যুদ্ধাপরাধের বিচার
শাহবাগ আজকের একাত্তর
শাহবাগ থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যে আন্দোলন, ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে সে আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আহমেদ রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি তাঁকে চিনতাম না। পত্রিকা পড়ে জেনেছি, সম্ভাবনাময় এই স্থপতি ও ব্লগারের বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৫ বছর।
অহিংস আন্দোলনকে তাহলে সহিংসতার মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য করা হলো? একাত্তর কীভাবে তবে শেষ হবে?
২.
বেশি দিন আগের কথা নয়। মনে কিছু প্রশ্ন প্রবল হয়েছিল। একাত্তরের বধ্যভূমিসংলগ্ন এলাকাগুলোয় যে শিশু-কিশোর-তরুণেরা বড় হচ্ছে, তারা সেসব গণহত্যা সম্পর্কে কতটুকু কী জানে? সে বিষয়ে কি তারা ভাবে?
সময়টা ২০০৯ সালের শেষ ভাগ, চলমান বিচারের প্রস্তুতির কাল। বিবিসি বাংলা বিভাগের জন্য একটি রেডিও ধারাবাহিক করার লক্ষ্যে শহরে ও গ্রামে পাঁচটি এলাকা বেছে নিয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছিলাম।
তখন দেখেছিলাম, শিশু-কিশোর-তরুণদের অনেকে ঘরের কাছের গণহত্যার ইতিহাস সম্পর্কে জানে না বা ভাসা ভাসা জানে। একটা বড় অংশের জীবন-জীবিকার জন্য লড়াইয়ের কাছে অতীত অনুসন্ধিৎসা প্রাসঙ্গিক হওয়ার অবকাশ পায়নি। কিন্তু এসব ছাপিয়ে মনে ছাপ রেখেছে এদের অনেকের জানার সুযোগের অভাববোধ, ন্যায়ের জন্য আকুতি—যার মধ্যে বর্তমানের অন্যায্যতা-বঞ্চনাজাত ক্ষোভও মিশে থাকে। আবার, কারও কারও চিন্তায় একেবারেই যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপারও দেখেছিলাম।
অন্যদিকে, একাত্তরে স্বজন-সহায় হারানোর, মুক্তিযুদ্ধে অংশী হওয়ার স্মৃতি যাঁদের আছে, তাঁদের অনেকের কথায় দেখেছিলাম অমীমাংসিত ক্ষত, অসহায়ত্ব—দিনে দিনে জমা হওয়া হতাশা, ক্ষোভ ও বৈষম্য-বঞ্চনার অনুভূতি।
হিন্দুধর্মাবলম্বীদের প্রত্যন্ত একটি গ্রামে স্থানীয় একজন ‘দালাল’-এর সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা একাত্তরের এক দিনে ৭৮ জনকে হত্যা করেছিল। দালালেরা ঘর-মন্দির লুটপাট করে, পুড়িয়ে দিয়ে সচ্ছল গ্রামটির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। এর জেরে একদা ধনী পরিবারগুলো স্বাধীনতার পর দ্রুত দরিদ্র হয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীন দেশে ওই দালাল ক্ষমতাশালী হয়ে টিকে থাকেন এবং তাঁর বা তাদের ইন্ধনে সরকারের বাহিনী গ্রামবাসীকে আবার নিগৃহীত করে। একাত্তরের অপরাধীদের এমন ক্ষমতার আস্ফাালন ও তাদের দ্বারা কোণঠাসা হয়ে থাকার কথা শুনেছিলাম অন্যান্য এলাকাতেও, সরকার এবং কালনির্বিশেষে।
শাহবাগের জনস্রোত দেখে আমার এসব মানুষের কথা মনে পড়ে যায়। এখানকার ভিড়ে কিশোর-তরুণ-যুবকেরা যেমন নজর কাড়ে, তেমনি বয়স্ক মানুষের উপস্থিতিও খুব কম নয়।
৩.
শাহবাগে যে শক্তি একত্র হচ্ছে, আসছে, যাচ্ছে, তার মধ্যে বৈচিত্র্যের দিকটি নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। নিকট-অতীত অবধি কোনো জমায়েত হতো একটি কোনো কেন্দ্র থেকে আহ্বানের ভিত্তিতে। নতুন প্রযুক্তির যোগাযোগ একজন থেকে বহুজনে তরঙ্গায়িত হয়, জাল বোনে। সেই জমায়েতে বৈচিত্র্য অবশ্যম্ভাবী, যেমন অবশ্যম্ভাবী এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারী তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি। সে সঙ্গে সংবাদমাধ্যমে প্রতিফলিত আদর্শের আবেগ ও সংহতি এবং বর্ণাঢ্য উৎসবমুখরতাও মানুষকে আকর্ষণ করেছিল।
এ বৈচিত্র্যের মধ্যে একাত্মতার ভিত্তি ১৯৭১—সে সময়কার অপরাধীদের, অপরাধেরও, সদম্ভে জিতে চলার বিরুদ্ধে মানুষের রায়। এ একাত্মতা বাংলাদেশের অস্তিত্বের গোড়ার প্রশ্নাবলিতে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ও জীবনদর্শনের সঙ্গে একাত্মতা। সেখানে অন্যান্য প্রশ্নও যোগ হয়েছে। যেভাবে দেশ-রাজনীতি-সমাজ চলছে, যে ব্যবস্থা চলছে, তার প্রতি ক্ষোভ এবং তীব্র প্রত্যাখ্যান এই একাত্মতার একটি বড় দিক। এভাবে ১৯৭১ যোগসূত্র স্থাপন করেছে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গেও।
কোনো দিন রাজনীতি করেননি, রাজনীতিবিমুখ, অনেক তরুণ এখানে শামিল হচ্ছেন। একাত্তরের দায় মিটিয়ে কলঙ্কমোচনের তাগিদ তো আছে, তাঁদের নিজেদের বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের তাড়নাও বড় বিষয়। চারপাশ যেমন চেহারা নিচ্ছে, তাতে এ তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন বলে ভাবছেন। প্রচলিত রাজনীতি ও বিদ্যমান ব্যবস্থার কাছে তাঁরা আশা বা আস্থার কিছুই দেখতে পান না।
নিজের ঘরের এক তরুণের কাছে জেনেছি, ইসলামী ছাত্রশিবিরকে প্রতিহত করার পথ দেখতে পেয়ে তিনি শাহবাগের রাজপথে নেমেছেন। শিবিরের কর্মকাণ্ডকে তিনি নিজের পথচলার বাধা হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
ঘরেরই আরেক তরুণ বলেছেন, স্বার্থের দাস হাত মেলানোর হিসাবি রাজনীতি, সে রাজনীতির অপ্রতিহত নিশ্ছিদ্র অচলায়তন, একের পর এক স্ববিরোধিতা, নির্লজ্জতা, অপরাধ, দুর্নীতি, আইনের অপশাসন, চারপাশে বিদ্যমান অরাজকতা, অন্যায়, অবিচার, অধিকারবঞ্চনা ও অসংগতির বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র ক্রোধ হয়। তাঁর চোখে শিবির মতান্ধতার নিগড়ের প্রতীক, ধর্মকে ব্যবহার করা অন্ধতার বিপুল শক্তির পরিচয়, যে শক্তি তাঁর অসাম্প্রদায়িক মুক্ত চিন্তা নিয়ে বেঁচে থাকার পথ রুদ্ধ করতে চায়। এই রাজপথে তিনি মুক্ত স্বাধীন নিজস্ব স্থান খুঁজে নিচ্ছেন, প্রতিবাদী হচ্ছেন, ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন।
এ তরুণদের মতো আরও কেউ কেউ হয়তো একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আগে সক্রিয়ভাবে ভাবেননি। কিন্তু তাদের টিকে থাকার দম্ভ এঁদের লজ্জিত করেছে, ক্রুদ্ধ করেছে। এ আন্দোলনের জমিনে এঁদের মধ্যে বিষয়টির শেষ দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রতিদিন বলশালী হয়েছে। একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি দেখতে চেয়েছেন এঁরা—সব ভেঙেচুরে নির্মূল হোক, নির্মল হোক। এ আন্দোলন ব্যাহত হলে, সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহূত হলে, এখানে তাঁদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হলে, সেটা তাঁদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করবে।
বিদ্যমান অচলায়তনের বিরুদ্ধে এই ক্ষোভের বিষয়টিকে এখন পর্যন্ত শাহবাগ উপেক্ষা করেনি। এখানে সরকারি দল ও নানা ধারার বাম দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তরুণেরা শামিল রয়েছেন। আন্দোলনের উদ্যোগ, ব্যবস্থাপনা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের একটি মুখ্য ভূমিকাও থাকছে। তবে ব্যবস্থাবিরোধী পুঞ্জীভূত ক্ষোভের কথা তাঁদের সবাইকে মাথায় রাখতে হচ্ছে। এ শক্তির সংহতি নির্ভর করছে বহুমতকে ধারণ করার ওপর।
৪.
বিচিত্র সুর ও প্রতিবাদী ভাবনাকে শাহবাগে ও দেশের অন্যান্য জায়গায় সবচেয়ে এক করেছে ‘ঘাতক-দালাল সব যুদ্ধাপরাধী’র ফাঁসির দাবি। স্লোগানে, সুরে, ধিক্কারে, কপালের ফেট্টিতে, হাতে-মুখে আলপনায় নানা রূপে এ দাবি উঠছে। কখনো সবকিছুকে ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে জিকির, ‘ফাঁসি, ফাঁসি’। ‘জবাই করো’ ধ্বনিও উঠেছিল, তবে সংগঠকেরাই সজাগ হয়ে সেটার বিকল্প দিয়েছেন ‘ধোলাই করো’।
শাহবাগকে এখন অবধি সরকারের কোনো বিরোধিতার মোকাবিলা করতে হয়নি। বরং এখানে নানা রূপে সরকারের সমর্থন-সহায়তা এসেছে। ছিল নিরাপত্তাবোধ। পরিবার নিয়ে অনেকেই ঘুরে গেছেন। ছোট ছোট শিশুও ফাঁসির দাবিতে গলা মিলিয়েছে। এ দৃশ্য আমাকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ও বিপন্ন করেছে। তা ছাড়া, রাজীব হত্যার আগে পর্যন্ত এখানে প্রতিবাদের পাশাপাশি উৎসব-উদ্যাপনের লক্ষণীয় একটা সুর ছিল। ফাঁসির দাবিতে হয়তো সেই সুর এসে মিলে গেছে। ঐক্যের আত্মপরিচয় হিসেবে স্লোগানে শুধু ‘বাঙ্গালি’ শুনলেও খটকা লাগে। এ ঐক্যে তো এ দেশের অন্য জাতির মানুষও শামিল আছেন।
ফাঁসির দাবি হয়তো অনেক কিছুরই প্রতীক হয়ে উঠেছে। নিশ্চিহ্ন করা না হলে এই অপরাধীরা কোনো না কোনো সময় ছুটে যাবে, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে না—এ বিপন্নতাবোধ কাজ করেছে। তা ছাড়া, যার যায়, সে-ই মর্মবেদনা বোঝে। বদলা নেওয়ার, অঙ্ক মেলানোর, বিপন্নতাবোধের, আস্থাহীনতার তাগিদকে বুঝতে পারি।
কিন্তু ফাঁসির দাবির বিদ্যমান আবহে মনের মধ্যে প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। এ আবহ কি প্রতিশোধের আবেগকে লালন করছে? দাবিটা যে আসলে ন্যায়বিচারের, ‘ফাঁসি চাই’-এর তোড়ে, সেই চূড়ান্ত লক্ষ্য ঝাপসা যেন হয়ে না যায়।
‘বিচার’ প্রসঙ্গটিও আমাকে ভাবায়। বিচার যদি চাই, তাহলে সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির নিশ্চয়তা চেয়ে চাপ সৃষ্টি করি কীভাবে? বিচারের বিকল্প কোনো পন্থায় নিষ্পত্তি হবে না বলেই মনে করি। পথের পুরোটাই চলতে হয়। পথ কমানোর কোনো চেষ্টা কি আসলে ফল আনে? তাহলে, সুদীর্ঘ এ পথকেই গড়ে নেওয়ার বিষয়টি বড় হয়ে আসে।
যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের আইনটির যে সংশোধনী হয়েছে, তা নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। দায়ী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিচারের কথা ঢুকেছে শেষ মুহূর্তে, শাস্তির বিষয়টি পরিষ্কার নয়। রয়ে গেল রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ঘোষণার সাংবিধানিক সুযোগ। আর সবার ওপরে রয়ে যায়, বাদী রাষ্ট্রপক্ষের দক্ষতার ঘাটতি ও দুর্বলতার প্রশ্ন। এদিকে নজরদারির গুরুত্ব কখনোই কি কমবে?
জামায়াত-শিবিরের ‘ধর্মের নামে রাজনীতি’ এবং এদের ব্যবসায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার যে দাবি শাহবাগে উঠেছে, সেটার পথও আরও সুদীর্ঘ হবে। এ পথ কণ্টকাকীর্ণ এবং নানামুখী প্রশ্ন-আকীর্ণও হতে পারে।
যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, নিজেই নিজের পথ খুঁজে নিচ্ছে, রক্ত দিয়ে যার মাশুল দেওয়া শুরু হয়ে গেছে, সেটা কি কেবল রাজপথে চললেই লক্ষ্যে পৌঁছাবে? সমাজে, জীবনের প্রতিটি স্তরে, মনের মধ্যে সে আন্দোলন কেমন হতে পারে?
বিএনপির ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো এ আন্দোলনে প্রকাশ্য নয়। সেগুলোর এবং যুদ্ধাপরাধী দলগুলোর সাধারণ সদস্যদের কাছে প্রশ্ন করতে খুব ইচ্ছা করে, নিজের মনের একেবারে একান্তে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও চিহ্নিত অপরাধীদের নিয়ে তাঁরা কী ভাবেন? সেখানে তাঁরা কীভাবে হিসাব মেলান? তাঁদের মন কি কখনো অপরাধবোধে ভোগে না?
৫.
ওপরের প্রশ্নগুলো লিখছি কিন্তু প্রাণক্ষয়ী সহিংসতার আশঙ্কায় বিষাদে মন থমকে যাচ্ছে।
আমরা যাঁরা সাংবাদিক, তাঁদের প্রথম দায়িত্ব ঘটনাপ্রবাহের সত্য জানা এবং পাঠককে তা জানানো। সত্য নিজ গুণে ন্যায়ের পক্ষে থাকে। খোলা মনে এ আন্দোলনের সবলতা ও দুর্বলতা দুই দিকই দেখতে ও দেখাতে পারা আমাদের কাজ। এর পক্ষে ও বিপক্ষে যতগুলো মত ও চিন্তাধারা রয়েছে, যথাসাধ্য সবগুলোর কথা মানুষকে জানানো দরকার। সত্যনিষ্ঠ থেকে যথাযথ প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা তুলে ধরতে না পারলে এমন এসপার-ওসপার সময়কে বোঝা এবং সামনের পথ বেছে নেওয়ার কাজে সাংবাদিকতা মানুষের সহায় হতে পারবে না।
কুর্রাতুল-আইন-তাহিমনা: সাংবাদিক।







A.Forkan
২০১৩.০২.১৯ ০৮:১১Prodip
২০১৩.০২.১৯ ১৩:৩৯