১ম সেরা

ব্রেইল

| তারিখ: ০৯-০২-২০১৩

  • ১১ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

হাসনাত যখন প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষায় প্রথম হলো, তখন ওর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল। অদ্ভুত সুন্দর, বিনয়ী, মার্জিত এক তরুণ হাসনাত। ভাবগম্ভীর ভরাট কণ্ঠে ও যখন আবৃত্তি করে, আমার মুগ্ধতা বেড়ে যায় আরও শতগুণে। সত্যিই, এবার বুঝি আমি ওর প্রেমে পড়লাম। চোখের কালো চশমা যখন ও খুলে রাখে কদাচিত, সাদা ছড়ি নিয়ে হলের দিকে পা বাড়ায় অথবা পরীক্ষার হলে ‘রাইটার’ নিয়ে আসে, তখনই বোঝা যায় হাসনাতের সঙ্গে পৃথিবী বড় বেশি বেইমানি করেছে। বিধাতা ভুল জায়গায় পাশা খেলেছেন বড় নিষ্ঠুরভাবে।
আমি যে কিনা কোনো ছেলেকেই পাত্তা দিইনি, সেই আমিই হাসনাতের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। সকাল থেকে রাত নয়টা অবধি ক্লাস, লাইব্রেরি, নোট, লাঞ্চ ইত্যাদি ওর সঙ্গে করা শুরু করলাম। আঙুলের স্পর্শে আমিও যেন বুঝতে পারি ব্রেইলি অক্ষরগুলো। আমি ওকে বই পড়ে শোনাই। ও শুনে শুনে মুখস্থ করে। চারপাশের সবাই আমার খুব প্রশংসা করে। আমার চোখ দিয়েই নাকি হাসনাত পৃথিবীর অপরূপ রূপ দেখে।
মাঝে-মাঝে আমার বড় বেশি আফসোস হয়, সারাটা জীবন প্রথম হয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ পর্যায়ে একটা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলের কাছে হেরে গেলাম। মা-বাবার কত স্বপ্ন ছিল, নিজের কত আশা ছিল—প্রথম হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়েই থেকে যাব। কিন্তু হাসনাতের যে প্রখর শ্রবণশক্তি, বিশ্লেষণের এত পারদর্শিতা, মনে হয় বিধাতা শুধু একদিকে না দিয়ে আর সবদিকে ওকে অন্য সবার চেয়ে হাজার গুণ বেশি দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চুড়ান্ত পরীক্ষার ফল বেরোয়। আমি হই প্রথম আর হাসনাত অল্প নম্বরের ব্যবধানে দ্বিতীয়। আমার মনটা ভীষণ ভারী হয়ে যায়। তারপর ক্লাসে এসে দেখি হাসনাত একটা রজনীগন্ধা ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওর পাশে যাই। হাসনাত বলে, নদী, রজনীগন্ধা ফুল তোমার জন্য।
এরপর চলে গেছে বেশ কিছুদিন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ জনপ্রিয়। সবাই যখন আমার দিকে অবাক চোখে তাকায়, আমি সেটা বেশ উপভোগ করি। শুনেছি, হাসনাত বিসিএস দিয়ে চলে গেছে মফস্বলের কোনো এক কলেজে।
একদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে ক্লাস শেষ করে লাইব্রেরির সামনে দিয়ে বাসায় ফিরছি। দেখি, চোখে কালো চশমা আর সাদা ছড়ি হাতে একটা ছেলে ধীর পায়ে এগোচ্ছে। দেখে ভীষণ মায়া হলো। বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। বাসায় এসে মনস্থির করলাম, যাই একবার হাসনাতকে দেখে আসি।
বন্ধুদের কাছ থেকে ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ঠিকানা নিয়ে বের হয়ে পড়লাম পরদিন।
হাসনাতের কলেজে এসে জানলাম ওর কয়েক দিন থেকে বেশ জ্বর, ক্লাসে আসেনি। আমি ওর বাসায় যাই। কপালে হাত দিয়ে দেখি, বেচারা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। আমার হাতের স্পর্শেই হাসনাত বলে—এত দিন পরে তুমি এলে নদী!
আমার বুকের ভেতর কেমন যেন করে। আর কত দিন চেপে রাখা যায়! আজকে যদি না বলি, জানি না আর কবে বলা হবে। কবে আসা হবে আর এই মফস্বলে। সবচেয়ে বড় কথা, এত বড় অপরাধ, এত বড় পাপ যদি হাসনাত ক্ষমা না করে, তবে বিধাতাও মাফ করবেন না। হাসনাত আলতো করে আমার হাতখানা ওর হাতের মুঠোয় নেয়। বলে—এত চুপ করে রইলে কেন, নদী? ক্ষমা চাইতে এসেছ? আমি তো কবেই তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তুমি যখন আমাকে বই থেকে পড়ে শোনাচ্ছিলে আমেরিকায় সিভিল ওয়ার শুরু হয়েছিল ১৮৭১ সালে, ট্যারিফ ল লেখা হয়েছিল ১৮৪০ সালে ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিদিন খুব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কিছু ভুল, বই থেকে আমাকে পড়ে শোনাচ্ছিলে, তখন আমি ঠিক বুঝেছিলাম। স্যার বলেছিলেন, ক্লাসে সাধারণত যারা প্রথম হয়, তাদেরই বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। বিধাতা আমাকে দৃষ্টিশক্তি থেকে বঞ্চিত করেছেন। সুতরাং না পাওয়ার কষ্ট আমার চেয়ে আর কে বেশি বোঝে? বলো, তোমাকে আমি প্রথম হওয়া থেকে বঞ্চিত করি কেমন করে?
আমি ডুকরে কেঁদে উঠি। অতি ক্ষুদ্র কীট মনে হয় নিজেকে। নীরবে, নিভৃতে, গোপনে কত সহজে হাসনাত আমাকে হারিয়ে দিল।
আরিফ মাহমুদ
আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র
arifatlanta@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

zahid

zahid

২০১৩.০২.০৯ ০৫:১৭
LIFE IS FOR STRUGGLE BUT OUR YOUNG GENERATION SPEND THEIR TIME IN BAD CORRUPTED EYE WASH POLITICS.

Ratan Jyoti

Ratan Jyoti

২০১৩.০২.০৯ ০৮:১২
খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে আজ, আরিফ।
হৃদয় ছোঁয়া গল্প।

MD. TASLIM GANI

MD. TASLIM GANI

২০১৩.০২.০৯ ১০:৩৮
EXCELLENT!!! MIND BLOWING

Nizam

Nizam

২০১৩.০২.০৯ ১০:৫৩
Very touchy story.

২০১৩.০২.০৯ ১১:৪৩
"তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দূঃখ দিতে চেয়েছ, দিতে পারোনি।
কি তার জবাব দেবে যদি বলি আমি কি হেরেছি, তুমিও কি একটুও হারোনি?"

Ashik Iqbal Hillol, Rajshahi

Ashik Iqbal Hillol, Rajshahi

২০১৩.০২.০৯ ১১:৫১
আরিফ ভাইকে ধন্যবাদ। গল্প টা সত্যিই হদয় স্পর্শী! মেয়েরা আসলে আমনই হয় হয়তো!!!
২০১৩.০২.০৯ ১২:৪৮
ভাবনার সমুদ্রস্বপ্ন
.................
য়ুনিভার্সিটি শেষ করে একটি প্রাইভেট ব্যাংকে এসিট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করে রাতুল।
দীর্ঘ একটা অভাব জর্জরিত সময় পার করতে হয়েছে। বড় ভাই অসীম পঞ্চম শ্রেণীতে, ছোটভাই সুসীম বছর চার পেরিয়েছে সবে আর রাতুলটা মেজো সন্তান বাবাকে হারাতে হয়েছে শৈশবে। হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল বিক্রি করে চিকিৎসার পর অবশ হয়ে যাওয়া পা'দুটি সচল হল না। অল্প কতুটুকু জমি ছিল, ওগুলো বিক্রি করা যাবে না কারণ বন বিভাগের জমি। জার ফুকের চিকিৎসা নিয়েই এক শীতের পৌষ সকালে পরপারে চলে যায় রাতুলের বাবা।
মায়ের হৃদয় বিদারক কান্না সবসময় কানে বেজেছে।
মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে পরিবার শাকান্নে দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকে।
বাষিক পরিক্ষার পর কতোজনকে ধরে পুরানো বই সংগ্রহ করেছে সন্তানদের জন্য। নাইনে অসীমের পড়ার পাঠ চুকল।
কঠিন এক দুঃসময়ের মধ্যে দিয় সুসীম আর রাতুল পড়াশোনা চালিয়ে গেল।
এস,এস, সি পাশের পর রাতুলকে দূরের এক কলেজে ভর্তি হতে হবে। টাকা পয়সার অভাব। শেষ পর্যন্ত এক পরিবার তিন শিক্ষার্থীকে পড়ানোর বিনিময়ে থাকা খাওয়ার ব্যবস্হা হল। একসময় কোন কিছুকেই না বলার অক্ষমতা রাতুলের পড়ানোর দায়িত্বকে ছাড়িয়ে গেল। নীরবে নিভৃতে একটা ঘটনা ঘটে গেল কেউ বুঝল না দুজন ছাড়া।
রাতুল ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে য়ুনিভার্সিটি ভর্তি হল। বড়মেয়ে স্কুলের ফার্স্ট গার্ল অনামিকার দায়িত্বটা রয়ে গেল।
ভাসিটির ছাত্র সংঘাতে ছাত্রজীবন দীর্ঘায়িত হয় রাতুলের। কলেজ পাশ করে য়ূনিভার্সিতে চান্স পেয়েও ভর্তি হতে পারেনা অনামিকা বাবার কারণে মেয়েকে চোখে চোখে রাখতে। ভাগ্য ভালো রাতুল যে বিষয়ে পড়ে সে বিষয়ে কলেজে সদ্য খোলা অর্নাস
বিষয়ে ভর্তি হয়। যোগাযোগ হয় অনিয়মিত। বিষয় কেন্দ্রিক কথাবার্তায় দুজনের যোগাযোগ।
অর্নাস পরীক্ষা শেষ রাতুলের। ফলাফল আসতে প্রায় চারমাস। অনামিকার মাথায় সিঁদুর দেখে এক তারাভরা রাতে।
অনামিকর নিঃশব্দ কান্নার জল স্বপ্নমৃত্যুর রেখা এঁকে দেয় রাতুলের জীবনে।
গাঁয়ের অন্ধকার পথ আর যেনো শেষ হয় না।
অনামিকার স্বপ্ন ঘোরে কেটেছে সময়।
এখন চুপচাপ ভাবনায় কাটে রাতুলের। মাস্টার্স পর্ব শেষে চাকুরীতে ডুকে।

জীবনটার দিকে ফিরে তাকায় রাতুল। বিশাল এক অব্যক্ত শূন্যতাকে আকড়ে আছে সে।
এই সবুজ দেশ, মা, ভাই সব যেনো বাঁধন ছেড়া।
বের করে শেষ পড়ানো দিন অনামিকার দেয়া ডায়েরীর ভাঁজ থেকে শুকিয়ে যাওয়া গোলাপটি।
আর ভাবনার স্মৃতির স্বপ্নরা কষাঘাত দিতে থাকে রাতুলকে।

mirza farhana yeasmin

mirza farhana yeasmin

২০১৩.০২.০৯ ১৩:২২
অনেক ভাল লেগেছে গল্পটা

Labony Akter

Labony Akter

২০১৩.০২.০৯ ১৩:৪৫
দারুন লিখেছেন!!

roney

roney

২০১৩.০২.০৯ ১৪:২২
অনেক ভাল লেগেছে গল্পটা

manira

manira

২০১৩.০২.০৯ ১৫:২৬
ভাগ্যিস এটা গল্প , মন টা খারাপ করে দিলেন .।
অসাধারন ......।