সব

বিদেশি বিনিয়োগ ও বিমানবন্দরের মশা

এ কে এম জাকারিয়া

বিদেশি বিনিয়োগ পেতে আমাদের চেষ্টার শেষ নেই। গত বছর জানুয়ারিতেই আমরা ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পলিসি সামিট-২০১৬’-এর আয়োজন করেছি। সেখানে প্রধানমন্ত্রী উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘বাংলাদেশ একটি সুন্দর দেশ। আসুন, এখানে বিনিয়োগ করুন। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় আপনাদের সক্রিয় অংশীদার হওয়ার এখনই যথার্থ সময়।’ আমাদের মতো দেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের কাছেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি যে প্রাধান্য পাওয়া একটি দিক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নিজের কাছে রেখেছেন। বিদেশ সফরে বা দেশে বিদেশি কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সব সময়েই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সরকারের তরফে নানা উদ্যোগে কথা আমরা শুনে আসছি। বিনিয়োগ কার্যক্রম সহজ করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা, সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা, বিনিয়োগ বোর্ড বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, পিপিপি দপ্তর বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং গ্রাহকদের যথাযথ সেবা দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ‘একক সেবা স্থান’ (ওয়ান স্টপ সেন্টার) সুবিধা নিশ্চিত করার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়েই বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? আমরা এত কিছু করছি, এত পদক্ষেপ নিচ্ছি, তার যথাযথ ফল কি মিলছে?

‘ব্যবসায় পরিবেশের উন্নয়ন: প্রধান নীতিগুলোর সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার’ শিরোনামে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে গত শনিবার। সেখানে দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আমাদের টনক নড়াবে কি না কে জানে! ‘আমি যদি বিদেশি বিনিয়োগকারী হতাম, তাহলে বিমানবন্দর থেকেই দেশে ফেরত যেতাম। বিমানবন্দরে নেমে আমাকে যদি ভিসা পেতে এক ঘণ্টার বেশি লাগত, ব্যাগ পেতে দুই ঘণ্টার বেশি লাগত, মশার কামড় খেতে হতো...এটা আমাদের দেশ সম্পর্কে ভালো পরিচয় নয়।’ বোঝা যাচ্ছে, আমাদের দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিমানবন্দর, এমনকি এর মশাও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল না হয় হবে, কিন্তু বিমানবন্দর বদলানোর কী হবে? এর মশাই-বা তাড়াবে কে?

আমরা আমাদের দেশে আমেরিকান, জাপানি, চীনা, কোরীয়, সৌদি বা ইউরোপীয় বিনিয়োগ চাই। এসব দেশের বিনিয়োগকারীদের আমাদের দেশে আমন্ত্রণ জানাই। কিন্তু বিমানবন্দরে তাঁদের স্বাগত জানাই বিড়ম্বনা, অপেক্ষা আর মশার কামড় দিয়ে। তাঁদের কী দায় পড়েছে যে আমাদের বিমানবন্দরে ভিসার আশায় অপেক্ষা করে তাঁরা মশার কামড় খাবেন!

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সেমিনারে নাসিম মঞ্জুর ছয়টি প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে বিমানবন্দরের ইস্যুটিকে তিনি পাঁচ নম্বরে রেখেছেন। বোঝা যায়, বিমানবন্দর ইস্যুটি তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নাসিম মঞ্জুর নিজে এ দেশের একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী এবং সে হিসেবে একজন ভুক্তভোগীও। এখানকার বাস্তবতা তাঁর ভালোই জানা। নাসিম মঞ্জুর ঢাকা বিমানবন্দরের যে দশা তুলে ধরেছেন, তা আমাদের কারও অজানা নয়। আমরা যারা এ দেশের সাধারণ নাগরিক বা যাঁরা নাসিম মঞ্জুরের মতো দেশীয় উদ্যোক্তা, তাঁদের না হয় আর কোনো পথ নেই এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া। কিন্তু বিনিয়োগ নিয়ে আসবেন যাঁরা, তাঁরা তা মানতে যাবেন কোন দুঃখে! আর যে দেশের বিমানবন্দরে একজন বিনিয়োগকারীকে ভিসার জন্য অপেক্ষা করতে ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়, লাগেজ পেতে দুই ঘণ্টা পার হয়, সইতে হয় মশার কামড়, সেই দেশে আমরাই-বা বিদেশি বিনিয়োগকারীকে ডাকি কোন মুখে!

বিদেশি বিনিয়োগ আনতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, অবকাঠামো তৈরি, সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, উদার বিনিয়োগনীতি, ট্যাক্স হলিডে, যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর রেয়াত বা অর্থের উৎস জানতে না চাওয়া—এসব উদ্যোগ ও নীতি নিশ্চয়ই জরুরি। কিন্তু একটি দেশের অভ্যর্থনাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত বিমানবন্দরের পরিস্থিতিও যে বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আমাদের বিবেচনায় আছে বলে মনে হয় না।

এই সেমিনারে অর্থমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অন্য বক্তারাও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার দিকগুলো তুলে ধরেছেন। অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের কিছু কিছু দাবি ও পরামর্শ লিখে নিয়েছেন বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর নোটে বিমানবন্দরের বিপর্যয়কর দশা বা মশার কামড়ের বিষয়টি জায়গা পেয়েছে কি না, আমরা জানি না। আর যদি পেয়েও থাকে, অর্থমন্ত্রী কি এ ব্যাপারে আদৌ কিছু করতে পারবেন? বিমানবন্দর নিয়ে লেখালেখি তো কম হয় না, কিন্তু কাজ তো কিছুই হয় না। বিমানবন্দর নিয়ে সম্ভবত কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক
akmzakaria@gmail.com

আমাদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে?

আমাদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে?

একটি অপ্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রস্তাব!

একটি অপ্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রস্তাব!

default image

ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বালু বিদেশে রপ্তানি?

চীন কি কান্ডারি হতে পারবে?

চীন কি কান্ডারি হতে পারবে?

মন্তব্য ( ১১ )

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেক

পাকিস্তানিদের চোখে ১৯৭১ পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেক

২৫ মার্চ, ১৯৭১। বাংলাদেশে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তানি...
২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’: ইতিহাসের দায়মুক্তি

মুক্তিযুদ্ধ ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’: ইতিহাসের দায়মুক্তি

১৯৭১ সালের ১ মার্চ হঠাৎ করে ইয়াহিয়া খানের ঘোষণায় ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন...
দখলবাজি যেন ডালভাত

দখলবাজি যেন ডালভাত

গ্রামবাংলায় কিছু প্রবাদ আবহমানকাল থেকে প্রচলিত। ‘জোর যার মুল্লুক...
গণতন্ত্র হার মানে না

বিশ্বায়নের কাল গণতন্ত্র হার মানে না

বুধবার ওয়েস্টমিনস্টারে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী...
অভিযান চলছে, সকালে গুলি-বিস্ফোরণের শব্দ

অভিযান চলছে, সকালে গুলি-বিস্ফোরণের শব্দ

সিলেটের আতিয়া মহলে এখনো অভিযান চলছে। আজ সোমবার সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটা...
বারুদে ঠাসা আতিয়া মহল

বারুদে ঠাসা আতিয়া মহল

সিলেটের আতিয়া মহলে অভিযানের তৃতীয় দিন গতকাল রোববার ভেতরে থাকা জঙ্গিদের মধ্যে...
default image

বোমা হামলায় নিহতদের পরিবারে মাতম

‘আমার ভাইটার কোনো দোষ আছিল কি? ভাই তো দায়িত্ব পালন করছিল! মারল কেন, কী দোষ?’...
default image

জেলা নেতাদের সতর্ক করেছে আ.লীগ আত্মঘাতী হামলা নিয়ে চিন্তিত সরকার

জঙ্গিদের সাম্প্রতিক তৎপরতা ও আত্মঘাতী হামলা নিয়ে চিন্তিত সরকার। দলীয়...
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info