গণিত উৎসব
গণিতকে জয়ের অনন্য আয়োজন
বেলুন উড়িয়ে গতকাল রাজধানীর সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক স্কুল প্রাঙ্গণে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিদের সঙ্গে খুদে গণিতবিদেরা
ছবি: প্রথম আলো
খুদে গণিতপ্রেমী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল রাজধানীর সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক স্কুল প্রাঙ্গণ। সারা দেশ থেকে আসা এসব শিক্ষার্থী আঞ্চলিক পর্যায়ে বিজয়ী হয়ে ঢাকায় এসেছে জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। তাই গণিত নিয়ে তাদের মধ্যে ছিল না কোনো ভয় বা আতঙ্ক।
গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী জাতীয় গণিত উৎসব ২০১৩ এবং একাদশ বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড। চলতি বছরের জুলাইয়ে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠেয় ৫৪তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) বাংলাদেশ গণিত দলের সদস্যদের নির্বাচনের লক্ষ্যে সারা দেশের ১৭টি বড় শহরে আঞ্চলিক গণিত উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এসব উৎসবে ২২ হাজার শিক্ষার্থী সরাসরি অংশ নেয়। তাদের মধ্য থেকে বিজয়ী সেরা ৯৪৬ জন অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও গতকাল উপস্থিত ছিল ৬৪৭ জন শিক্ষার্থী।
দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি এই উৎসবের আয়োজন করে। বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন হয় সকাল সোয়া নয়টায়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যখন প্রথম গণিত উৎসব শুরু করি, তখন চিন্তা করা যায়নি যে, ১১-১২ বছর পরে উৎসবে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেবে।’
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এবং প্রথম আলো ছাড়াও সারা দেশের শত শত স্বেচ্ছাসেবক কর্মী, বন্ধুসভা, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী আর অভিভাবকদের সহযোগিতা না পেলে এই আয়োজন সম্ভব হতো না বলে উল্লেখ করেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘২০২১ সালে বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তিতে সরকার যে পরিকল্পনা-প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, তাতে গণিত অলিম্পিয়াডের কথা উল্লেখ আছে। সে হিসেবে আমরা এই কৃতিত্ব দাবি করতে পারি যে, দেশে আমরা গণিত অলিম্পিয়াডের পথিকৃৎ।’
জামিলুর রেজা চৌধুরী আরও বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশই আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। কিন্তু আমাদের দেশে জাতীয় পর্যায়ে যে উৎসব হয়, তা অন্য কোনো দেশে হয় না। এতে বোঝা যায়, গণিতের প্রতি আমাদের শিক্ষার্থীদের ভীতি অনেক কমে গেছে।’
শুরুর সময় থেকে এখন পর্যন্ত গণিত উৎসবের যে বিস্তৃতি, তার প্রশংসা করেন গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সহসভাপতি অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি বলেন, ১২ বছর আগে আজকের এই দৃশ্য কল্পনাও করা যায়নি। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে পদকপ্রাপ্তরা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই যেকোনো বিষয়ে ভর্তি হতে পারবে বলে তিনি জানান।
সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের অধ্যক্ষ ব্রাদার রবি পিউরিফিকেশনস বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা কোনো দিক থেকে পিছিয়ে নেই। তাদের যদি সুযোগ দেওয়া হয়, বিশ্বের যেকোনো পুরস্কার তারা ছিনিয়ে আনতে পারবে। ডাচ্-বাংলা ও প্রথম আলোর উদ্যোগে এত দিন ধরে যে গণিত অলিম্পিয়াড হয়ে আসছে, তা অবশ্যই জাতির জন্য একটি বড় অবদান।’
শুভেচ্ছা বক্তব্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এস তাবরেজ বলেন, গণিত উৎসবকে আজ শুধু উৎসব বা প্রতিযোগিতা নয়, একে বলা যায়, অঙ্কের প্রতি এত দিন যে ভয়ভীতি ছিল, তা জয় করার একটি সফল আয়োজন। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, তোমরা জাতীয় পর্যায় ছেড়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও সাফল্য বয়ে আনবে।’
গণিত উৎসবকে দেশের সবচেয়ে ‘সংগঠিত উৎসব’ বলে উল্লেখ করেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা বলি এবং বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীরা অঙ্কে ও বিজ্ঞানে এগোতে পারলে বাংলাদেশও এগিয়ে যাবে।’
খুদে গণিতবিদদের উৎসাহ জোগাতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সহসভাপতি গণিতবিদ অধ্যাপক খোদাদাদ খান, গণিদ অলিম্পিয়াডের সহসভাপতি মুনিবুর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ, গণিত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবদুল হাকিম খান, বিজ্ঞানী রেজাউর রহমান, প্রথম আলোর দুই সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম ও আনিসুল হক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস, পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইয়াসমিন হক, গণিত বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক লায়েক সাজ্জাদ এন্দেল্লাহ, ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জাবেদ মোর্শেদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাম্মাদ আলী, এভারেস্ট বিজয়ী প্রথম বাংলাদেশি মুসা ইব্রাহীম, মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল, বাংলাদেশ গণিত দলের কোচ মাহবুব মজুমদার, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান, একাডেমিক কাউন্সিলর মাহমুদুল হাসান, তামিম শাহরিয়ার, উৎসবের সমন্বয়কারী বায়েজিদ ভূঁইয়া প্রমুখ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—এই চার ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীদের জন্য অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের মূল পর্ব একাদশ বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড।
বিকেলে ‘আমাদের প্রশ্ন তোমাদের উত্তর’ পর্বে অংশ নেয় খুদে গণিতবিদেরা। কম্পিউটার বিজ্ঞান, সফটওয়্যার, অপারেটিং সিস্টেমসহ বিভিন্ন বিষয়েও বুদ্ধিদীপ্ত জবাব দেয় বেশ কিছু শিক্ষার্থী। বিভিন্ন বিষয়ে যারা ভালো জবাব দেয়, তাদের বই দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে উঠে আসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়ও। তারা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসি দাবি করে। শিক্ষার্থীরা আশা প্রকাশ করে, একদিন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক লাভ করবে।
শেষে অনুষ্ঠিত হয় শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া ছিল সারপ্রাইজ অনুষ্ঠান। গতকালের উৎসবে বইয়ের স্টলও বসে। অংশ নেয় প্রথমা প্রকাশন, সময় প্রকাশন, তাম্রলিপি, বিজ্ঞান একাডেমি, প্রতীতিসহ কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।
আজ শনিবার সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সকাল সাড়ে আটটায় সমাপনী দিনের উৎসব শুরু হবে। এতে থাকবে গণিতের পট, গম্ভীরা, ভাষা ও দেশের গান ও তৃতীয় বাংলাদেশ রুবিসকিউব প্রতিযোগিতা। বেলা ১১টা থেকে একটা পর্যন্ত সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হবে।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






