গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের প্রতিবেদন
ট্রাস্টের মাধ্যমে গ্রামীণফোন পরিচালনার সুপারিশ
মুঠোফোন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন লিমিটেডের লাইসেন্স অতিসত্বর স্থগিত করার সুপারিশ করেছে গ্রামীণ ব্যাংক কমিশন। তবে কমিশন মনে করে, একটি চলমান প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর পরিচালনা বন্ধ করা ঠিক হবে না।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে এই সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন এই লাইসেন্স ট্রাস্টের মাধ্যমে কিংবা গ্রামীণ টেলিকমের অনুকূলে দেওয়া যেতে পারে।
গ্রামীণফোন লিমিটেডের পরিচালনা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচনার সুপারিশ করেছে কমিশন। প্রথমটি হলো—নরওয়ের প্রতিষ্ঠান টেলিনরকে অতিসত্বর ও শর্তহীনভাবে তার ১৬% শেয়ার গ্রামীণ টেলিকম অথবা গ্রামীণ ব্যাংককে হস্তান্তর করা। মুনাফাসহ এটি ২০০২ সাল থেকে কার্যকর হবে। দ্বিতীয়টি হলো—সব ধরনের লেনদেন হতে হবে স্বচ্ছ ও খোলামেলা প্রক্রিয়ায়।
কমিশন হিসাব করে দেখেছে, এই পরিবর্তনের জন্য গ্রামীণ ব্যাংকের পাওনা কমপক্ষে ছয় হাজার কোটি টাকা হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে একটি বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণফোন বলেছে, ‘সম্প্রতি গ্রামীণফোনের লাইসেন্স স্থগিত করার বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের সুপারিশের সংবাদ আমাদের কাছে হতবাক হওয়ার মতো। এটা যদিও গণমাধ্যমের একটি খবর, তবে এই বিষয়ে আমরা কোনো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা কিংবা সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো তথ্য (কমিউনিকেশন) পাইনি।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘তার পরও আমরা বিশ্বাস করি এটা একটা অনুমান। এটা গ্রামীণফোনের ব্যবসায় কিংবা দৈনন্দিন কার্যক্রমে প্রভাব ফেলবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিফিকেশন না পাব, তার আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে মন্তব্য করতে আমরা অক্ষম। আমরা আমাদের শেয়ারধারী ও গ্রাহকদের নিশ্চিত করতে চাই, গ্রামীণফোন আগের মতো ব্যবসায় পরিচালনা করে যাবে।’
এদিকে এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুরো প্রতিবেদনটি আমি পড়িনি। এক নজরে দেখেছি। গ্রামীণফোনের ব্যাপারে আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে কমিশন। সেগুলো পাওয়ার পর বলা যাবে, তার আগে নয়।’ তদন্ত প্রতিবেদনটি অন্তর্বর্তীকালীন কেন—জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, কমিশন এখনো অনেক তথ্য জোগাড় করতে পারেনি। তাই অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন দিয়েছে।
প্রতিবেদনে যা আছে: কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর গ্রামীণ টেলিকম, নরওয়ের টেলিনর ও গণফোন একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এই গোষ্ঠীর নাম দেওয়া হয় গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়াম। এই কনসোর্টিয়াম মুঠোফোনের লাইসেন্স নেওয়ার দরপত্রে অংশ নেয়। গ্রামীণ টেলিকম এই দরপত্রের প্রয়োজনীয় আর্থিক নিরাপত্তা ও ‘বিড বন্ড’ জোগাড় করবে বলে জানানো হয়। এই কনসোর্টিয়ামে গ্রামীণ টেলিকমের সাড়ে ৪৪ শতাংশ, টেলিনরের ৫১ শতাংশ ও গণফোনের সাড়ে ৪ শতাংশ শেয়ার ছিল। তবে সমঝোতায় বলা হয়েছে, কার্যক্রম শুরু হওয়ার ছয় বছর পর টেলিনর তার শেয়ার ৩৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার অভিপ্রায় রাখবে এবং গ্রামীণ টেলিকমের সেই শেয়ার প্রথম প্রত্যাখ্যান করার অধিকার থাকবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের ১১ নভেম্বর এই লাইসেন্স প্রদান-সংক্রান্ত চুক্তি সই করে গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়াম ও সরকার। পরে ১৯৯৬ সালের ২৮ নভেম্বর গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়াম নামে লাইসেন্স দেওয়া হয়। পরে ১৯৯৯ সালের ৮ মার্চ গ্রামীণ কনসোর্টিয়ামের নাম বদলে গ্রামীণফোন লিমিটেড করা হয়।
গ্রামীণ ব্যাংক কমিশন দরপত্রের সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় অথবা বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশনে (বিটিআরসি) এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রামীণফোন লিমিটেডকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করার অনুরোধ করে কমিশন। সে সময় গ্রামীণফোন লিমিটেড নরওয়ে থেকে কাগজপত্র আনতে এক মাস সময় চায়। কমিশন বলছে, দরপত্রের সেই কাগজপত্র এখনো পায়নি।
কমিশন আরও মনে করে, মুঠোফোনের লাইসেন্স পেতে গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়ামের দরপত্র-প্রক্রিয়ায় একটি গুরুতর ভুল করেছে সরকার। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, তিন প্রতিষ্ঠানের (গ্রামীণ টেলিকম, টেলিনর ও গণফোন) প্রত্যেকেই পৃথক প্রতিষ্ঠান (নন-বাইন্ডিং) এবং নিবন্ধনহীন। কনসোর্টিয়ামটি আইনসিদ্ধ ছিল না। ফলে কনসোর্টিয়াম দরপত্রে অংশ নিতে পারে না। তাই তাদের দরপত্রের প্রস্তাব তখনই বাতিল করা উচিত ছিল। এ ছাড়া দরপত্রে গুরুতর আরও খুঁত ছিল। তার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে লাইসেন্স দেওয়ার একমাত্র কারণ ছিল এর সুফল গ্রামীণ ব্যাংকের ভূমিহীন ও দরিদ্র নারীদের কাছে যাবে।
কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের পর্ষদ সভাগুলোর নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসও একই কথা বলেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী নিজে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন, কারণ লাইসেন্স দেওয়া হলে গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রাহক বিশেষ করে নারী ও ভূমিহীনরা সুবিধাভোগী হবেন।
লাইসেন্স পাওয়ার সময় সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়ামের পক্ষে সই করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে কমিশনের প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছরের ২৪ নভেম্বর কমিশনের কাছে গ্রামীণফোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ে চুক্তি ও অন্যান্য কাগজপত্রে সই করেছেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নন। এরপর কমিশনের পক্ষ থেকে এই অবস্থার উত্তরণের উপায় ব্যাখ্যা করার জন্য তাঁকে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু তার আগেই তাঁকে তাঁর পদ থেকে বিদায় নিতে হয়।
কমিশন আরও মনে করে, গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম গঠনের জন্য যে সমঝোতা স্মারক হয়েছিল তা মুঠোফোনের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। লাইসেন্স পাওয়ার চুক্তি করার সময় বলা হয়েছিল, গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়াম কোম্পানি আইন দ্বারা নিবন্ধিত। তাই এই কনসোর্টিয়ামের তিনটি পক্ষই দায়ী ও তাদের আইনের আওতায় আনার যোগ্য।
আবার চুক্তির তিন বছর পর গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়ামের নাম পরিবর্তন করে গ্রামীণফোন লিটিটেড নাম ধারণ করাও একধরনের বিধিভঙ্গ বলে মনে করে কমিশন। চুক্তিতে শর্ত রয়েছে যে মুঠোফোন লাইসেন্স হস্তান্তরযোগ্য নয়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের কোনো পরিবর্তন করতে হলে প্রাথমিকভাবে প্রথম পক্ষের (সরকার) উদ্যোগ বা অনুরোধ করতে হবে, কোনোভাবে দ্বিতীয় পক্ষ (গ্রামীণফোন কনসোর্টিয়াম) নয়। কিন্তু সরকারি কাগজপত্র ঘেঁটে এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই পরিবর্তন হয়েছে গ্রামীণফোন লিমিটেডের ইচ্ছায়।







Akas
২০১৩.০২.১৯ ০৮:৫২মোঃ সালাহ্উদ্দীন
২০১৩.০২.১৯ ০৯:৫৬আসলেই তাই, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে!!!
Sujon
২০১৩.০২.১৯ ১১:২৫Susmit
২০১৩.০২.১৯ ১২:০৪