পরমাণু চুক্তি
কার স্বার্থে রূপপুর পরমাণু প্রকল্প?
রূপপুরে দুটি পরমাণু জ্বালানিকেন্দ্র নির্মাণ বিষয়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ থেকে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি। তাহলেও কিছু প্রশ্ন তুলতেই হবে। ১০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি রি-অ্যাক্টর সরবরাহ বিষয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা পরমাণু জ্বালানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো গত ২ নভেম্বর। খেয়াল করার বিষয়, এই চুক্তির কাছাকাছি সময়েই এক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তিও হয়েছে। এই চুক্তির অধীনে রাশিয়া বাংলাদেশকে সামরিক যান, পরিবহন হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য অস্ত্রপাতি সরবরাহ করবে। পরের চুক্তিটি সম্পাদিত হয় শেখ হাসিনার মস্কো সফরের সময়। চুক্তি দুটি যে কায়দায় সম্পাদিত হলো, তার সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যায় ২০০৮ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি সম্পাদন। উভয় ক্ষেত্রেই পরমাণু প্রযুক্তি ক্রয়-বিক্রয় বড় আকারে সামরিক অস্ত্র হস্তান্তরের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ভারতে অস্ত্র রপ্তানিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তির অন্তরালের উল্টো দিক। এবং যেখানে দৃশ্যত এই দুই ধরনের বাণিজ্যের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগাযোগ না থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়েই দক্ষিণ গোলার্ধের কম উন্নত দেশগুলোয় তাদের পরমাণু প্রযুক্তি ও অস্ত্রের বাজার বাড়াতে উৎসাহী। সে কারণেই প্রশ্ন, রূপপুর প্রকল্প ও প্রতিরক্ষা চুক্তি আসলে কতটা বাংলাদেশের স্বার্থে হয়েছে? জরুরিভাবে বিষয়টা খতিয়ে দেখা দরকার।
রূপপুর চুক্তিতে বাংলাদেশের নিউক্লিয়ার লবি বিরাট সাফল্য হিসেবে দেখাচ্ছে। সেই পাকিস্তান আমল থেকে পরমাণু জ্বালানির স্বপ্ন বাংলাদেশের। কিন্তু এ বিষয়ে প্রথম সমস্যা হলো, পরমাণু চুক্তির বিষয়বস্তুর সামান্যই বাংলাদেশের জনগণের কাছে প্রকাশিত। ২০১২ সালের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সির (আইএইএ) কাছে দেওয়া বাংলাদেশের ‘সেল্ফ-ইভালুয়েশন রিপোর্ট’ থেকে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়া বাংলাদেশকে ভিভিএআর-১০০০ ডিজাইনের দুটি রি-অ্যাক্টর সরবরাহ করবে। এই মডেলটি ১৯৭০ দশকের পানি দ্বারা শীতায়িত ধরনের। নিউক্লিয়ার ফুয়েল রডগুলো শীতল করায় রি-অ্যাক্টরের প্রাইমারি সার্কিটের ভেতর দিয়ে পানি প্রবাহিত করা হবে এবং এই প্রবাহ নির্ধারিত চাপে সব সময় চলবে, যাতে পানি বাষ্পীভূত হওয়ার পর্যায়ে না যায়। রি-অ্যাক্টর কমপ্লেক্সে ব্যবহারের পর এই পানি ছেড়ে দিতে হবে। তার মানে তা পরিবেশে নির্গত হবে। এখান থেকেই প্রশ্নটা আসে যে এর কারণে রূপপুরের জেলেদের কী হবে? কী হবে সেখানকার প্রাণবৈচিত্র্য ও জলদেহের? সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? হ্যাঁ বা না?
পরের প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, রূপপুরের নিউক্লিয়ার রডগুলো কীভাবে সরবরাহ ও ব্যবহারের পর অপসারণ করা হবে? রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজটা বাংলাদেশ করবে না। রাশিয়া রি-অ্যাক্টরের জ্বালানি উপাদান যেমন সরবরাহ করবে, তেমনি তেজস্ক্রিয় রডগুলোর জীবনচক্র ফুরালে তারাই এগুলো ফিরিয়ে নেবে। তাহলেও, এর মানে ঈশ্বরদী ও পাবনার জনগণ আশ্বস্ত হতে পারে না। মূল সমস্যা হলো, ব্যবহূত হয়ে যাওয়ার পর তেজস্ক্রিয় জ্বালানির রডগুলো কোথায় সাময়িকভাবে মজুত করা হবে এবং কীভাবে সেগুলো রূপপুর থেকে পরিবহন করা হবে। ইউরোপে বহু বছর ধরে এ ধরনের জ্বালানি সরঞ্জাম সড়কপথে আনা-নেওয়ার বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদ হয়ে আসছে।
তৃতীয়ত, পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে এই রি-অ্যাক্টর কীভাবে নিরাপদ থাকবে? রুশ কর্মকর্তারা যুক্তি দেবেন ভিভিএআর-১০০০ মডেল বিশ্বের ভয়াবহ পরমাণু বিপর্যয়ের কেন্দ্র চেরনোবিলে ব্যবহূত গ্রাফাইট-মডারেটেড মডেলের থেকে অনেক নিরাপদ বলে প্রমাণিত। চেরনোবিল দুর্ঘটনা রাশিয়ার জন্য এখনো দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে, হাজার হাজার মানুষের ক্যানসারে মৃত্যু, বিরাট এলাকায় কৃষি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং দুর্ঘটনাস্থলকে বিপদমুক্ত করায় বিপুল ব্যয়ের ভারে রাশিয়া জর্জরিত। তার পরও ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমায় আরেকটি পরমাণু বিপর্যয়ের পর রাশিয়ায় একটি তথাকথিত ‘স্ট্রেস টেস্ট’ করা হয়। তাতে দেখা যায়, জাপান ও রাশিয়ার রি-অ্যাক্টরগুলো একই রকম কিছু মৌলিক ত্রুটিযুক্ত।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটম ২০১১ সালে একটি যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেখানে দেখা যায়। যেমন শীতলীকরণ-প্রক্রিয়া কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে রাশিয়ার রি-অ্যাক্টরগুলোর নিরাপদ থাকার সামর্থ্য নিয় প্রশ্ন ওঠানো হয়েছে। শীতলীকরণ-প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে পাওয়ার ব্যাকআপ সিস্টেমও কাজ করবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তাও নেই বলে বলা হয়েছে। তাদের সরকারি কর্মকর্তারা এও বলেছেন, স্থানাভাবে পরিত্যক্ত জ্বালানি রি-অ্যাক্টরের স্থানেই মজুত করা হয়। যে কেউ-ই প্রশ্ন করতে পারে যে বাংলাদেশের পরমাণু প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থার এই প্রতিবেদনটি কি পর্যালোচনায় নিয়েছেন? তাঁরা কি সব দেখেশুনে উদ্বেগমুক্ত হয়েছেন?
তাহলে এ বিষয়ে এগোবার সেরা পথ কোনটি? রূপপুর প্রকল্প থেকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য উদ্ভূত ঝুঁকি কীভাবে পরিমাপ করা হবে? যেসব বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাঁরা নিঃসন্দেহে বলবেন, এ বিষয়ে নিরাবেগ আলোচনা হওয়া উচিত এবং কেবল ভয়ের কারণে রূপপুর প্রকল্পের বিরোধিতা করা উচিত নয়। বিজ্ঞানী না হয়ে এবং অতিসরলীকরণ না করেও আমি বলতে চাই, পরমাণু জ্বালানি ঘিরে বিশ্বব্যাপী যে বিরাট বিতর্ক হচ্ছে, সেদিকে তাকান। যেমন ভারতে এ ব্যাপারে বেশ পরিণত বিতর্ক হচ্ছে। সেই বিতর্ক বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। কাকতালীয়ভাবে হলেও এ মুহূর্তে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের কুদানকুলামে রাশিয়ার সরবরাহ করা ভিভিএআর রি-অ্যাক্টর বসানো নিয়ে বিরাট আন্দোলন হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে, বছরওয়ারি বন্যায় প্লাবিত হওয়ার দেশ হিসেবে এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই।
রূপপুরে কোনো নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আগে, যদি কিছু হয়েও থাকে, তথ্যযুক্তি নিয়ে গণবিতর্ক হওয়া উচিত। যে বিতর্কে বাংলাদেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সমাজ, শহুরে কর্মীরা এবং পাবনার কৃষক ও জেলেদের অংশগ্রহণ জরুরি।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
ড. পিটার কাস্টার্স: গবেষক, বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ।







Fahim
২০১৩.০১.২৫ ০৩:১৭Titon
২০১৩.০১.২৫ ০৩:২০Titon
২০১৩.০১.২৫ ০৩:৩১zakir ( জাপান )
২০১৩.০১.২৫ ০৩:৫৪Ashraf
২০১৩.০১.২৫ ০৪:৫৬Manna A
২০১৩.০১.২৫ ০৬:১২Abdullah Al-Mamun. রংপুর ।
২০১৩.০১.২৫ ০৬:৫৮রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট পারমানবিক আর অন্ত্রের ব্যাবসা বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে দিয়েছে । সেই ফাঁদে এখন বাংলাদেশ পা দিয়েছে ।
অস্ত্র কেনার যৌক্তিকতা পুরো পুরো সঠিক নয় । সামরিক অস্ত্র লাগতে পারে তবে সেটি অস্ত্রের পাহাড় গড়ে নয় ।
পারমানবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র দ্বারা সার্বিক ক্ষতির প্রভাব কম নয় আর যদি বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটে তবে তা গোটা দেশবাসিকে চরম মূল্যে দিতে হতে পারে । তাছাড়া পারমানবিক শক্তি দ্বারা বিদ্যুতের ধারনা এখন পাল্টিয়েছে । রুপপুরের সেই প্রকল্পটি পাকিস্থান থেকে এপর্যন্ত সকলেই শুনছে । এতদিনে প্রকল্পটি হয়নি না হবার জন্য । রুপপুরে বিশাল জায়গা সরকার অধিগ্রহন করে রেখেছে অথচ জায়গাটি অন্য কাজে লাগাতে পারলে সরকার অর্থনৈতিক সহায়তা পেতে পারতো । অস্ত্র ক্রয় এবং পারমানবিক বিদ্যত্ কেন্দ্র নির্মান দেশবাসির কাছে অস্পষ্ট । দুটির চুক্তির ফল যে ভাল হবেনা তা সকলেই বোঝেন । তবে তার পরেও কেন? এতে দেশের চেয়ে ব্যাক্তির সার্থ যে ফুটে উঠছে তা এখন স্পষ্ট ।
Abul
২০১৩.০১.২৫ ০৭:১৭Mohamed Motiur Rahman Khan
২০১৩.০১.২৫ ০৮:০৯মাহতাব হোসেন # বাউফল # পটুয়াখালী #
২০১৩.০১.২৫ ০৮:৩৪Tajerul islam sadhin
২০১৩.০১.২৫ ০৮:৫৪syed Kamal mohammad Mukul
২০১৩.০১.২৫ ০৯:০৩Mohammad Shah Alam
২০১৩.০১.২৫ ০৯:০৪MK. Hasan
২০১৩.০১.২৫ ০৯:০৬ABDUL MAJID QUAZI
২০১৩.০১.২৫ ১০:০২Halim Shan
২০১৩.০১.২৫ ১০:০৮s rahman
২০১৩.০১.২৫ ১১:২২mahfuza bulbul
২০১৩.০১.২৫ ১১:৫৬M. Shahidul Islam
২০১৩.০১.২৫ ১১:৫৯Abdul Bari
২০১৩.০১.২৫ ১২:১৩Taslima Akter
২০১৩.০১.২৫ ১২:২৭
২০১৩.০১.২৫ ১২:৪৩
২০১৩.০১.২৫ ১৩:০৫saad
২০১৩.০১.২৫ ১৩:০৯Tohid
২০১৩.০১.২৫ ১৪:১৬Tawhid
২০১৩.০১.২৫ ১৪:৩৪নির্বাচনের স্বার্থে। সরকার দেখাবে আমরা নতুন দিগন্ত শুরু করলাম আর সবাই দৌড়ে গিয়ে ভোট দিবে।আর পকেটের স্বার্থে। দক্ষিন কোরিয়াতে একটা পারমাণবিক চুল্লীর প্রাথমিক প্রস্তুতিতে খরচ ধরেছিল ১৩০ কোটি টাকা আর বাংলাদেশ ধরেছে ৪০০০ কোটি। কিছু তো বুঝতে বাকি নেই। বলা হয়েছে ১০০০ মেগাওয়াট করতে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগবে। তাহলে কি লাভ হবে দেশের? তাছাড়া বাংলাদেশ বড় একটা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে। যেই দুর্ঘটনা জাপান সামলাতে পারে নাই,জাপানকে সাহায্য করেছে আমেরিকা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, রাশিয়া তাতেও জাপানের চিন্তার অতীত ক্ষতি হয়েছে সেখানে কোন দুর্ঘটনায় আমরা কি করব? কোরিয়া, জাপান, জার্মানি সবাই ঘোষণা দিয়েছে ধীরে ধীরে সকল পারমাণবিক বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিবে আর আমরা?
Muzibur rahman
২০১৩.০১.২৫ ১৫:৫৩Ratan Jyoti
২০১৩.০১.২৫ ১৬:২৫Dear Dr. Peter Costers, the above statement made your opinion not to construct the nuclear power plant. But, we haven't seen any serious discussion on this issue.