সব

স্বাধীনতার ৪৬ বছর, পাওয়া না–পাওয়ার হিসাব

তামান্না ইসলাম, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

আমার বুদ্ধি হয়ে দেখেছি স্বাধীন বাংলাদেশ। একটি পরাধীন দেশের নাগরিক হয়ে থাকতে কেমন লাগে আমার জানা নেই। আমার জানা নেই নিজের মায়ের ভাষা ছাড়াও বাধ্যতামূলকভাবে আরেকটি ভাষায় কথা বলতে, লিখতে কেমন লাগে। জানা নেই চাকরি, শিক্ষা সবকিছুতে সুবিধাবঞ্চিত হতে কেমন লাগে। অর্থনৈতিকভাবে নিগৃহীত হতে, রাজনৈতিকভাবে শোষিত হতে বা নিজের অধিকার হারাতে কেমন লাগে জানা নেই। তবে এগুলো কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়। আমি ভাগ্যবান যে এগুলোর কিছুর মধ্যেই আমাকে যেতে হয়নি। আমি জন্মেছি স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ কেন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল? কেন তারা মরিয়া হয়ে উঠেছিল স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য? কেনইবা এত আত্মত্যাগ, ৩০ লাখ মানুষের প্রাণদান? এসব নিপীড়ন, শোষণের অবসান ঘটানোর জন্য তো বটেই। আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য অবশ্যই। তবে তাদের বুকে নিশ্চয়ই ছিল আরও সুনির্দিষ্ট কিছু স্বপ্ন। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, চিকিৎসা, আইন সব ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে যাবে, দেশের মানুষের অভাব কমবে, শিক্ষার হার বাড়বে, বাক স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতার চর্চা হবে, অন্যায়, অবিচার কমবে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে—এসব সাধারণ স্বপ্ন।
সাধারণ মানুষের নিত্য দিনের জীবনের মানকে বাড়াতে যা যা প্রয়োজন, সেসব সাধারণ স্বপ্ন। তারা পেট ভরে খেতে পারবে, মাথার ওপরে ছাদ থাকবে, পরনের কাপড় থাকবে, তাদের কাজ থাকবে, বাচ্চারা স্কুলে যাবে, মনের শান্তিতে নিজের ধর্ম, সংস্কৃতির চর্চা করবে, নিজের ভাষায় কথা বলবে, সবাই মিলে মিশে থাকবে, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণের সংখ্যা কমে যাবে, বিনা চিকিৎসায় রোগী মারা যাবে না, ন্যায্য দাবির জন্য ঘুষ দিতে হবে না, মানসম্মান নিয়ে নিরাপদে থাকবে এতটুকুই তাদের আশা।
আসুন একটু ভেবে দেখা যাক ৪৬ বছর বয়সী স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ তার অতি সাধারণ মানুষের এই সাধারণ স্বপ্নগুলোর ঠিক কতটা পূরণ করতে পেরেছে? ৪৬ বছর কিন্তু কম সময় নয়। যদিও একটি নতুন রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক কাঠামো গঠন করতে সময় প্রয়োজন। বিশেষ করে সেই রাষ্ট্র যদি হয় অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপ্রতুল প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী কিংবা থাকে ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
আমি আমার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের দেখা বাংলাদেশকে তুলনা করতে পারি। প্রথমেই যদি বলি অর্থনীতির কথা। আমার মনে আছে ছোটবেলায় যে পরিমাণ ভিক্ষুক দেখতাম শহরে, আজকাল সে সংখ্যা অনেক কমেছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের জীবনযাপনের মান বেড়েছে, ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে গ্রামে ও শহরে। সব মিলিয়ে বলা যায় দেশের অর্থনীতি মজবুত হয়েছে আগের চেয়ে।
ছোটবেলায় শহরগুলোর বাইরে হাতেগোনা কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল। এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত গ্রামেও। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা একটি দেশের শিল্প কাঠামো, অর্থনীতিসহ উন্নয়নের মেরুদণ্ড। এটি উন্নতির জন্য এক বিশাল পদক্ষেপ।
যোগাযোগ ব্যবস্থারও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। মনে আছে ছোটবেলায় ঢাকা থেকে আমার দাদা বাড়িতে যেতে প্রায় দুই দিন সময় লেগে যেত। সরাসরি সড়ক পথে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। এখন সড়ক পথে অর্ধেক দিনেই সেই দূরত্ব পারি দেওয়া যায়।
মিডিয়ার ক্ষেত্রেও আমরা এগিয়ে গেছি অনেকখানি। ইন্টারনেট, সেলফোন, সামাজিক মিডিয়া সবকিছুর সঙ্গেই দেশের বড় অংশ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম পরিচিত। এতে করে গোটা পৃথিবীর খবর, উন্নয়ন, জ্ঞান, বিজ্ঞান অনেক কিছুই চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। গোটা বিশ্বের সঙ্গেই যোগাযোগ এখন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে।
স্কুল, কলেজ, চাকরি সব ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ এখন অনেক বেশি। মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়েছে। মেয়েদের কর্মসংস্থান অনেক বেড়েছে। দলে দলে মেয়েকে পোশাক কারখানায় কাজে যেতে দেখা যায় এবং শহরে গৃহপরিচারিকা পাওয়া দিন দিন বেশ কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থাৎ মেয়েরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে।
জনগণের গড় শিক্ষার হার আগের চেয়ে বেড়েছে। শিক্ষাই একটি জাতির মূল মেরুদণ্ড।
আমাদের স্বপ্ন পূরণের পথে আমরা অনেকখানি এগিয়ে গেলেও পিছিয়ে আছি অনেক ক্ষেত্রে। এবং সেই ক্ষেত্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষের জীবনের মান নির্ধারণ করতে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এর মধ্যে অন্যতম। এবং এই অস্থিতিশীলতার কারণে দেশে তৈরি হয়েছে নানান অরাজকতা, অবনতি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। দেশে হত্যা, গুম, ধর্ষণ, ঘুষ, অপহরণ, অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। আইনের শাসন নেই বললেই চলে। বড় বড় অপরাধ করেও ক্ষমতাশালী মানুষ বা তাদের আত্মীয়-বন্ধুরা পার পেয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবন কাটছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
বাক স্বাধীনতাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষ মুখ ফুটে কিছু বলতে ভয় পায়। বিভিন্ন অন্যায় দেখেও প্রাণ ভয়ে চুপ করে থাকে। অবস্থা অনেকটা এমন যে ‘দেয়ালেরও কান আছে’। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে করতে যেন সবকিছুই তাদের গা সওয়া হয়ে গিয়েছে।
আরেকটি বড় আশঙ্কা হলো দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অনেকটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। কয়েক বছর আগেও আমাদের দেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই মিলেমিশে সুন্দর একটি পরিবেশে দিন কাটাত। কেউ কারওর ধর্মীয় অধিকার বা চর্চায় বাধা দিত না। ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতিকে গুলিয়েও ফেলত না, কোনো কিছু নিয়েই কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। সম্প্রতি নাস্তিক-আস্তিকের লড়াই, হিন্দু-মুসলিমের মারামারি এগুলো সব রকমের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। দেশে একদিকে যেমন কট্টর মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে গেছে, অন্যদিকে বেড়েছে নাস্তিকতা এবং এই দুই পক্ষই ক্রমাগত একে অপরকে আক্রমণ করে যাচ্ছে। ধর্মীয় পোলারাইজেশনের এক জঘন্য রূপ আমরা দেখছি আজ বাংলাদেশে এবং এতে করে সাধারণ নিরীহ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
ভেঙে গেছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও। দেশে অজস্র প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি গড়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু শিক্ষার মান দিন দিন কেবল নিচেই নামছে। এই পঙ্গু শিক্ষা ব্যবস্থা অচিরেই এই জাতিকেও পঙ্গু করে দিতে পারে, এই আশঙ্কা আছে।
সবশেষে দেশের জনগণের নৈতিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে আশঙ্কাজনকভাবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়ন ঘটাতে হলে সবার আগে এই মূল্যবোধকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

৬৫ বছরে সবচেয়ে কম জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট

৬৫ বছরে সবচেয়ে কম জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট

নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বার্লিনে ইভানকা

নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বার্লিনে ইভানকা

আবার যাত্রী হেনস্তা মার্কিন এয়ারলাইনসে

আবার যাত্রী হেনস্তা মার্কিন এয়ারলাইনসে

‘বিশ্বের পুলিশ’ হওয়া নিয়ে অবস্থান বদলাচ্ছেন ট্রাম্প?

‘বিশ্বের পুলিশ’ হওয়া নিয়ে অবস্থান বদলাচ্ছেন ট্রাম্প?

মন্তব্য ( ১ )

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

হোয়াইট হাউসের পাশের তাঁবুবাসীর চোখে বাংলাদেশ

হোয়াইট হাউসের পাশের তাঁবুবাসীর চোখে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে কাছের...
সোমবার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য ওবামার

সোমবার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য ওবামার

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আবার জনসমক্ষে আসছেন। গত জানুয়ারিতে...
উল্টো পথে ট্রাম্পের রণতরিবহর!

উল্টো পথে ট্রাম্পের রণতরিবহর!

কোরীয় উপদ্বীপ অভিমুখে মার্কিন রণতরিবহর রওনা হয়েছে বলে গত সপ্তাহের প্রথম দিকে...
আ.লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ, মুজিবনগর দিবসের সভা পণ্ড

আ.লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ, মুজিবনগর দিবসের সভা পণ্ড

দুপক্ষের সংঘর্ষ এবং নিউইয়র্ক পুলিশের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের...
অন্যান্য
১১ মে পবিত্র শবে বরাত

১১ মে পবিত্র শবে বরাত

আগামী ১১ মে (বৃহস্পতিবার) দিবাগত রাতে সারা দেশে পবিত্র লাইলাতুল বরাত পালিত...
তিস্তার জল দিতে পারব না বাংলাদেশকে

তিস্তার জল দিতে পারব না বাংলাদেশকে

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তার পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে...
এক নারীকে স্ত্রী দাবি দুই ব্যক্তির!

এক নারীকে স্ত্রী দাবি দুই ব্যক্তির!

পটুয়াখালীর বাউফলে এক নারীকে (২২) দুই ব্যক্তি স্ত্রী হিসেবে দাবি করছেন। এ নিয়ে...
লবণ কম খেলেই রক্তচাপ কমে না

লবণ কম খেলেই রক্তচাপ কমে না

সবার মধ্যে সাধারণ একটি ধারণা হলো, লবণ কম খেলে রক্তচাপ কমে। সাম্প্রতিক এক...
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info