ঐতিহ্য-গোল্লাছুট প্রথম আলো গল্পলেখা প্রতিযোগিতা ২০১১ সালে পুরস্কার পাওয়া গল্পগুলো ছাপা হচ্ছে

বৃষ্টি

তাবাসসুম কবীর | তারিখ: ২৫-০১-২০১৩

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

ক-বিভাগ: তৃতীয়
শীতের বুড়িটা কেবল আয়েশ করে লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়েছে। ঠিক তখনই ঠক-ঠক-ঠক। ভীষণ জোরে কড়া পড়ল দরজায়।
বড্ড বিরক্ত হলো শীতবুড়ি। এই অবেলায় কে এল? রোদ নেই আজ তিন দিন। আকাশ ঢেকে আছে কালো মেঘে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে। কিন্তু শীতবুড়িকে না জানিয়ে বৃষ্টি আসবে না কখনো। তবে কি বৃষ্টি কড়া নাড়ছে?
লেপ-কাঁথা সরিয়ে বিছানা থেকে উঠতে না-উঠতেই আবারও ঠক-ঠক-ঠক।
যাহ্! একটুও ধৈর্য নেই দেখছি। রাগে গজগজ করতে লাগল শীতবুড়ি। একটুতেই বিরক্ত সে।
ছিটকিনিটা খুলে দরজার একটার অংশ সামান্য ফাঁকা করে উঁকি মারল।
চোখে খুব একটা ভালো দেখে না সে। বুঝতে পারল না কে এসেছে। কুয়াশা নয় তো? চেঁচিয়ে জানতে চাইল, কে? জবাব এল, আমি বৃষ্টি গো, শীতবুড়ি। ভালো আছ?
অবাক হলো শীতবুড়ি, বৃষ্টি! এই অসময়ে! বৃষ্টি জবাব দিল, বৃষ্টির আবার সময়-অসময়! যখন সুযোগ পাব, তখনই তো আসব।
শীতবুড়ি বলল, তা কেন এসেছ, ঝটপট বলে ফেলো। বৃষ্টি বলল, কেন এসেছি, এটা বুঝি বুঝতে তোমার বাকি আছে? আমাকে একটা দিন ঝরতে দাও।
শীতবুড়ি বলল, বাহ্ রে। দেখতে পাচ্ছ না, এখন শীতকাল চলছে। এই শীতকালে বুঝি বৃষ্টি ঝরে? এমনিতেই তোমার দাদা মেঘ আকাশ দখল করে রেখেছে। সূর্যের দেখা পাচ্ছি না তিন দিন। ওকে সরে যেতে বলো।
বৃষ্টি বলল, অনেক দেশেই তো শীতকালে বৃষ্টি ঝরে। শীতবুড়ি বলল, অনেক দেশ আর বাংলাদেশ এক কথা নয়। বৃষ্টি বলল, আমাকে ঝরতে দিলেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে। মেঘ সরে যাবে। আবার সূর্যের দেখা পাবে তুমি। এমনিতেই তিন দিন ধরে সূর্যের দেখা পায় না শীতবুড়ি, তার ওপর সাতসকালে ঘরের দরজায় বৃষ্টি, মেজাজটা আর ঠিক রাখতে পারল না সে। চেঁচিয়ে বলল, যা বলছি, তা-ই করো। বেয়াদব বৃষ্টি! এই বুড়ো মানুষের সঙ্গে তর্ক করিস! কত্ত বড় সাহস তোর। যা, ভাগ! এই শীতে তোকে বের হতে বলেছে কে? যে বলেছে, তার চৌদ্দগুষ্টি আমি উদ্ধার করব।
বলেই ধড়াম করে দরজা লাগিয়ে দিল বৃষ্টির মুখের ওপর। তারপর লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল আবার। বৃষ্টি আর কী করে! ফিরে গেল নিজের আস্তানায়। বৃষ্টির এই অবস্থা দেখে বৃষ্টির দাদা মেঘ আরও দুই দিন আকাশ দখল করে রেখেছিল। বুড়োদের রাগ একটু বেশিই থাকে, কী বলো?
বসন্তেও কিন্তু একবার বের হয় বৃষ্টি। সোজা চলে যায় বসন্তের কাছে। রাজা বসন্ত তখন ফুলের পরিচর্যা করায় ব্যস্ত ছিলেন। এত্ত এত্ত ফুল! দেখেন আর মুগ্ধ হন তিনি। কত্ত রঙের ফুল! কত্ত সুগন্ধিওয়ালা ফুল! বসন্ত ছাড়া কার আছে ফুলের এত সমাহার? কারও নেই।
রাজা বসন্তের কাছে গিয়ে বৃষ্টি বলল, আমি কি ঝরব? রাজা বসন্ত জানতে চাইলেন, কে তুমি? বসন্ত এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যেই তুমি ঝরতে চাও। আমার কোনো ফুল এত তাড়াতাড়ি ঝরার কথা বলে না।
বৃষ্টি বলল, ঋতুরাজ, আপনি বুঝি আমায় চেনেন না? আমি বৃষ্টি। রাজা বসন্ত অবাক হয়ে বলল, বৃষ্টি! এই বসন্তে? কেন!
বৃষ্টি বলল, আমি ঝরলে মাটি আরও রসাল হবে। আর মাটি রসাল হলে আপনার ফুলগুলো আরও বেশি রং ছড়াবে, আরও বেশি সৌরভ দেবে। ঋতুরাজ বলল, দেখো, রাজা হলেও আমি বোকা নই। বোকা হলে এত কাল ঋতুদের রাজা হয়ে থাকতে পারতাম না। তুমি কি আমাকে বোকা পেয়েছ? বৃষ্টি বলল, ছি ছি, এসব কী বলছেন?
ঋতুরাজ বলল, হতচ্ছাড়া, বোকা না ভাবলে কেমন করে এখন ঝরার কথা বললি। এটা কি তোদের ঝরার সময়? এখন ঝরে ঝরে আমার ফুলগুলোর সৌন্দর্য নষ্ট করার তালে আছিস?
যেখান থেকে এসেছিস, সেখানে ফিরে যা।
বসন্ত ঋতুরাজ। মানে ঋতুর রাজা। তার কথা অমান্য করে এমন সাধ্য কার আছে? কাজেই ফিরে গেল বৃষ্টি। একদিন বসন্ত চলে গেল। পৃথিবী রেখে গেল গ্রীষ্মের কাছে। বেচারা গ্রীষ্ম। হইচই না করে থাকতে পারে না। প্রথম দিনই কালবৈশাখীকে খবর দিল সে। গ্রীষ্মের দাওয়াত পেয়ে আর কি দেরি করে কালবৈশাখী? শোঁ শোঁ শব্দে গর্জন করতে করতে ছুটে এল। তার সঙ্গে বৃষ্টিও এল। বৃষ্টিকে দেখে কিন্তু প্রচণ্ড রেগে গেল গ্রীষ্ম। জানতে চাইল, তোকে কে আসতে বলেছে? বৃষ্টি বলল, কেউ না। গ্রীষ্ম রেগে গিয়ে বলল, তাহলে কেন এসেছিস? বৃষ্টি বলল, আমার দাদা মেঘ তো এসেছেন? গ্রীষ্ম বলল, কী অবাক কথা? তোর দাদা এলে তোকেও আসতে হবে নাকি? ভাগ বলছি। নইলে এই কালবৈশাখীকে দিয়ে এমন চড়-থাপড় খাওয়াব, তখন আর পালাতেও পারবি না। বেচারা বৃষ্টি ফিরে গেল। বেশ অভিমান নিয়েই ফিরে গেল। ঠিক করল কেউ না ডাকলে আর আসবেই না।
গ্রীষ্ম শেষ হয়েছে। পৃথিবীটা এখন বর্ষার কাছে। আর বর্ষা মানেই তো বৃষ্টি। বর্ষা এসেছে সে-ই কবে। তবু দেখা নেই বৃষ্টির। মেঘ অবশ্য মাঝেমধ্যে ঘুরে বেড়ায় আকাশে। একদিন মেঘকে বলেই বসল বর্ষা, একা একা আসো, তোমার নাতনিটাকে নিয়ে আসতে পারো না?
দাদা মেঘ বলল, ও রাগ করেছে। ডাকলে আসবে না। বর্ষা অবাক হয়ে বলল, রাগ হয়েছে? কার ওপর? ঠিক আছে, কালই ওকে নিয়ে এসো। পরদিন বৃষ্টি এসে হাজির। ঠক-ঠক-ঠক। কড়া নাড়ল বর্ষার দরজায়। বর্ষা তো দরজা খুলে অবাক। চেঁচিয়ে উঠল, বৃষ্টি। এত দিনে বুঝি এই খালার কথা মনে পড়েছে।
তারপর?
তারপর বৃষ্টির দুই পায়ে ২০০ নূপুর পরিয়ে দিয়ে খালা বর্ষা বলল, যা-ও তো এবার, দুনিয়াটা ঘুরে এসো। ব্যস। খুশিতে নাচতে নাচতে বেরিয়ে পড়ল বৃষ্টি।
পাহাড়, নদী, সাগর, বন, লোকালয়, হাটবাজার—কোনো কিছুই বাদ দেয়নি। সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আর সুযোগ পেলেই ঝরঝর করে ঝরছে। তার দুই পায়ে ২০০ নূপুরের শব্দ কারও কারও মনে দোলা দিয়ে যায়। যাদের মনে দোলা দেয়, তারা বর্ষাকালকে ভালোবাসে। আর যাদের মনে দোলা দেয় না, তারা বৃষ্টি, বর্ষাকাল কিছুই ভালোবাসে না। বড্ড বিরক্তি নিয়ে বলে আবার বৃষ্টি! তুমি কোন দলে?
 নেকমরদ আলিমুদ্দীন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়
রানীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।


সাইনইন

মন্তব্য প্রদানের জন্য সাইনইন করুন 

 
আপনার মতামত দিন