জলকন্যার চোখে জল
টুন্ টুন্ টুক তা—
টুন্ টুন্ টুক তা—
বাথরুমে পানিভর্তি লোহার বালতিতে অবিরাম, একঘেয়ে তালে পানি পড়েই যাচ্ছে। নিতান্ত অনিচ্ছায় চোখ খুলে পাশ ফিরল মনসুর। মৃদু নড়াচড়াতেই আর্তনাদ করে উঠল চকির ঘুণে ধরা পায়াগুলো। মাথাধরা আর জ্বরের কষ্টের মাঝেও হেসে ফেলে ও। বাথরুমের কলটা সারাবে সারাবে ভেবে হয়ে উঠছে না। চোখ বুঁজে ঘুমোতে চেষ্টা করে মনসুর।
পাড়ারই একটা ফার্মেসিতে কাজ করে সে। ভালোভাবে এইচএসসি পাস করলেও আর লেখাপড়া হয়নি। তারপর এই চাকরি, খুঁড়িয়ে চলা জীবন। নিজের পুরো জীবনটা যেন এক ঝটকায় চোখের সামনে দেখে ফেলে মনসুর। নিঃশ্বাস ভারী হতে থাকে ওর।
আর ভালোবাসা? আরে ধুর ধুর। কেউ কোনো দিন ভালোবাসেনি ওকে। তবে ভাবতে বড় ভালো লাগে, যেন কেউ আছে। যেন এখনই এসে কপালে হাত রেখে জ্বর দেখবে। তাকে বললেই কলের তল থেকে বালতিটা সরিয়ে দেবে। হয়তো মাথায়ও হাত বুলিয়ে দেবে। খুব কাছ থেকে কাচের চুড়ির টুং টাং আওয়াজ আসবে...।
উঠে দাঁড়ায় মনসুর। ভারী মাথাটাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে বাথরুমের দিকে। পুরোনো কাঠের দরজা, নিচের দিকটা পানিতে পচে গেছে। ক্যাচক্যাচ শব্দে ঠেলে খুলে ফেলে সেটা। হঠাৎই উজ্জ্বল আলো ঝলকে ওঠে।
দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে মনসুর। ভ্রম হচ্ছে তার। হ্যাঁ, ভ্রমই তো। নইলে ভেতরে বসা এই মেয়েটি কে? মুখে একটিও কথা সরে না মনসুরের। কোনো এক অমোঘ আকর্ষণ যেন তাকে ভেতরে টেনে নেয়। তার পেছনে ক্যাচক্যাচ শব্দে বন্ধ হয় কাঠের দরজা।
‘তোমার জন্য সারাটা দিন আমার এই পানিতে বসেই কাটাতে হবে দেখছি।’
চোখে কপট রাগ ফুটিয়ে বলে মেয়েটি। ‘তুমি কে?’ অন্যমনস্কভাবে বলে মনসুর। এই প্রথমবার বিষাদের ছায়া পড়ে মেয়েটির চোখে। ‘তুমি এখনো আমাকে মনে রাখতে পারছ না? তুমি জানো না, যত দিন না তুমি ওই দরজার ওপারেও আমাকে মনে রাখবে, তত দিন তোমাকে বারবার আসতে হবে।’ চোখ ছলছল করে মেয়েটির। আহা রে, কী সুন্দর মেয়েটি! কী মায়াকাড়া চেহারা! কোঁকড়ানো চুল আর বড় বড় কালো চোখের শ্যামলা মেয়েটার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারে না মনসুর।
ইতস্তত করে বলে, ‘তোমার নামটা কী?’ পানিভরা চোখ তুলে আগ্রহী ভঙ্গিতে তাকায় মেয়েটি। ‘তুমি তো প্রতিবার আমার একটা করে নাম দাও।’
খুব ভালো লাগে মনসুরের। মেয়েটা এখন আর কাঁদছে না। একটা ভালো নাম দিয়ে খুশি করতে হবে ওকে।
— ‘বৃষ্টি’?
—আগে হয়ে গেছে।
—তাহলে, ‘জ্যোৎস্না’,... ‘চন্দ্রা’?
—সব পুরোনো।
—ঠিক আছে, ‘জলকন্যা’।
—বাহ্, খুব সুন্দর নাম, ‘জলকন্যা’।
খলবলিয়ে ওঠে মেয়েটা। কিছু বলতে গিয়ে হঠাৎ করেই থেমে যায়।
—আমাকে যদি তোমার মনে না-ই থাকে, তাহলে আগে দেওয়া নামগুলো হুবহু বললে কীভাবে?
— জানি না তো!
—দেখো, তোমার সব মনে থাকবে। আমাকে, আমার নাম—সব। একবার খুব জ্বরে আমি তোমার মাথায় হাত রেখে বসেছিলাম। কাচের চুড়িতে খুব শব্দ হচ্ছিল। তোমার যখন সব কথা মনে থাকবে, আমরা তখন একসঙ্গে থাকত পারব।
ফুঁপিয়ে ওঠে জলকন্যা। ওর হাত ধরে মনসুর, নিঃসংকোচে। হ্যাঁ, এই মেয়েটি যে বড় কাছের মানুষ।
‘এ কী! তোমার গায়ে তো খুব জ্বর!’
হাতের চুড়িগুলো খুলে মনসুরের হাতে দেয় জলকন্যা। চুড়ি নেড়ে শব্দ করে ও। জলকন্যা হেসে বলে, ‘চুড়ি বাজিয়ে না ডাকলে তো আসোও না।’
পানিতে হাত ভিজিয়ে ওর কপালে রাখে জলকন্যা। বুকের ভেতরে জমানো সব ক্ষত যেন নিমেষে মিলিয়ে যায়। ঝকঝকে শ্বেতপাথরের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে চোখ বুঝে থাকে মনসুর।
মনসুরের তন্দ্রা কাটে পাড়ার ছেলেদের বাজি ফোটানোর শব্দে, বাথরুমের মেঝেতে বসা অবস্থায়। তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসে। কেন, কখন, কীভাবে বাথরুমে গিয়েছিল, কিছুতেই মনে করতে পারে না ও। হঠাৎ খুব গরম লাগে মনসুরের। পাখাটা চালাতে সুইচ বোর্ডটার দিকে এগিয়ে যায়। ডান হাতটা উঁচিয়ে সুইচটার দিকে নিতেই চোখে পড়ে হাতে ধরে থাকা চারটা রুপোর চুড়ি। মাথাটা ঘুরে ওঠে, দেয়াল ধরে নিজেকে সামলায় কোনোমতে। ফাঁক হয়ে থাকা কাঠের জানালা দিয়ে দখিনা বাতাস এসে কাঁপন ধরিয়ে যায় শরীরে।
কান খাড়া করে শোনে মনসুর। বাথরুমের বালতিতে জল পড়ার শব্দ...
টুন্ টুন্ টুক তা—
টুন্ টুন্ টুক তা—
না। স্বপ্ন নয়, ভ্রম নয়। আছে, সে আছে। ওর পথ চেয়ে আছে। টলমলে পা ফেলে পচা কাঠের দরজাটার দিকে এগোয় মনসুর। সজোরে চেপে ধরে থাকে চুড়িগুলো। কিছুতেই হারাবে না সে, তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা, হঠাৎ পাওয়া আপনজন, এক আশ্চর্য রমণী।
অদিতি ব্রিজেট বিশ্বাস
সেন্ট মার্টিনস প্যাথলজি, পিটিআই মোড়, খুলনা।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






