ফিরে দেখা একাত্তর

ডিসেম্বরের আগুনঝরা দিনগুলো

মহিউদ্দিন আহমদ | আপডেট: | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র পর্বটি নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরে এসে প্রচণ্ড গতি পায়ক্যালেন্ডারের নিয়ম মেনেই আজ আবার হাজির হয়েছে ঘটনাবহুল ওই মাস, যখন মার্চ মাসে জন্ম নেওয়া ভ্রূণটি ধীরে ধীরে পূর্ণ অবয়ব পেল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি ভূমিষ্ঠ হলো। আমরা যদি ৪৫ বছর আগের দিনগুলোতে ফিরে যাই, আমরা অনেকেই আবেগতাড়িত হই। ২৩ বছর ধরে একটা জনগোষ্ঠীর জেগে ওঠার আয়োজন চলছিল। পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাঙালির আত্মপ্রতিষ্ঠার সুযোগ নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল। একদিকে চলছিল রক্তক্ষরণ, অন্যদিকে ছিল পথ খুঁজে নেওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল রাজনীতির মেরুকরণ এতটা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির অখণ্ড থাকার আর কোনো সুযোগ ছিল না। আমরা ছুটে গেলাম অনিবার্য গন্তব্যের দিকে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠল অনিবার্য।
একটা জাতিরাষ্ট্রের জন্য সাড়ে চার দশক সময় খুব বড় নয়, আবার খুব ছোটও নয়। আমরা যত বছর ‘পাকিস্তানি’ ছিলাম, বাংলাদেশি হিসেবে আমরা তার দ্বিগুণ বয়সী। বাংলাদেশকে তাই আর শিশুরাষ্ট্র বলে নিরাপত্তাহীনতার কল্পিত জুজুর ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকার দরকার নেই। দেশটা এখন আমাদের। ভালো হোক, মন্দ হোক, আমাদের যা আছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে এবং আরও ভালো হওয়ার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
একাত্তরের ডিসেম্বর মাসটা আমাদের জাতীয় জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন আমরা অনেক কিছু আবেগ দিয়ে বিচার করেছিলাম। এখন তথ্যের পথে, যুক্তির পথে হাঁটা দরকার। আমাদের সমাজে ইতিহাসচর্চার ধারাটি খুব দুর্বল। আবেগতাড়িত হয়ে আমরা অতিরঞ্জন করি। আবার রাজনৈতিক মতলব থেকেও আমরা ইতিহাসের বিকৃতি ঘটাই। এভাবেই আমরা তৈরি করে চলেছি একের পর এক মিথ।
একাত্তর নিয়ে আমাদের সমাজে, সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অনেক গল্প। একটা পরিপূর্ণ ইতিহাস লেখার অনুষঙ্গ যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও আমরা এখনো তার সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। আমরা দশটা ভালো বই লিখতে পেরেছি কি? লেখালেখি করতে গিয়ে দেখেছি, নির্ভরশীল তথ্য ও উপাত্তের জন্য এখনো আমাদের হাত বাড়াতে হয় দেশের বাইরের লেখক-গবেষকদের কাছে। গত পাঁচ-দশ-বিশ বছরে বেশ কিছু তথ্যবহুল বইয়ের খোঁজ আমরা পেয়েছি। এসব লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত কিংবা পাকিস্তানের লেখকেরা। ‘বাঙালির ইতিহাস নাই’ বলে উনিশ শতকের কথাসাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে আক্ষেপ করেছিলেন, তা এখনো প্রাসঙ্গিক।
একাত্তরে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ঠান্ডা লড়াইয়ের ঘূর্ণিতে পড়ে গিয়েছিল। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই আমাদের সঙ্গে ভারতের একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। একাত্তরের শেষার্ধে আমরা মিত্র হিসেবে পেলাম সোভিয়েত ইউনিয়নকে। একদিকে ভারত-চীন দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে চীন থেকে গেল পাকিস্তানের পক্ষে। বাংলাদেশ নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন প্রশাসন ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের মধ্যে দ্বৈরথ ছিল। আন্তর্জাতিক কূটনীতির সরল অঙ্কের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যা’র ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে ইয়াহিয়া প্রশাসনের পক্ষেই থাকল। সারা দুনিয়ায় জনমতের একটা বড় অংশ এবং গণমাধ্যমে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ, বিশেষ করে গণহত্যা এবং শরণার্থী সমস্যা নিয়ে হইচই হলেও জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো সমর্থন পাওয়া যায়নি। ডিসেম্বরের দিনগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন বারবার ‘ভেটো’ ক্ষমতা প্রয়োগ না করলে যে কী হতো, বলা মুশকিল। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো ছিল প্রবাসী সরকার ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং উপদলীয় কোন্দল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ নিয়ে রীতিমতো জুয়া খেলেছিলেন। প্রবল পরাক্রম এক পরাশক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি কোমর সোজা করে আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর ভূমিকা ছিল আঁতুড়ঘরে ধাত্রীর মতো। আমরা এসবের অনেক কিছুই ভুলে যেতে বসেছি।
একাত্তরের অক্টোবর থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে ‘বাংলাদেশ’ নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ শুরু হওয়াটা শুধু সময়ের ব্যাপার। ২৩ নভেম্বর ভারতের স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের ইন্সপেক্টর জেনারেল মে. জে. সুজন সিং উবান তাঁর বাহিনী নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সূচনা করলেন অপারেশন ইগল। তাঁর সঙ্গে একটি দল নিয়ে ছিলেন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (মুজিব বাহিনী) পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক শেখ ফজলুল হক মনি। তত দিনে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড তৈরি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা এত দিন সব ধরনের সাহায্য পেয়ে আসছিলেন ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছ থেকে। এবার ভারতের সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করল। ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরা যৌথ বাহিনীর কমান্ড হাতে নিলেন। এটা হয়েছিল ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি চুক্তির মাধ্যমে। ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তার পরের ঘটনাগুলো চলছে সরলরেখায়। যৌথ বাহিনী ১৪ ডিসেম্বরেই ঢাকা ঘিরে ফেলে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
ডিসেম্বরে যুদ্ধ শুরু করার ভারতীয় সিদ্ধান্তটি হুট করে নেওয়া হয়নি। সিদ্ধান্তটি এপ্রিলেই নেওয়া হয়েছিল। প্রস্তুতির জন্য সময়ের দরকার ছিল। সেই প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় নভেম্বরের মাঝামাঝি। তারপরও ঝুঁকি ছিল। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া যাবে কি না, এ নিয়ে শঙ্কা ছিল। ইন্দিরা গান্ধী সারা দুনিয়া ছুটে বেড়িয়েছেন এই সমর্থনটুকু পাওয়ার জন্য। তারপরও শেষ রক্ষা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দেওয়ায়। ওই সময় নিরাপত্তা পরিষদের উত্থাপিত প্রস্তাব অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো ঠিকই, কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ফিরে যাওয়ার একটা সুযোগ থাকত। এ নিয়ে খোদ পাকিস্তানেও জল অনেক ঘোলা করা হয়েছিল। এ জন্যই বোধ হয় পাকিস্তানিরা কখনোই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত, বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধীকে মাফ করবে না। কেননা, তাদের কৌশলের কাছে হেরে গিয়েছিল পাকিস্তান সরকার। তাদের সাধের পাকিস্তান ‘ভেঙে’ গিয়েছিল।
একাত্তর সালের ডিসেম্বর মাসটাকে বলা যায় একধরনের ‘এসক্যােলটর’। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র পর্বটি নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরে এসে প্রচণ্ড গতি পায়। বলা যায়, একাত্তরের ডিসেম্বরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ‘ফিফথ গিয়ারে’ চেপেছিল। বাঙালির সর্বাত্মক জনযুদ্ধের কারণে পাকিস্তানিরা এতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল যে অগ্রগামী যৌথ বাহিনীর আঘাতে তারা একেবারেই ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে চলছিল অন্য রকম নাটক। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাস লিখতে বসলে নিউইয়র্কের ওই অধ্যায়টিকে অবশ্যই আলোচনায় আনতে হবে। ওই সময় নিউইয়র্কে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন একজন বাঙালি, সমর সেন। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের বাঘা বাঘা কূটনীতিকদের সঙ্গে প্রবল বিক্রমে তিনি বাংলাদেশের হয়ে লড়ে গেছেন। তাঁর ভূমিকার পুরোপুরি মূল্যায়ন এখনো হয়নি। চার বছর পর, ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর ওপর একটা হামলা হয়েছিল। তখন তিনি ছিলেন ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত। বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর কী অমার্জনীয় ভাষা!

মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনি কি পরিচয় গোপন রাখতে চান
আমি প্রথম আলোর নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
View Mobile Site
   
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ই-মেইল: info@prothom-alo.info
 
topউপরে