সব

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি

মূল সমস্যার সমাধান হয়নি ১৭ বছরেও

শক্তিপদ ত্রিপুরা
প্রিন্ট সংস্করণ

আজ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’র ১৭ বছর পূর্তি হলো। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সরকার বলছে চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে; অন্যদিকে জনসংহতি সমিতি বলছে, চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যখন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু হয়, তখন তাতে জুম্মর জনগণও অংশ নেয় এই প্রত্যাশায় যে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতিগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করা হলো; কিন্তু এ সংবিধানে পার্বত্য জুম্ম জনগণের অধিকার স্বীকৃত হয়নি এবং তাদের ওপর বাঙালি জাতির পরিচিতি চাপিয়ে দেওয়া হয়। জুম্ম জনগণ এতে আহত হয় এবং অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে আরও শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে জুম্ম জনগণের অধিকার সন্নিবেশ করার জন্য গণপরিষদের সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা গণপরিষদের ভেতরে ও বাইরে চেষ্টা করেও সফল হননি। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সমভূমির চার লক্ষাধিক বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে। ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে জুম্ম জনগণের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলাসহ হত্যা, সম্পত্তি তছনছ ইত্যাদি ঘটনা ঘটে।
চুক্তির কয়টি ধারা বাস্তবায়িত হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সমস্যা সমাধান হলো কি না? পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সমস্যা হলো (১) জুম্ম জাতিগুলোর জাতীয় অস্তিত্ব নিশ্চিত করা এবং (২) জুম্ম জনগণের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এসব সমস্যা সমাধান না হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যারও সমাধান হবে না।
সরকার চুক্তির বেশ কিছু বিষয় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ ধারা ও বিষয় আধাআধিভাবে বাস্তবায়ন করে রাখার কারণে সেসব বিষয় বা প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। যেমন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন গঠন করেছে, কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা চুক্তির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠান অকার্যকর রয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’ গঠন করা হলেও এ কমিশন কর্তৃক কার্যকর ভূমিকা পালন করার জন্য চুক্তির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ আইন প্রণীত হয়নি। ২০০১ সালে এ-সংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে সে আইনটি চুক্তির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। এ আইন সংশোধনের জন্য বহুবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও কার্যকর হয়নি। আইন সংশোধিত না হওয়ার কারণে ‘ভূমি কমিশন’ ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
১৯৯৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ওপর তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধন করা। সাধারণ নিয়ম হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ছয় মাসের মধ্যে বিধি প্রণয়ন করা। আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের ১৭ বছর পরও এর বিধিমালা প্রণীত হয়নি। এ কারণে আঞ্চলিক পরিষদ তার দায়িত্ব ও ক্ষমতা যথাযথভাবে চর্চা করতে পারছে না।
চুক্তি অনুসারে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে; কিন্তু এই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ পুলিশ, ভূমি, আইনশৃঙ্খলা, বন ও পরিবেশ ইত্যাদি হস্তান্তর করা হয়নি। এগুলো পার্বত্য জেলা পরিষদ তথা চুক্তির মেরুদণ্ডস্বরূপ। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যার সমাধান ও জুম্ম জাতিগুলোর অস্তিত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে এ চুক্তি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার পরিষদ (বর্তমান নাম পার্বত্য জেলা পরিষদ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এরশাদ সরকারের আমলে, ১৯৮৯ সালে। ১৯৯৭ সালে চুক্তিকালে এ প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ রাখা হয়। এরশাদ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার পরিষদ, বর্তমানে পার্বত্য জেলা পরিষদে কমপক্ষে ১২টি বিভাগ যেমন কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, সমবায়, কুটিরশিল্প, যুব উন্নয়ন, ক্রীড়া বিভাগ, বাজার ফান্ড, পশুসম্পদ ইত্যাদি হস্তান্তরিত হয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকারের তিনটি মেয়াদে বেশ কয়েকটি বিভাগ হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শঠতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে সরকার পার্বত্য জেলা পরিষদে চারটি বিভাগ হস্তান্তর করে। এসব বিভাগ হলো শিশুসদন, রামগড় মৎস্য খামার, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও খাগড়াছড়ি তুলা উন্নয়ন বোর্ড। এগুলো আসলে বিভাগ নয়; এগুলো মূলত বিভিন্ন বিভাগের অধীনে ‘প্রতিষ্ঠান’। শিশুসদন—সমাজসেবা বিভাগ, রামগড় মৎস্য খামার—মৎস্য বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর—জনস্বাস্থ্য বিভাগ ও তুলা উন্নয়ন বোর্ড—কৃষি বিভাগের অধীনে প্রতিষ্ঠান মাত্র। এসব ‘বিভাগ’ ১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকারের আমলে হস্তান্তর করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করলেও তাঁর বিভিন্ন আমলে চুক্তি নানাভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে এবং জুম্ম জনগণের ক্ষতি হয় এমন অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী (পূর্ণ মন্ত্রী) নিয়োগ করার বিধান রয়েছে। চুক্তির এ বিধান লঙ্ঘন করে এ মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রীর বিপরীতে প্রতিমন্ত্রী পদে বীর বাহাদুর এমপিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চুক্তির বিধান অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কথা রয়েছে। কিন্তু সরকার দলীয়করণকে আরও পাকাপোক্ত করার জন্য নির্বাচন না করে বর্তমানে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের পরিবর্তে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। চুক্তির আলোকে প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৯৮ অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত কোনো আইন প্রণয়ন করতে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ গ্রহণের বিধান রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে বহু আইন প্রণয়ন করেছে; কিন্তু সরকার আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ গ্রহণ করেনি—এটি চুক্তি ও আইনের লঙ্ঘন।
তথাপি শেখ হাসিনা ধন্যবাদ পেতে পারেন এই জন্য যে তাঁর নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৫ বছরের সশস্ত্র সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে জুম্ম জনগণ ক্ষুব্ধ। চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি যেকোনো সময়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সরকার যদি জুম্ম জনগণের ক্ষতি হয় এমন কর্মসূচি পরিত্যাগ করে এবং চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি স্থিতিশীলতা ফিরে পাবে নিঃসন্দেহে।
শক্তিপদ ত্রিপুরা: সাংগঠনিক সম্পাদক, জনসংহতি সমিতি।

কুমিল্লা নির্বাচন থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি?

কুমিল্লা নির্বাচন থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি?

default image

ডিজিটাল অর্থনীতির বাজেট চাই

জঙ্গি ভাবাদর্শ থেকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কই?

জঙ্গি ভাবাদর্শ থেকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কই?

default image

১২ জনকে তুলে নিয়ে যাওয়া

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

default image

জঙ্গিবিরোধী অভিযানে চাই আরও সতর্কতা র‌্যাব কর্মকর্তার মৃত্যু

সব মৃত্যুই শোকের। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রকেও নাড়া...
থ্যাচারের কৌশল নিয়েছেন ট্রাম্প

রাজনীতি থ্যাচারের কৌশল নিয়েছেন ট্রাম্প

ইতিহাসবিদেরা হয়তো একসময় মার্কিন অভিনেতা অ্যালেক ব্যাল্ডউইনকে মার্কিন...
default image

চিঠিপত্র ঢাকাকেন্দ্রিক পরীক্ষা

যানজটের শহর ঢাকা। কেন্দ্রমুখী প্রবণতা ঢাকা শহরকে দিন দিন অসহনীয় করে তুলছে।...
default image

কর্তৃত্ববাদ আমরা যেমন, তেমন নেতাই পাই

চরিত্রটিকে মনে পড়ে? খেপে গেলেও বুক থাবড়ায়, ডর দেখাতেও থাবা মারে বুকে। তার...
‘আইপি লগ’ কমপক্ষে এক বছর সংরক্ষণে বিটিআরসির নির্দেশ

সাইবার অপরাধ ‘আইপি লগ’ কমপক্ষে এক বছর সংরক্ষণে বিটিআরসির নির্দেশ

দেশের সব ইন্টারনেট সেবাদানকারী (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানকে ‘আইপি লগ’ কমপক্ষে এক বছর...
বার্নাব্যুর মঞ্চ দখল করে নিলেন মেসি

বার্নাব্যুর মঞ্চ দখল করে নিলেন মেসি

লিগ টেবিলের সুবিধাজনক জায়গায় দাঁড়িয়েই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার বিপক্ষে...
দুই মামলারই সাক্ষ্য থেমে আছে

রানা প্লাজা ধসের ৪বছর দুই মামলারই সাক্ষ্য থেমে আছে

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্পভবন দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের মৃত্যুর বিচার...
হয়ে গেল ইউনিসের ১০ হাজার

হয়ে গেল ইউনিসের ১০ হাজার

চা বিরতির পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের রোস্টন চেজকে সুইপ করেই মাইলফলকটা ছুঁয়ে ফেললেন...
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info