বধ্যভূমি থেকে ফেরা তাঁরা চারজন
বুকে ও পিঠে বেয়নেটের আঘাতের কালো দাগ। দুই চোখে বিষাদের ছায়া। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞের মধ্যে বুলেটবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান খন্দকার জালাল আহমেদ। নাটোরের লালপুর উপজেলার নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের তত্কালীন এই কর্মকর্তা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন যুদ্ধদিনের দুঃসহ স্মৃতি।
নাটোর সুগার মিলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জালাল আহমেদের বর্ণনায়, “১৯৭১ সালের ৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় দায়িত্ব পালন করছিলাম। দুজন পাকিস্তানি সেনা আমার দুই পাশে এসে দাঁড়াল। একজন পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে বলল, ‘ইয়ে বাঙালি, মিটিং মে চল’। এ সময় মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা মঞ্জুর ইমান নামের একজন অবাঙালি কর্মচারী বাঙালিদের শনাক্ত করে দিচ্ছিল। এর মধ্যে মিলের কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট আনোয়ারুল আজিমকেও ধরে আনা হয়। একজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা আজিমকে বলে, ‘কিসনে মেজর আসলামকে মারা হায়’? তিনি বলেন, জানি না। আজিম এ সময় হানাদারদের সঙ্গে তর্ক শুরু করেন। পরে নরপশুরা আমাদের মিলের অফিসার্স কোয়ার্টারের পুকুরঘাটে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘাতকদের ১৩টি স্বয়ংক্রিয় এলএমজি একসঙ্গে আমাদের ওপর গর্জে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে পুকুরঘাট লাশের স্তূপে পরিণত হয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মিলে কর্মরত প্রায় ২০০ শ্রমিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। মৃত্যু নিশ্চিত করতে আমাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে পানির মধ্যে গড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। একসময় জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখি, আমার মাথাটা ঘাটের ওপর এবং দেহের অর্ধেক অংশ পানির মধ্যে ডুবে আছে। লাশের স্তূপের মধ্যে উল্টে-পাল্টে জীবন্ত কাউকে খুঁজছিলেন আমার সহকর্মী মেহমান আলী। বুঝলাম, তিনিই আমাকে লাশের স্তূপ থেকে উদ্ধার করেছেন। বহু কষ্টে উঠে বসতেই দেখতে পেলাম, পাশে পড়ে আছে ছোট ভাই মান্নানের লাশ। হত্যার আগে ও আমাকে পালিয়ে যেতে বলেছিল।”
জালাল আহমেদ জানান, ব্রাশফায়ারের আগ মুহূর্তে মান্নান নামের মিলের এক হিসাব সহকারী শায়িত অবস্থায় মাথাটা সামান্য উঁচু করে পবিত্র কোরআন পাঠ করছিলেন। তাঁকে দেখে হানাদারেরা বলে, ‘তুম মৌলবি হু? ছোড় দাও।’ তখন তিনি বলেন, ‘আমি একা যাব না। সবাইকে ছাড়।’ হানাদারেরা তখন মান্নানকে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করে। মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পুকুরে অর্ধেক ডুবন্ত অবস্থায় কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।
১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বাঘাইলের শহীদপাড়া বধ্যভূমিতে শহীদ হন ২৩ জন নিরীহ বাঙালি। হত্যাযজ্ঞের সময় কৌশলে বেঁচে যান আলতাব আলী (৭০)। তিনি জানান, রাত তিনটায় পাকিস্তানি সেনারা অতর্কিত এসে এলাকা ঘিরে ফেলে। এ সময় অনেকে পালিয়ে যায়, কয়েকজন পালানোর চেষ্টা করলে রাজাকার সবুর আলী কৌশলে সবাইকে একত্র করে হানাদারদের খবর দেয়। পাকিস্তানি সেনারা বিভিন্ন ঘরে ঢুকে স্বর্ণালংকার, টাকা-পয়সা লুট করে ও সবাইকে টাকা-পয়সা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় আলতাব আলীর খালা তাঁর কাছে টাকা থাকার কথা বলে আলতাবকে নিয়ে পালিয়ে যান। এদিকে গুলি করে সবাইকে মেরে ফেলা হয়। মাহতাব হারান তাঁর ছোট ভাই আইয়ুব আলী, ভাইয়ের স্ত্রী মনোয়ারা, তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়েকে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার পদ্মাপাড়ের থানাপাড়া বধ্যভূমিতে একাত্তরের ১৩ এপ্রিল হানাদারেরা প্রায় ৪০০ বাঙালিকে হত্যা করে। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে যান আবদুর রউফ (৬০)। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘হানাদারদের হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বাঁচতে এলাকার সহস্রাধিক নারী-পুরুষ ঘর থেকে বেরিয়ে পদ্মাপাড়ে জমায়েত হয়। এমন সময় খবর পেয়ে পাকিস্তানি সেনারা এসে সবার হাত বেঁধে লাইনে দাঁড় করায়। একপর্যায়ে হানাদারেরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই মারা যায়। পাকিস্তানি সেনারা শেষ গুলিটি করে আমাকে। গুলিটি আমার ডান হাতের বাহু ও কাঁধে লাগে। গুলি খেয়ে লাশের স্তূপের মধ্যে পড়ে যাই। পরে পাকিস্তানি সেনারা লাশগুলো জ্বালানোর কথা বলে পেট্রল আনতে যায়। এই ফাঁকে আমি ওঠে দৌড়ে নদীতে ঝাঁপ দিই। নদী থেকে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে লাশগুলো জ্বালিয়ে দিতে দেখি।’
আরেক বধ্যভূমি ঢাকার মিরপুরের জল্লাদখানায় মুক্তিযুদ্ধের সময় ২০-২৫ হাজার বাঙালিকে হত্যা করা হয়। সেখান থেকে দৈবক্রমে বেঁচে যান শেখ শরীকুল ইসলাম (৫৪)। তিনি জানান, ২৮ জুলাই হানাদারেরা তাঁকে ধরে নিয়ে যায় মিরপুরের জল্লাদখানায়। জবাই করার জন্য ছুরি চালানো হলেও এক বিহারির সাহায্যে তিনি পালিয়ে বাঁচেন। এখনো তাঁর শরীরে পাকিস্তানি বাহিনীর পৈশাচিক নির্যাতনের চিহ্ন।
পাঠকের মন্তব্য
- ২০০৯.১২.১৫ ১২:৩০
- পাক-হানাদার-রাজাকার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ প্রক্রিয়ার সাথে এ বছর ঘটে যাওয়া বিডিআর হত্যাযজ্ঞের অনেক মিল আছে।
- ২০০৯.১২.১৫ ১৭:০১
- গত ৩৮ বছরে এগুলি পরকাশ পায়নি কেন ?







সাইনইন
মন্তব্য প্রদানের জন্য সাইনইন করুন