সব

ভাস জাদুঘর

জাহীদ রেজা নূর
প্রিন্ট সংস্করণ

ভাস জাদুঘরে রয়েছে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই জাহাজ। ছবি: সংগৃহীতদিন বলতে কী বোঝায়, তা টের পাচ্ছিলাম না। সূর্য একটু উঠেই টুপ করে ঢলে পড়ছিল দিগন্তে। রাতই যেন এখানে একমাত্র সত্য।
এরই মধ্যে শুরু হলো তুষারপাত। একটু আগেই যা ছিল খটখটে রাস্তা, পাতাহীন গাছ, মসৃণ ফুটপাত, তা যেন মুহূর্তের মধ্যে রুপালি সুন্দরী সেজে বসে আছে সামনে। জানালা দিয়ে এই তুষারশুভ্র প্রকৃতি দেখে সত্যিই মন জুড়িয়ে গেল। ঘড়ির সময় এখন আর আমাকে শঙ্কিত করছে না। গত ডিসেম্বরে নোবেল পুরস্কারসংক্রান্ত অনুষ্ঠানগুলোয় উপস্থিত ছিলাম। অনুষ্ঠান শেষে একটি দিন পাওয়া গিয়েছিল ঘুরে বেড়ানোর জন্য। হাতে যে টাকাপয়সা ও সময়, তাতে সর্বোচ্চ চেষ্টাতেও অল্প কয়েকটি দ্রষ্টব্য স্থান ছাড়া আর কিছু দেখার সুযোগ িছল না।
কথা ছিল অ্যাবা মিউজিয়াম দেখব। সেভাবেই নিজেকে তৈরি করলাম। সুইডেনে যে বাঙালিরা বাস করেন, তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাঁরা একবাক্যে পরামর্শ দিলেন ভাস মিউজিয়ামটা যেন দেখি। একটি জাহাজ সেটা। কেন সে জাহাজ দেখতে হবে? কারণটা খুবই আকর্ষণীয়—৪০০ বছর আগে ডুবে যাওয়া এই জাহাজটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। বলা যায়, সতেরো শতকের সবচেয়ে পুরোনো জাহাজ এটি। এর আগের কোনো জাহাজের সন্ধান মেলে না আর।
যে পথের নিশানা দেওয়া হলো, তাতে একটু ভয় পেয়েছিলাম, অ্যাবা মিউজিয়াম দেখে ভাস মিউজিয়ামে যেতে গিয়ে নিশ্চয়ই সময় নষ্ট হবে ঢের। কিন্তু এই শীতের তুষার ভেদ করে আমার মনে ঢুকল বসন্তের হাওয়া, যখন ৭ নম্বর ট্রাম থেকে দেখলাম, ভাস মিউজিয়াম অ্যাবা মিউজিয়াম থেকে মাত্র দুই স্টপেজ এদিকে। গল্যার ভারভসভ্যাগেন িস্ট্রটে। আমার কাছে বাস-ট্রাম-মেট্রোর ১০ দিন চলার মতো টিকিট করা আছে। সুতরাং যাতায়াত কোনো ব্যাপার নয়।
নর্ডিক মিউজিয়ামের পাশে একটি সরু রাস্তা। তা ধরে এগোই। স্টকহোমে একলা চলেছি পাঁচ দিন। সুতরাং এখন আর কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই। নিজের মতোই একটু একটু করে পথের মানুষদের কাছে জিজ্ঞেস করে গন্তব্যে পৌঁছাই। হাঁটছিলাম, হাঁটছিলাম, সামনে পড়ল একটা জেটি। এখানে বেশ কিছু ছোট জাহাজ আছে। এক বৃদ্ধ দম্পতিকে জিজ্ঞেস করার পর তাঁদের দেখানো পথে পৌঁছে গেলাম ভাস মিউজিয়ামে।
বাইরে থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই। একটা প্রাসাদেই ঢুকলাম মনে হলো। টিকিট করা যায় ক্রেডিট কার্ডে যেমন, নগদ টাকাতেও তেমনি। একটু আগে অ্যাবা মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম, সেখানে টাকা দিয়ে টিকিট কেনা যায়নি। কার্ড ছাড়া সেখানে এক পা-ও এগোনো যাবে না।
১৩০ ক্রোনার দিয়ে টিকিট করে ঢুকলাম জাহাজ দেখতে। প্রতিদিন পর্যটকেরা আঠারো শতকের এ জাহাজটি দেখতে আসেন। বিশাল জাহাজটির চারপাশে যে জায়গা, সেখানে দাঁড়িয়েই দেখতে হয়। তিনতলাজুড়ে চার কোনা গ্যালারি। মানুষ এক এক তলায় উঠে জাহাজের ভেতরটা দেখতে পায়। আর সঙ্গে চলে ছবি তোলা। আমি যখন সেখানে উপস্থিত, তখন একসঙ্গে কয়েকটি দলও এসেছিল। তাদের সঙ্গে গাইড ছিলেন। দলগুলোর মধ্যে ছিল রুশ আর চীনা মানুষ। ফলে দুই জায়গায় একেবারে বিপরীতধর্মী দুই ভাষায় কথা বলছিলেন গাইড।
যে ব্রশিওরটা হাতে পেলাম, তাতে ভাস মিউজিয়ামের ইতিহাসটা পেলাম না। গাইডের কাছ থেকে ছেঁড়া-টুকরো কথাবার্তা যা শুনেছি, তাতে মনে হলো, ‘ভাস’ বলে একটা সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল সুইডেনে। এই রাজবংশের প্রথম রাজা হলেন প্রথম গুস্তাফ, তাঁকে গুস্তাফ ভাস নামে ডাকা হতো। সেই থেকেই ভাস সাম্রাজ্য।
আমরা যে রাজার কথা বলছি, তিনি হলেন দ্বিতীয় গুস্তাফ আডোলফ। তিনি ছিলেন এই সাম্রাজ্যের শেষ রানি ক্রিস্টিনার বাবা। গুস্তাফ জন্মেছিলেন ১৫৯৪ সালে, ১৬৩২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই গুস্তাফ যখন রাজা হলেন ১৬১১ সালে, তখন সুইডেন খুব স্বস্তির মধ্যে ছিল না। রাশিয়া, ডেনমার্ক আর পোল্যান্ডের সঙ্গে চলছিল যুদ্ধ। নিজের ২১ বছরের রাজত্বকালের ১৮ বছরই বেচারাকে কাটাতে হয়েছে যুদ্ধ করে।
আচ্ছা, সাম্রাজ্যের বিশাল ইতিহাসের মধ্যে না ঢুকে আমরা বরং বলি এই যুদ্ধজাহাজটা সম্পর্কে। আমাদের সামনে যে জাহাজটি দাঁড়িয়ে, সেটিকে পলিশ করা হয়েছে, তার রক্ষণাবেক্ষণ হয় ঠিকই, কিন্তু দেখলেই বোঝা যায়, এটা এ যুগের নয়। অন্তত ৪০০ বছর আগের ইতিহাস লেখা আছে ওর গায়ে।
যেদিন এ জাহাজটি প্রথম নামল পানিতে, সেদিনই তার কবর হলো সমুদ্রের অতলে। টাইটানিকের সঙ্গে এই জাহাজটির মিল এই জায়গাতেই। প্রথম ভ্রমণেই জীবনের পরিসমাপ্তি। অমিল হলো, টাইটানিক তো কিছুদিন চলেছিল, এই যুদ্ধজাহাজটি রওনা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুবে যায়। দিনটি ছিল ১৬২৮ সালের ১০ আগস্ট।
প্রথম যাত্রা ছিল বলে জাহাজের ক্রুরা তাঁদের পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছিলেন। ফলে জাহাজে নারী ও শিশুর সংখ্যা ছিল অনেক। এই ভ্রমণের পরই জাহাজটি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতো।
বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে জেটি ছেড়ে যায় জাহাজটি। রণসংগীত বাজিয়ে তাদের ভ্রমণটিকে অন্য মাত্রা দেয় বাদকের দল। জেটি থেকে রওনা হয়ে স্লুসেনে এসেই দাপুটে হাওয়ার মধ্যে পড়েছিল জাহাজটি। আর তাতেই কিছুক্ষণের মধ্যে জাহাজটি ডুবে যেতে থাকে। সমুদ্রগহ্বরের ৩২ মিটার নিচুতে ডুবে যায় সেটি। ৩০ জন ক্রু ও অতিথি বেঁচে গিয়েছিলেন। বাকি সবার হয়েছিল সলিলসমাধি।
এরপরের ঘটনা ১৯৫৬ সালের। সে বছরের ২৫ আগস্ট স্টকহোমের জেটিতে একটি ছোট ওক কাঠের টুকরো ভেসে ওঠে। প্রথমে কেউ এটাকে পাত্তা দেয়নি, বুঝতেই পারেনি ভাস নামের জাহাজটির সন্ধান পাওয়া যাবে এই ওকের টুকরো দিয়েই। তবে এ ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন আন্দেরস ফ্রানজেন নামের একজন প্রকৌশলী। তিনি সতেরো শতকে ডুবে যাওয়া জাহাজের হদিস পাওয়ার জন্য একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেন। সে যন্ত্র পানির গভীরে গিয়ে কোনো কাঠের টুকরো বা এ-জাতীয় কিছু পেলে টেনে তুলে আনে। সেভাবেই উঠে এসেছিল এই ওকের টুকরো। এরপর বহু বিশেষজ্ঞের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় পানির নিচ থেকে উঠে এল আস্ত একটা জাহাজ। জানা গেল, ডিজাইনের দুর্বলতার জন্যই জাহাজটি ভাসতে পারেনি।
বিশাল এই প্রাসাদোপম জাদুঘরের বিভিন্ন তলায় সে সময়ের জীবনযাত্রার একটা চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। কী ধরনের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে যাওয়া হতো, তা যেমন আছে, তেমনি রাজাদের সাম্রাজ্য নিয়ে রয়েছে ছবির প্রদর্শনী। সত্যিকারের অস্ত্র, গোলাবারুদের পাশাপাশি সামাজিক জীবনযাপনের অনুষঙ্গগুলোও প্রদর্শিত হচ্ছে।
বাইরে যে স্যুভেনিরের দোকানটি, তাতে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে রয়েছে ভাস জাহাজটির রেপ্লিকা। বলা যায়, সেটাই সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন, কিন্তু সেগুলো কিনতে হলে পকেটের যে অবস্থা থাকতে হয়, তা তো ছিল না, তাই কিছু ভিউকার্ডই আমার সঙ্গী হয়ে যায়।
* সুইডিসরা vasa জাদুঘরকে ভাস উচ্চারণ করেন

অব্যক্ত অস্বস্তি

অব্যক্ত অস্বস্তি

শূন্যতা অনুভব করলাম

শূন্যতা অনুভব করলাম

প্রথম পদ্য

প্রথম পদ্য

চুইংগাম

চুইংগাম

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

৪৫০ ফুট উঁচুতে হাঁটা

অন্য খবর ৪৫০ ফুট উঁচুতে হাঁটা

ছবিটা দেখেই গা ছমছম করে। সরু দড়ির ওপর হাঁটছেন একজন মানুষ। আর সে দড়ি ভাসছে...
প্রশ্ন

পাঠক হাজির প্রশ্ন

ছেলেবেলায় বাবাকে প্রায়ই একটা প্রশ্ন করতাম, ‘বাবা, তোমাকে ছোটবেলায় কী...
বর্ষবরণ উৎসব

কীভাবে এল বর্ষবরণ উৎসব

নতুন বছরকে আনন্দ-উৎসবে বরণ করে নেওয়ার রেওয়াজ সেই প্রাচীনকালের। গবেষকেরা...
বার্গার খেয়ে বিশ্ব রেকর্ড

অন্য খবর বার্গার খেয়ে বিশ্ব রেকর্ড

মুহূর্তের মধ্যে পাঁচটি বার্গার পেটে চালান করে দিলেন রিকার্ডো ফ্রান্সিসকো।...
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info