শুদ্ধ বলি মায়ের ভাষা
-
মডেল: বিপাশা ও অভি পোশাক: নিত্য উপহার
ছবি: কবির হোসেন
-
উচ্চারণের ক্লাস নিতে এসে নরেন বিশ্বাস বলতেন, ঠিকভাবে বাংলা উচ্চারণ না করলে বিপদ। উদাহরণ দিতেন, ‘আমরা আমড়া খাই’ বাক্যটি দিয়ে। বলতেন, এখানে ‘র’ আর ‘ড়’ ঠিকভাবে উচ্চারণ না করলে বাক্যটি হয়ে যাবে, ‘আমরা আমরা খাই’—যার মানে শুধু আমরা কজন মিলেই কিছু একটা খাই। আর যদি দুটোই ‘ড়’ হয়ে যায়, তাহলে বাক্যটি দাঁড়াবে ‘আমড়া আমড়া খাই’—যার কোনো অর্থ নেই। উচ্চারণ ঠিকভাবে না করলে বাংলা ভাষা তার মাধুর্য হারায়।
সত্যিই তো! উচ্চারণ ঠিক না হলে কষ্ট তো লাগেই। ইংরেজি কয়েকটা শব্দের কথা বলে ফেলা যাক। বাজেট, প্রজেক্ট, বায়োলজি, ডিজিটাল। অনেক মানুষই এই শব্দগুলোর ‘জ’-কে ইংরেজি Z-এর মতো উচ্চারণ করেন। কিন্তু পরিষ্কার ‘জ’ উচ্চারণই কাঙ্ক্ষিত। স্টাইল করতে গিয়েই হয়তো এই বিড়ম্বনার জন্ম। উচ্চারণ, উপস্থাপনা নিয়ে কত যে সমস্যা আমাদের! কারণ হিসেবে আঞ্চলিকতাকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। মায়ের ভাষা শুদ্ধতম ভাষা। সিলেটে কিংবা চট্টগ্রামে, নোয়াখালীতে কিংবা নেত্রকোনায় যে মানবশিশু জন্ম নিচ্ছে, সে তো কথা বলবে তার মায়ের ভাষার উচ্চারণেই। সে ভাষা কখনোই অশুদ্ধ হতে পারে না।
তাহলে ‘কেক’কে ‘ক্যাক’, ‘চোর’কে ‘চুর’, ‘এবং’কে ‘অ্যাবং’, ‘ব্যতিক্রম’কে (বেতিক্রম) ‘ব্যাতিক্রম’ উচ্চারণ করা কি দোষের নয়?
অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম জানাচ্ছেন, না। এটা দোষের নয়। যে এলাকায় বেড়ে ওঠা, সেই এলাকার মানুষদের সঙ্গে তো সেই উচ্চারণেই কথা বলতে হবে। তবে, বাংলা ভাষার পরিচর্যাটাও জরুরি। যাঁরা ওই এলাকার উচ্চারণের সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত নন, তাঁদের সঙ্গে সবার গ্রহণযোগ্য একটা কার্যকর ভাষাতেই কথা বলা দরকার। আঞ্চলিক ভাষাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। কিন্তু যদি জনসভা, সেমিনার হয়, ক্লাসের বক্তৃতা হয়, তবে সেখানে পোশাকি ভাষায় কথা বলার চর্চা করাই ভালো।
অনেকে আবার যেমন-তেমনভাবেই সবখানে কথা বলার পক্ষপাতি। অধ্যাপক মনজুরুল সে রকম মানুষদের বলেন, তোমার মা যখন বাড়িতে রান্না-বান্না করেন, তখন কেমন শাড়ি পরেন?
সাদামাটা শাড়ি। কবুল করে নেন যেমন-তেমন বাংলার পক্ষপাতি যুবক।
আর যখন তিনি কোনো বিয়েবাড়ি যান কিংবা কোনো দাওয়াতে?
তখন একটু ভালো শাড়ি পরেন। চুল বাঁধেন।
তাহলে? তাহলে ভাষার ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে আমরা মাথায় রাখব না কেন? যখন সবার মধ্যে আমি, তখন আমাকে তো সেই ভাষাই ব্যবহার করতে হবে, যা সবাই বুঝবে!
আবৃত্তিকার, অভিনয়শিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বললেন, শিশু যখন জন্মাচ্ছে, সেটা চট্টগ্রামে হোক বা হোক তা কুষ্টিয়ায়, ছোটবেলা থেকেই যদি মুখগহ্বরের যে প্রত্যঙ্গগুলো দিয়ে উচ্চারণ করা হয়, সেগুলোর সঙ্গে তাকে পরিচিত করে দেওয়া হয়, তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকে না। কোনো উচ্চারণভঙ্গীই অশুদ্ধ নয়। মা যে ভাষায় কথা বলছে, সেটাই শুদ্ধ। কিন্তু কয়েক কিলোমিটার পর পরই উচ্চারণ পাল্টাতে থাকে। বলার ভঙ্গি পরিবর্তিত হতে থাকে। ফলে শিষ্ট উচ্চারণ করার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে। একটি জাতীয় মান ভাষা থাকা জরুরি। অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তা দরকার।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম জোর দিলেন আরেকটি জায়গায়। অকারণেই কখনো কখনো বাংলার মধ্যে ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়। এই সংকর ভাষায় কোনো মাধুর্য নেই। নিজ ভাষার প্রতি দরদহীনতারই উদাহরণ এটা। বাংলা যখন বলব, তখন বাংলাই বলব। ইংরেজি বললে ইংরেজি। বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলাটা ঠিক নয়। এখন এফএম রেডিও থেকেও রোগটা ছড়াচ্ছে সর্বত্র।
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বললেন, আমি ফ্রান্সে গিয়েছিলাম। সেখানে ফরাসিরা শুধূ নিজেদের ভাষাতেই কথা বলে। কিন্তু যারা তাদের ভাষা বোঝে না, তাদের জন্য দ্বিতীয় বা আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজির সাহায্য নেয়। কিন্তু কখনো দুটো ভাষার মিশেলে কথা বলে না।
আজকাল গান শুনতে গেলে ‘র’ ধ্বনিটিই শোনা যায় বেশি। ‘র’, ‘ড়’, ‘ঢ়’—এই তিনটি ধ্বনি যেন মিলেমিশে ‘র’ হয়ে গেছে। আবার, যারা একটু ইংরেজির ছোঁয়া পেয়েছে, তারা ‘র’-কে দিয়েছে ছুটি। তারা নিশ্চিন্ত মনে বলছে, ‘তোমাড় কি আকাশেড় তাড়া দেখাড় সময় আছে?’
হাসলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বললেন, ‘দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে “আষাঢ়সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল’ গানটি যিনি শুনেছেন, তিনি ‘ঢ়’ ধ্বনিটির মাধুর্য বুঝতে পারবেন। অথচ জর্জদা (দেবব্রত বিশ্বাস) গান ছেড়ে যখন গল্প করছেন, তখন কথা বলছেন খাঁটি পূর্ববঙ্গের ভাষায়!
কী করে বাংলা ভাষার মাধুর্য রক্ষা করা যায়?
একটা হচ্ছে পড়ার অভ্যাস। সাহিত্য থেকে ভালো ভালো শব্দ পাওয়া যায়। ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি হলেই উচ্চারণের প্রতি ভালো লাগার জন্ম হয়। আরেকটি হলো, আবৃত্তি সংগঠনগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। সরকার একটা তহবিল করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটে ঢুকিয়ে দিলে একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে উচ্চারণের শিক্ষাটা পাওয়া যেতে পারে। বললেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।
শৈশব থেকেই তো ভাষা বা উচ্চারণের ঠিক পাঠটা নেওয়া দরকার, তাই শিক্ষকদের ভূমিকা অনেক বড়। যিনি শিশুদের শিক্ষা দেবেন, তাঁকে অবশ্যই জাতীয় মান ভাষার (কথ্য এবং লেখ্য) ওপর পরীক্ষায় পাস করতে হবে। শিক্ষকেরা তৈরি হলে সনদও পাবেন। এরপর শিশুদের সামনে যাবেন তাঁরা। বললেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়।
দেখা যাচ্ছে, উচ্চারণে আঞ্চলিক টান আসলে কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু সবাই যেন বুঝতে পারে, সেই শিষ্ট বা মান ভাষার প্রতিও ভালোবাসা থাকলে যোগাযোগের ক্ষেত্রটি মধুর হয়।
খাওয়ার সময় আমরা ডাল খাই, সবজি খাই, আবার মাছ-মাংসও খাই। সে রকমভাবে সবকিছুই আমাদের শিখতে হবে। সেটা না হলে যে কেউ আমরা বলে বসতে পারি, ‘বারির পাশে আড়শীনগড়...’
না, বাবা! ‘বাড়ির পাশে আরশীনগর’ই বলতে চাই আমরা!







abdul
২০১৩.০২.১৯ ০৩:২১Mohammad Shah Alam
২০১৩.০২.১৯ ০৮:৩৩