তিনটি লাশ উদ্ধার, নিখোঁজ অর্ধশত

শতাধিক যাত্রী নিয়ে মেঘনায় লঞ্চডুবি

মুন্সিগঞ্জ, গজারিয়া ও সোনারগাঁ প্রতিনিধি | তারিখ: ০৯-০২-২০১৩

  • ১ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ইসমানিরচরে মেঘনা নদীতে গতকাল শুক্রবার সকালে বলগেটের ধাক্কায় একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে গেছে। লঞ্চটিতে যাত্রী ছিল শতাধিক। তাদের মধ্যে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে অর্ধশতাধিক। বাকিরা সাঁতরে এবং অন্য নৌযানের সহায়তায় তীরে উঠেছে। রাত ১২টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় ডুবে যাওয়া লঞ্চ ও লাশ উদ্ধারে তৎপরতা চলছিল।
মারা যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে দুজন নারী ও একজন শিশু। এদের মধ্যে দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা হচ্ছে চাঁদপুরের মতলব উত্তরের চন্দ্রারকান্দি গ্রামের ময়না (২৭) ও উত্তর মুক্তিরকান্দির প্রিন্স (১৪ মাস)। লাশ দুটি তাদের স্বজনেরা নিয়ে গেছে। অপর লাশটি নদীর তীরেই ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল সাতটার দিকে নারায়ণগঞ্জ ঘাট থেকে শতাধিক যাত্রী নিয়ে চাঁদপুরের মতলবের মাছুয়া খালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে এমএল সারস লঞ্চটি। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী অতিক্রম করে মেঘনা নদীতে ঢোকার পর এর পেছনে পেছনে চলতে শুরু করে বলগেট ফিরোজা ফারজানা। বলগেটটি খালি ছিল। গজারিয়া উপজেলার ইসমানিরচরের কাছে পৌঁছার পর বলগেটটি পেছন থেকে লঞ্চকে ধাক্কা দেয়। এতে লঞ্চটি কাত হয়ে ডুবে যায়। এ সময় যাত্রীরা সাঁতরে তীরে ওঠার চেষ্টা করে। তখন আশপাশের কয়েকটি ট্রলার কিছু যাত্রীকে উদ্ধার করে।
লঞ্চের বেঁচে যাওয়া যাত্রী কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার কেতুন্দি গ্রামের আবদুস সালাম (৬৫) জানান, লঞ্চটি আগে আগে চলছিল, আর বলগেটটি ছিল পেছনে। এভাবে প্রায় আধা ঘণ্টা বলগেটটি লঞ্চকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে। তখন লঞ্চটির পেছন দিকে বলগেট ধাক্কা দিলে লঞ্চটি ডুবে যায়। তিনি লঞ্চের জানালা দিয়ে বের হয়ে সাঁতরাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে একটি ট্রলার এসে তাঁকে উদ্ধার করে। ওই ট্রলার তাঁর মতো আরও অনেককে উদ্ধার করে।
ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধারে নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। বেলা দুইটার দিকে ডুবুরিরা প্রায় ১০০ ফুট পানির নিচে লঞ্চটি শনাক্ত করেন। লঞ্চ ও লাশ উদ্ধারে কাজ শুরু করে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের কয়েকটি দল।
ডুবুরি দলের নেতৃত্বদানকারী বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরি আবদুর রাজ্জাক জানান, লঞ্চটি পানির নিচে বাঁ দিকে কাত হয়ে ছিল। রাত নয়টা নাগাদ লঞ্চটি টেনে তীরের কাছাকাছি আনে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। তখনো এর ভেতর থেকে লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ জানায়, ঘটনার পর পরই বলগেট ফিরোজা ফারজানাকে আটক করা হয়েছে। তবে এর চালকসহ সঙ্গে থাকা শ্রমিকেরা পালিয়ে গেছেন।
ইসমানিরচরে গিয়ে দেখা যায়, মেঘনার তীরে ভিড় জমিয়েছেন নিহত ও নিখোঁজদের স্বজনেরা। স্ত্রী হাজেরা বেগমকে খুঁজে ফিরছেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর ছেঙ্গারচর গ্রামের সাইফুল ইসলাম। তিনি ছেলে ফয়সাল ও স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন। ফয়সাল তীরে উঠতে পারলেও হাজেরা এখনো নিখোঁজ।
উদ্ধার তৎপরতায় ধীরগতি: সকাল আটটায় ডুবলেও রাত নয়টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নিখোঁজদের স্বজনেরা অভিযোগ করছেন, কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করেই উদ্ধারে গাফিলতি করছে। অনেক লাশ এর মধ্যে ভেসে গেছে। একপর্যায়ে উদ্ধার তৎপরতার ধীরগতিতে স্বজনেরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান সামসুদ্দোহা খন্দকার জানান, লঞ্চটি উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। লঞ্চটি শনাক্ত করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আজকের (গতকাল) মধ্যেই লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শাহাবুদ্দিন খান জানান, উদ্ধার তৎপরতা ও নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ ঘোষণা: জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ ও লঞ্চ মালিক সমিতি তাৎক্ষণিকভাবে দাফন ও অন্যান্য কাজের জন্য নিহতদের প্রতি পরিবারকে ৫৩ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ ৪০ হাজার, জেলা প্রশাসন ১০ হাজার ও লঞ্চ মালিক সমিতি তিন হাজার করে টাকা দেবে।
তদন্ত কমিটি: লঞ্চডুবির ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান উপসচিব হাবিবুর রহমান। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের পক্ষে প্রধান প্রকৌশলী ফখরুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস এম মাহফুজুল হককে। প্রথম দুটি কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে এবং শেষের কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে ২০১২ সালের মার্চ মাসে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার চরকিশোরগঞ্জে মেঘনা নদীতে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় এমভি শরীয়তপুর-৩। এ ঘটনায় ১৪৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর এক বছরের মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ইসমানিরচরের কাছে এই লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটল।
খালেদা জিয়ার শোক: মেঘনায় লঞ্চডুবিতে প্রাণহানি এবং নিখোঁজের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়। গতকাল এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় দেশবাসীর মতো আমিও গভীরভাবে শোকার্ত ও মর্মাহত হয়েছি।’ একই সঙ্গে এ ঘটনায় হতাহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান খালেদা জিয়া।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।


সাইনইন

মন্তব্য প্রদানের জন্য সাইনইন করুন 

 

Ahmed Hafiz

Ahmed Hafiz

২০১৩.০২.০৯ ০৪:২০
আল্লাহ সবাইকে হেফাজত কর।