সরকারের ৩ বছর

সরকার আসলে ভালো অবস্থায় নেই

খন্দকার মাহবুব হোসেন | আপডেট: | প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ১২ জানুয়ারি বর্তমান সরকারের তিন বছর পূর্তি হলো। এই সময়ে সরকারের সাফল্য–ব্যর্থতা ও আগামী দিনের রাজনীতি নিয়ে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক আবদুল মতিন খসরু এবং বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন–এর মূল্যায়ন।

খন্দকার মাহবুব হোসেনবর্তমান সরকার ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তবে গত তিনটি বছর কিছু ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দক্ষতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করেছে। জনগণের সমর্থন না নিয়েও একটা সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করে কীভাবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, তারা সেটা প্রমাণ করেছে। এই সরকারের আমলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এ উন্নয়নের সুফল দেশের তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উন্নয়নের নামে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনা টেন্ডারে কাজ দেওয়া এবং টেন্ডারবাজি করে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের একটা অংশ বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছে।

আবার এটাও বলতে হবে যে এ সরকার গত তিন বছরে হামলা, মামলা ও গুম করে বিরোধী দলকে প্রায় কোণঠাসা করে রেখেছে। তবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ এখনো খোলা আছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নামে দায়ের করা হাজার হাজার মামলা এবং তঁাদের ওপর হামলা সত্ত্বেও সরকার যদি আগামীতে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পারে, সেটাই হবে তাদের বিরাট সাফল্য। আমি বিশ্বাস করি, এই সরকার আগামী দিনে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমাদের সরকারপ্রধান, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখিয়ে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও সেটা সম্ভব।
বিচার বিভাগে গত তিন বছরে সত্যিকারের কোনো উন্নয়ন হয়েছে বলে আমি মনে করি না। ২৮ লাখের ওপরে মামলা রয়েছে নিম্ন আদালতে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত সেখানে অবকাঠামোর অভাব চলছে। বিচারকের স্বল্পতার কারণে মামলার নিষ্পত্তি ঘটতে দীর্ঘ সময় নিচ্ছে। উচ্চ আদালতেও একই অবস্থা। সেখানে আপিল বিভাগে দীর্ঘদিন যাবৎ কয়েকজন বিচারকের অভাব রেয়েছে। তারা সেখানে বিচারক নিয়োগ করছে না। কী উদ্দেশ্যে করছে না তা আমি জানি না। এর ফলে সর্বোচ্চ আদালতে মামলার বিচারকার্যে ধীরগতি চলছে। আমাদের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে বিচার বিভাগের বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিচ্ছেন। বিচার বিভাগের প্রতি বর্তমান সরকারের যে বিমাতাসুলভ মনোভাব প্রকাশ পেয়ে চলেছে, তা তিনি বারবার ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন। আমরাও একমত যে বিচার বিভাগকে সরকার কখনো কখনো প্রতিপক্ষ মনে করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। সেটা না করে দেশের মানুষ যাতে ন্যায়বিচার পায়, সহনীয় সুবিচার পায় ও দ্রুত সময়ে বিচার পায়, সরকারকে সেদিকে আরও বেশি সজাগ থাকতে হবে এবং সে ব্যাপারে যা যা প্রয়োজনীয়, সেই সব পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশকে এখন আর গণতান্ত্রিক দেশ বলা যায় না। কারণ, বিরোধী দলের নেতাদের প্রতি যেভাবে মামলা করা হচ্ছে এবং যেভাবে তাঁদের হয়রানি করা হচ্ছে, তাতে যদি গণতান্ত্রিক দেশে আমাদের সুনাম ও মর্যাদা না থাকে, তা আমাদের জন্য লজ্জাজনক হবে। আমি বিশ্বাস করি, যেসব অযথা মামলা করা হয়েছে, সেসব বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে একটা পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব মামলা যদি বিচারিক আদালতে নিষ্পত্তি করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তাহলে বছরের পর বছর কেটে যাবে। মানুষ এর বিরুদ্ধে একসময় রুখে দাঁড়াবে। সরকার যতই মনে করুক না কেন, তারা একটা ভালো অবস্থায় আছে, সেটা কিন্তু সঠিক নয়। তৃণমূলের মানুষ বিভিন্নভাবে নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। এর পরিণতিতে বাংলাদেশেও হয়তোবা একদিন গণবিস্ফোরণ ঘটে যেতে পারে।
এই সরকারের যেমন উন্নয়ন ক্ষেত্রে নানা সাফল্য রয়েছে, তার প্রতি যদি তারা মানুষের সহানুভূতি ধরে রাখতে চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও প্রক্রিয়া দ্রুত ফিরিয়ে আনা। এদিকে যদি তারা নজর না দেয়, তাহলে তাদের উন্নয়নের সব সাফল্য ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। জনগণের কাছে তারা এ উন্নয়নের জন্য কোনো মূল্য পাবে না। জেনারেল এরশাদের আমালেও কিন্তু দেশের উন্নয়ন কম হয়নি। কিন্তু সে সরকারকেও জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে চলে যেতে হয়েছে। সেই পরিণতি যাতে তাদের না হয়, তৃণমূলের মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যাতে তারা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। তাদের অন্যায়, অবিচার ও গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ধ্বংস করার নজির থাকা সত্ত্বেও তারা একটি দৃষ্টান্ত রাখতে পারে। তাহলে এ সরকারের ক্ষমতায় থাকার সার্থকতা কিছুটা থাকবে। অন্যথায় সরকার হয়তো ইতিহাসে ভিন্নভাবে মূল্যায়িত হবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণা হচ্ছে, ভারতের প্রতি একটা তোষণনীতি চলছে। ভারতকে আমরা ট্রানজিট সুবিধাসহ অনেক কিছুই দিয়েছি। কিন্তু সরকার দেশের যা ন্যায্য পাওনা, তা ভারতের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি। এর অন্যতম জ্বলন্ত প্রমাণ হলো তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগির চুক্তি করতে না পারা। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সরকার ভালো সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রক্ষা করা কঠিন হবে। চীন ইতিমধ্যে আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ সহযোগিতা নিয়ে এসেছে। ভারতের সঙ্গে আজকের যে ধারায় সম্পর্ক চলমান, তা ভবিষ্যতে কতটা টিকে থাকবে, তা বিবেচনায় নিতে হবে। দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাহায্য-সমর্থন কতটা বজায় থাকবে, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে।
ভারত ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্র থেকে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। তাদের এ দাবি ও সুপারিশ সরকার যদি না মানে, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক থেকে যাবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।
খন্দকার মাহবুব হোসেন: বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি।

পাঠকের মন্তব্য ( ৪ )

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনি কি পরিচয় গোপন রাখতে চান
আমি প্রথম আলোর নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
View Mobile Site
   
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ই-মেইল: info@prothom-alo.info
 
topউপরে