সব

মনসুরাদের জীবন বদলে দিয়েছে পাটপণ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট সংস্করণ

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত এমডিজি মূল্যায়নের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে অতিথিরা l প্রথম আলোসংসার চলত কীভাবে, কী খেতেন—এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে মনসুরা বেগমের চোখে আসে জল। কারণ, নুন আনতে যে পান্তা ফুরাত তাঁর সংসারে। সেখানে জীবন রঙিন নয়, সাদাকালো। মনসুরা বেগম বললেন, অন্যের জমি বর্গা চাষ করে ভাত জোটানোই কঠিন ছিল। পরিবারে সপ্তাহে এক দিন হয়তো তরকারি রান্না হতো। মাছ-মাংস তো দূরের কথা।

মনসুরার জীবনের এই অবস্থা সাত-আট বছর আগেকার। এখন তাঁর ঘরে প্রতিদিনই তরকারি রান্না হয়, একমাত্র মেয়ে স্কুলে যায়। স্বামীর পাশাপাশি নিজেও আয় করেন। দুজনের আয়ে সহায়তা থাকে মেয়েরও। আর তাঁদের পরিবারের এই আয়ের উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ পাটপণ্য। পাটের সুতা অথবা কাপড় কিনে নিয়ে মনসুরা পাপোশ, ব্যাগ, শতরঞ্জি, টেবিলের মাদুরসহ বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করেন। অনেক সময় তাঁর পণ্য ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানিও হয়।

মনসুরার বাড়ি রংপুর সদর উপজেলার শ্যামপুর গ্রামে। তিনি ২০১৪ সালে কেয়ার বাংলাদেশের একটি প্রকল্পে পাটপণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ পেয়ে নিজ বাড়িতে উৎপাদন শুরু করেন। তাঁর মতো অনেক নারী প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন। কেয়ার বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় নেওয়া ‘সুইচ এশিয়া জুট ভ্যালু চেইন’ প্রকল্পের আওতায় রংপুর, কুড়িগ্রাম, যশোর ও সাতক্ষীরার প্রায় দুই হাজার গ্রামীণ নারীকে পাটপণ্য উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে জানান প্রকল্পের দলনেতা শেখর ভট্টাচার্য।

এসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি পাটপণ্য উৎপাদকদের নিয়ে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল তিন দিনের পাটপণ্য মেলা। এ মেলায় ১৭টি স্টলে পাট দিয়ে তৈরি মেয়েদের হাতব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, সোফার কুশন, পর্দা, জুতা, মাদুর, ল্যাপটপের ব্যাগ, মানিব্যাগ, পাপোশ, শোপিস, অফিসের ফাইল ফোল্ডার, স্কুলব্যাগ, জুতাসহ বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন উদ্যোক্তারা।

মেলার শেষ দিন ছিল গতকাল বুধবার। এদিন দুপুরে মেলায় গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন পণ্য দেখছেন। অনেকের চোখে ছিল বিস্ময়—পাট দিয়ে এত পণ্য তৈরি করা যায়! সাভার থেকে ঢাকায় ঘুরতে আসা রোকসানা বেগম মেলা থেকে একটি ব্যাগ ও দুটি শোপিস কিনেছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখে ভালো লেগেছে, এ কারণে একটি ব্যাগ কিনলেন। দামও বেশ সস্তা মনে হলো।

মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখা গেল, দাম আসলেই তুলনামূলক কম। কারণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এসব পণ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাতে তৈরি করেন। সেলাই যন্ত্রেরও কিছু কাজ আছে। তবে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ লাগে না।

মনসুরা বেগম বলেন, শুধু তিনিই পণ্য তৈরি করেন না, পাশাপাশি স্থানীয় নারীদের দিয়েও ঠিকায় কাজ করান। তাঁদের অনেককে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। রংপুরের শ্যামপুর গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৫০০ জন এসব পাটপণ্য তৈরিতে যুক্ত। এর আগে যেসব নারী শুধু গৃহস্থালি কাজ করতেন, তাঁরা এখন কাজের ফাঁকে ফাঁকে পাটপণ্য তৈরি করে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করেছেন। মাসে একেকজনের আয় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা।

মনসুরার স্বামী আবদুল জলিলও এখন পাটপণ্য তৈরি করেন। তাঁদের সম্মিলিত আয় মাসে সাত-আট হাজার টাকা। কার্যাদেশ বেশি পেলে আয়ও বেশি হয়।

বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানিতে সরকার এখন ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়। তবে মনসুরার মতো স্থানীয় বাজারনির্ভর উদ্যোক্তাদের সেই সহায়তা নেই। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা মনসুরার পক্ষে রপ্তানিকারক হওয়া কঠিন। নিজের ব্যবসার একটা নামই তিনি ঠিক করতে পারেননি। তবে তিনি রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে কার্যাদেশ নিয়ে পণ্য তৈরি করেন। এখন পর্যন্ত ১২ জন বিদেশি ক্রেতা তাঁর বাড়িতে গিয়েছেন।

আরেক নারী উদ্যোক্তা খালেদা সুলতানার কাছে পাটপণ্য উৎপাদন এখনো ব্যবসা হয়ে ওঠেনি। তিনি একে নেশা মনে করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে চাকরি নিয়েছিলেন। সেই চাকরি ছেড়ে ২০১০ সালে পাটপণ্য উৎপাদন শুরু করেন। এখন বনশ্রীতে একটি ছোট কারখানা আছে তাঁর।

খালেদা সুলতানা বলেন, তিনি এখনো বিনিয়োগ পর্যায়ে আছেন। তবে শুরু হয়েছিল রপ্তানি দিয়ে। অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক ও আয়ারল্যান্ডে পাটপণ্য রপ্তানি করেছিলেন। তবে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁর ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি করেছে। কয়েকজন বিদেশি ক্রেতা আসার কথা ছিল, আসেননি। এরপর গত দুই বছরে বিদেশ থেকে কোনো কার্যাদেশ না পেয়ে তিনি দেশীয় বাজারে নজর দিয়েছেন।

বেনোয়ারা বেগম পাটপণ্যের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বছরে প্রায় ১০ লাখ ডলার বা ৮ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয় তাঁর। করবী হ্যান্ডিক্র্যাফটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ থেকে পড়াশোনা শেষে একটি বায়িং হাউসে চাকরি নিয়েছিলেন। ২০০১ সালে চাকরি ছেড়ে পাটপণ্য উৎপাদন শুরু করেন। এখন দুটি কারখানা হয়েছে। সেখানে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন।

বেনোয়ারা বেগম বলেন, ইউরোপে পাটপণ্যের বাজার খুব উজ্জ্বল। সেখানকার সুপার মার্কেট থেকে পলিব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগের চাহিদা আসছে।

কেয়ার বাংলাদেশের সুইচ এশিয়া প্রকল্পের কারিগরি বিশেষজ্ঞ আরশাদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, বহুমুখী পাটপণ্যের বাজারটি বাংলাদেশ ঠিকভাবে ধরতে পারছে না। ভারতের রপ্তানি এ ক্ষেত্রে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় বাংলাদেশের অনেক কম।

চামড়াবিহীন জুতায় বড় স্বপ্ন

চামড়াবিহীন জুতায় বড় স্বপ্ন

ধনীদের জন্য পয়মন্ত ২০১৬ সাল!

ধনীদের জন্য পয়মন্ত ২০১৬ সাল!

ইথিওপিয়ায় বাংলাদেশের কারখানা চালু সেপ্টেম্বরে

ইথিওপিয়ায় বাংলাদেশের কারখানা চালু সেপ্টেম্বরে

২০১৯ সাল থেকে বড় প্রভাব ফেলবে অর্থনৈতিক অঞ্চল

২০১৯ সাল থেকে বড় প্রভাব ফেলবে অর্থনৈতিক অঞ্চল

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
1 2 3 4
 
আরও মন্তব্য

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

পুরোনো মোটরসাইকেল মেলা video

পুরোনো মোটরসাইকেল মেলা

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র আজ শুক্রবার থেকে...
default image

ইউএনডিপির সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি মানব উন্নয়নে মধ্যম মানে বাংলাদেশ

গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়সহ সামাজিক বিভিন্ন সূচকে উন্নতি করেছে বাংলাদেশ।...
default image

অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র জারি ব্যাংকের সহযোগী কোম্পানির পরিচালক সর্বোচ্চ ৯ জন

রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর...
ঢাকায় শুরু গাড়ি ও বাইক মেলা

ঢাকায় শুরু গাড়ি ও বাইক মেলা

ঢাকায় শুরু হয়েছে ১২তম মোটর শো, বাইক শো, কমার্শিয়াল অটোমোটিভ শো এবং অটো পার্টস...
অভিযান চলছে, সরানো হচ্ছে বাসিন্দাদের

অভিযান চলছে, সরানো হচ্ছে বাসিন্দাদের

সিলেট মহানগরের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানায় অভিযান...
বিশ্বসভায় যেতে চায় বাংলাদেশ

একাত্তরের গণহত্যা বিশ্বসভায় যেতে চায় বাংলাদেশ

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে শুরুতে...
ছবিতে অভিযানের প্রস্তুতি

ছবিতে অভিযানের প্রস্তুতি

সিলেট মহানগরের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানায় অভিযান...
এবার বুফনের ‘১০০০’

এবার বুফনের ‘১০০০’

শুক্রবার নিজের ক্যারিয়ারের ১০০০তম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচটি খেলতে নেমেছিলেন...
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    
© স্বত্ব প্রথম আলো ১৯৯৮ - ২০১৭
সম্পাদক ও প্রকাশক: মতিউর রহমান
সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভেনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫
ফোন: ৮১৮০০৭৮-৮১, ফ্যাক্স: ৯১৩০৪৯৬, ইমেইল: info@prothom-alo.info