ের সামর্থ্য নেই। মৃৎশিল্পের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে কেউ যদি তাঁর পাশে এসে দাঁড়াতেন, তাহলে তিনি উপকৃত হতেন।

অর্থহীন

অর্থহীন

default image

কিছুদিন পরের কথা

সে আমাকে ভালোবাসে

সে আমাকে ভালোবাসে

বছর তেরো বাদে

বছর তেরো বাদে

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

সিডনিতে বৈশাখী মেলার ২৫ বছর

সিডনিতে বৈশাখী মেলার ২৫ বছর

সিডনির অলিম্পিক পার্কের রাস্তায় রোদেলা দুপুরে হঠাৎই সবাইকে অবাক করে দিয়ে শুরু...
কাউসার খান
প্যানডোরার রাজ্যে স্বাগত

অন্য খবর প্যানডোরার রাজ্যে স্বাগত

জেমস ক্যামেরনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র অ্যাভাটার-এ উঠে এসেছিল প্যানডোরা নামের একটি...
এ দেশের আফনান ও দেশে মাস্টারশেফ

এ দেশের আফনান ও দেশে মাস্টারশেফ

হেঁশেলে রান্না করছেন মা, তাঁর আঁচল ধরে পাশেই দাঁড়িয়ে সন্তান। এমন ছবি তো...
আদর রহমান
মা

পাঠক হাজির মা

সাড়ে ১২ বছর বয়স থেকে আমি ঘরছাড়া। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে সেই ক্যাডেট কলেজে...
ম্যাচের রং বদলে দিল বাংলাদেশ

ম্যাচের রং বদলে দিল বাংলাদেশ

১১ বল ও ২ রান-এটুকুই লাগল ম্যাচ ঘুরে যেতে!টপ অর্ডারের এনে দেওয়া ভিত্তিতে ঝড়...
অনলাইন ডেস্ক ১১ মন্ত্যব্য
লক্ষ্মীপুরে শিশুর পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার চেষ্টাকারী কারাগারে

লক্ষ্মীপুরে শিশুর পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার চেষ্টাকারী কারাগারে

লক্ষ্মীপুরে রেস্তোরাঁ শ্রমিকের (১১) পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার চেষ্টাকারী...
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি মন্ত্যব্য
গোপালকৃষ্ণকে রাষ্ট্রপতি করতে তৎপর বিরোধীরা

গোপালকৃষ্ণকে রাষ্ট্রপতি করতে তৎপর বিরোধীরা

রাষ্ট্রপতি পদে বিরোধী প্রার্থী হিসেবে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠতে চলেছে...
নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
ভ্যাটের হার কমানো কষ্টকর: মুহিত

ভ্যাটের হার কমানো কষ্টকর: মুহিত

মূল্য সংযোজন করের (মূসক বা ভ্যাট) হার কমানো বেশ কষ্টকর বলে জানিয়েছেন...
নিজস্ব প্রতিবেদক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info