রাশিয়ান সার্কাস
বিশ্বখ্যাত রাশিয়ান সার্কাস দেখতে গিয়েছি। সার্কাসের খেলা দেখব না মেয়ে দেখব? ভাবতে ভাবতেই কয়েকটি খেলা শেষ। মেয়েরা প্রত্যেকেই একটু ওপরে ভ্রু এঁকে চোখে মোটা করে আই লাইনার দেওয়ায় চোখগুলো বড় বড় লাগছে, চেহারায় একধরনের মুগ্ধ বিস্ময়ভাব তৈরি হয়েছে। ভাবছি, পরিরা কি এদের চেয়েও সুন্দরী? একটু পরে এক মহাসুন্দরীকে একটা ইলেকট্রিক করাতের নিচে শোয়ানো হলো। কালো পোশাকের এক জাদুকর ভীত কণ্ঠে বললেন, ‘এই সার্কাসে সাধারণত কারও নামই বলা হয় না। কিন্তু রাইসার নাম বলতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ, সামান্যতম ভুলেও সে মারা যেতে পারে।’ পিনপতন নীরবতা। দর্শকদের বুকের মধ্যে ধুকপুক ধুকপুক করছে। সবার সামনে তিনি রাইসার শরীরের মাঝ বরাবর ইলেকট্রিক করাতটি চালিয়ে দিলেন। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। চিৎকারের শব্দে চোখ খুলে দেখি রাইসা দুই টুকরো হয়ে গেছে। এপাশ-ওপাশ দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে। ভাবছি, এই মেয়ের রূপের জাদুতেই তো মুগ্ধ ছিলাম। তাকে কেটে দুই খণ্ড করে জাদু দেখানোর আবার কি দরকার ছিল? একটু পর মেয়েটি বেরিয়ে এসে একটা ভুবন ভোলানো হাসি দিল। চারদিকে মুহুর্মুহু করতালি পড়ে গেল।
প্রতিটি খেলা শেষেই দুজন ভাঁড় মজার কিছু করে। একটু আগে বেলুন ফুলাতে ফুলাতে তারা কেমন করে যেন বেলুনের মধ্যেই ঢুকে গেল। কী অদ্ভুত! এরপর শুরু হলো ঝুলে থাকার খেলা। ৩০-৪০ ফুট ওপরে একটি ঝুলন্ত রিংয়ে পা দিয়ে এক মেয়ে ঝুলছে। তার হাতেধরা আরেকটি রিংয়ে একইভাবে ঝুলছে একলোক। সেই লোকটির কামড়ে ধরা একটি দড়িতে ঝুলছে রাইসা। একজন ভাঁড় মজা করে বলছে, ‘রাইসা যদি আমার ওপর একবার পড়ত, তাহলে খুব আরাম পাইতাম।’ ভাঁড়ের রসিকতায় দর্শকদের হাসি আর থামেই না। হঠাৎ রাইসা সত্যিই ভাঁড়ের ওপর পড়ে গেল।
দুদিন পর একটি পত্রিকায় রাইসার ছবিসহ সাক্ষাৎকার দেখলাম। পাশেই ভাঁড়ের মৃত্যুসংবাদ। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। সাক্ষাৎকারে রাইসাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে—
—তুমি পড়ে গেলে কীভাবে?
আমি পড়ে যাইনি।
—তাহলে?
মিখাইল আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।
—সেকি! ছেড়ে দিল কেন?
সে অনেক কথা।
—তুমি কি সুস্থ হয়ে আবার খেলা দেখাবে?
না।
—কেন?
শুধু হাত-পা ভাঙলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমার তো মন ভেঙে গেছে। খেলা দেখাব কীভাবে?
—মানে?
আমার বয়স তখন ১৭ বছরের একটু বেশি। সবেমাত্র পাইলট ট্রেনিং শেষ করেছি। খনি ব্যবসায়ী বাবা আমাকে দুই সিটের একটি প্লেন কিনে দিলেন। আকাশে মেঘসঙ্গী জীবন আমার ভালোই কাটছিল। মাস তিনেক পরে মস্কোর এক সার্কাস শোতে মিখাইলকে প্রথম দেখলাম। সেই দেখা-ই সব ওলট পালট করে দিল। ওকে আর না দেখে থাকতে পারি না। কাউকে কিছু না বলে সোজা চলে গেলাম মিখাইলের কাছে। সে আমাকে ফিরে যাওয়ার জন্য বোঝাতে লাগল। কিন্তু আমার কথা তো একটাই—
তুমি যেখানে খুশি যেতে পারো, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।
মিখাইল আমাকে বোঝাল, ‘এসব তোমার ক্ষণিকের ভালোলাগা। কদিন পরেই আর ভালো লাগবে না।’
আমি নাছোড়বান্দা, ‘শোনো! বেশির ভাগ মানুষের ভালোবাসার অপর পিঠে ঘৃণা থাকে। কিন্তু আমার ভালোবাসার অপর পিঠেও ভালোবাসা। তোমার জন্য শুধু ভালোবাসাই রেখেছি।’
মিখাইল কিছুতেই বিশ্বাস করল না। কষ্ট পেলাম। খুউব। পরদিন প্লেন নিয়ে ছুটলাম। মস্কোর নীলাকাশে প্লেনের সাদা ধোঁয়া দিয়ে লিখলাম, ‘আই লাভ ইউ, মিখাইল। তোমার সব সময়ের রাইসা।’
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখে একটা কাজ হলো। রাইসা এবং মিখাইল নাম দুটি রাশিয়ার মানুষের মুখে মুখে রটে গেল। কিছুদিন পর একটা অচেনা নম্বর থেকে বেশ কয়েকবার ফোন পেলাম। রিসিভ করলে কোনো কথা বলত না। আবার কলব্যাক করলেও রিসিভ করত না। তার কিছুদিন পর অদ্ভুত সুন্দর একটি বেনামী চিঠি পেলাম—‘একমুহূর্ত দেখব তোমায়, দেখা করব না। মুঠোফোনে হ্যালো শুনব, কথা বলব না।’
ভাবছি, এ আবার কোন পাগল? কদিন পর আবার ফোন এল। রিসিভ করলাম। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তোমার কাছে হেরে গেছি, জানু।’
সেই থেকে একসঙ্গে চলা। আমিও সার্কাসে ঢুকে গেলাম। এ পর্যন্ত অনেক দেশে সার্কাস করেছি। ভালোই ছিলাম। কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয়েছে ভেরোনিকাকে নিয়ে...।
—কী সমস্যা?
মিখাইল তাঁর প্রেমে পড়েছে।
—মানে?
হু। ভেরোনিকার হাতে ধরা রিংয়েই মিখাইল ঝুলছিল। আমি মিখাইলের দাঁতে। ভেরোনিকার কথাতেই মিখাইল আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।
—এসব জানার পরও কেন তুমি তার দাঁতে ঝুলতে গেলে?
গত সাতটি বছর আমার জীবনটা তো ওর প্রেমেই ঝুলেছিল।
শাখাওয়াৎ নয়ন
সিদ্ধেশ্বরী রোড, ঢাকা।
nayonshakhawat@yahoo.com







syed Kamal mohammad Mukul
২০১৩.০২.০৯ ১০:৩২