হাতিরঝিলে এক সন্ধ্যায়

| তারিখ: ২৫-০১-২০১৩

  • ৮ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • সন্ধ্যা হতেই তরুণ-তরুণীদের আড্ডায় মুখরিত হয়ে ওঠে হাতিরঝিল।

    সন্ধ্যা হতেই তরুণ-তরুণীদের আড্ডায় মুখরিত হয়ে ওঠে হাতিরঝিল।

    ছবি: জাহিদুল করিম

  • হাতিরঝিল এসে দর্শনার্থীদের প্রথম কাজ হয় নানা ভঙ্গিতে ছবি তোলা

    হাতিরঝিল এসে দর্শনার্থীদের প্রথম কাজ হয় নানা ভঙ্গিতে ছবি তোলা

  • এমন খোলামেলা জায়গা পেয়ে শিশুদের আনন্দ দেখে কে!

    এমন খোলামেলা জায়গা পেয়ে শিশুদের আনন্দ দেখে কে!

ঢাকাবাসীর বেড়ানোর এক নতুন জায়গা হয়েছে আলোঝলমলে হাতিরঝিল। মুক্ত পরিসরে সেখানে লাল, নীল, সবুজ আলোর খেলা। তরুণ-তরুণীদের পছন্দের এই জায়গাটিতে এক সন্ধ্যা কাটিয়ে এসে লিখেছেন সিমু নাসের

তখনো মহাসমারোহে হাতিরঝিলের উদ্বোধন হয়নি। রাস্তাগুলো তৈরি হয়ে গেছে, গাছপালা লাগানো হচ্ছে, সেতুগুলোর কাজ চলছে দ্রুত গতিতে। এক সকালে হাঁটতে গিয়ে দেখি, হালকা কুয়াশা ভেদ করে রাস্তা দিয়ে সত্যি সত্যি একটা হাতি হেঁটে আসছে। তাজ্জব ব্যাপার! এই সাতসকালে এখানে হাতি এল কোত্থেকে! জায়গার নাম হাতিরঝিল বলে কি এর মাস্টারপ্ল্যানে হাতি চলাচলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে নাকি! মাহুতের কাছে শোনা গেল, না, ব্যাপারটা তা নয়। এটা মানিকগঞ্জ না কোথাকার মালিকের হাতি। রাতে রামপুরায় ছিল। হাতিটা নিয়ে কী এক কাজে ধানমন্ডি যাবেন, এখানে শর্টকাট নিয়েছেন।
ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিমের সঙ্গে শর্টকাট তৈরি করে দেওয়া এই হাতিরঝিলে এখন গেলে হাতি দেখতে পাবেন না বটে, তবে ঝিলটা পাবেন। সে এক বহুরূপী ঝিল। যেন ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির রূপকথা থেকে উঠে আসা, যার পানির নিচের এক কৌটায় লুকিয়ে ফেলা হয়েছে ঢাকার যানজট-রাক্ষসের প্রাণভোমরা। আর সেটি দিনে তো এক রকম বটেই; রাতে একেক সময় একেক রকম। কখনো নীল, কখনো সবুজ, কখনো লাল আলোঝলমলে এক অদ্ভুত জগৎ! কিছু সময়ের জন্য সে জগতের বাসিন্দা হতে সন্ধ্যা না নামতেই শত শত মানুষ এসে ভিড় করছে এই হাতিরঝিলে।
‘এর ভেতরে একটা এয়ারপোর্ট আর একটা হোটেল থাকলে খুব ভালো হতো।’ কান খাড়া হয়ে গেল কথাটা শুনে। দাঁড়িয়ে আছি সোনারগাঁওয়ের দিক থেকে ঢুকে দ্বিতীয় সেতুটায়। কথাটা বলছেন এক তরুণী, তাঁর পাশে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সঙ্গী তরুণকে। বলছেন কী এই তরুণী! এত সুন্দর জায়গাটিতে আবার এয়ারপোর্ট-হোটেল কেন? জবাবও দিলেন তিনিই, ‘তাহলে বিদেশ থেকে যখন আমাদের বন্ধুবান্ধব আসবে, তখন বিমান থেকে এখানকার এয়ারপোর্টেই নামিয়ে, এখানকার হোটেলেই রেখে, এখানকার রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করিয়ে আবার তাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারলে বোঝো কেমন হতো! সে আমাদের ঢাকা সম্পর্কে কী দারুণ একটা অভিজ্ঞতা নিয়েই না যেত।’ আহা! এত্ত বড় আকাশের সামনে এই প্রথমই না দাঁড়াল ঢাকার মানুষ! সেতুর নানা আলোয় পাল্টে যাচ্ছে তাদের মুখের রং, পাল্টাচ্ছে তাদের স্বপ্নের রংও। হাতিরঝিল তো এই স্বপ্ন দেখাতেই পারে।
দুই পাশে শাঁই শাঁই করে ছুটে যাচ্ছে গাড়ি। গাড়ি তো নয়, যেন শুধুই শত শত আঁকাবাঁকা আলো ছুটছে কোথাও। আর ঢাকার গাড়িগুলোও নিয়মিত রাস্তার যানজটে কাশতে কাশতে ছুটে এখানে এসে যেন তাজা বাতাস পেয়ে তাগড়া ঘোড়া হয়ে বাধাহীন ছুটে চলছে। কম যায় না মোটরবাইকগুলোও। ভ্রুম ভ্রুম শব্দ তুলে তীব্র গতিতে এসে দাঁড়াচ্ছে কোনো সেতুতে। বন্ধুরা মিলে হইহুল্লোড়, গল্পগুজবের শেষ নেই। কানা ঘুপচির চায়ের দোকানের আড্ডার চেয়ে এই আড্ডায় প্রাণ অনেক।
এমনই একটা মোটরবাইক গ্রুপ বাইক রেখে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল সেতুর মাঝখানে। আরেক বন্ধু দশাসই চেহারার এক লেন্সওয়ালা ক্যামেরা নিয়ে শুয়ে পড়লেন সেতুতে, ছবি তুলতে। ১০ সেকেন্ডেই কাজ শেষ। এদিকে গাড়ি এসে ভেঁপু বাজাতেই রাস্তা ছেড়ে দিলেন সবাই। তাঁদেরই একজন রোহান—পড়ছেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে—বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটারে রোড র‌্যাশ গেম খেলতাম। আমার প্রিয় ট্র্যাক ছিল নাপা ভ্যালি। প্রথম যেদিন এখানে আসি, মনে হয়েছিল পৃথিবীর কোনো রাস্তাই এর থেকে সুন্দর নয়। তাই বাস্তবেই রোড র‌্যাশ খেলতে প্রায় প্রতিদিনই আসি এখানে বাইক নিয়ে।’ পাশ থেকে রোহানের বন্ধু জায়েদ বললেন, ‘আমার ইচ্ছা আছে, হাতিরঝিল ট্র্যাক দিয়ে একটা রেসিং গেম বানাব। এত সুন্দর এই জায়গাটা এটা দাবি করে। পৃথিবীর অন্য দেশের লোকেরা যখন এই ট্র্যাকে গেমটা খেলবে, তারা দেখবে, ঢাকাও কত সুন্দর!’ বলেই তাঁরা আবার ভ্রুম ভ্রুম করে ছুটে চলে গেলেন।
পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি সেতু যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে মানুষের জটলা। হাঁটতে হাঁটতে সেদিকে এগোতেই বুঝলাম, যেখানেই মানুষ সেখানেই ব্যবসা। দুই টাকায় ওজন মাপা থেকে শুরু করে কী নেই সেখানে! একজনকে দেখা গেল এই শীতের সন্ধ্যায় দুই হাঁড়ি খেজুরের রস নিয়ে বসেছেন। গ্লাস হিসেবে দাম। ভ্যানে করে যিনি বরই, আপেল ও জাম্বুরা নিয়ে বসেছেন, সেখানে বরইটাই নাকি বেশি চলছে জানালেন তিনি। লেকের পাড় দিয়ে যে ওয়াকওয়ে, সেখান দিয়ে দৌড়াচ্ছেন স্বাস্থ্যসচেতন অনেক মানুষ, তেমনি না-হেঁটে, না-দৌড়িয়ে হেঁটে আসছিলেন নাজিয়া। থাকেন মগবাজারে। অফিস নিকেতনে। এত দিন বহু পথ ঘুরে বহু ক্রোশ দূরে যেতে হতো অফিসে। এখন হাতিরঝিল দিয়ে হেঁটে ১০ মিনিটেই অফিসে পৌঁছে যান তিনি। তাঁর কাছে এই হাতিরঝিল এক স্বপ্ন হয়েই ধরা দিয়েছে, ‘আমি প্রতিদিন ভোর সাতটার দিকে এই রাস্তা দিয়ে যাই। একদিন ছিল অনেক শীত আর অনেক কুয়াশা। চারদিকে সাদা সাদা বাতাস ভেসে যাচ্ছে। লেকের পানি স্থির, সেখান থেকে সাদা রং উড়ে আসছে। তার ভেতর হঠাৎই উদয় হলো অনেক নৌকা। মনে হচ্ছিল আমি এই শীতরাজ্যের রাজকুমারী। আর প্রায় সন্ধ্যায় যখন অফিস থেকে বাসায় ফিরি, দেখি ঝিলের আলোর খেলা। কখনো ওই পারের বসতি মহানগর আবাসিকে লোডশেডিং হলে আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তারারা ঝিকিমিকি করে ঝিলের আলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সত্যিই অসাধারণ! বন্ধুবান্ধব সবাইকে নিয়ে সেতুতে প্রায়ই কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরি।’
রাত যত বাড়তে থাকে, তত হেঁটে চলা মানুষের আনাগোনা কমতে থাকে। তখন শাঁই শাঁই করে ছুটে আসা ঝা-চকচকে গাড়িগুলো ইন্ডিকেটর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সেতুর ওপর। গাড়ির ভেতর থেকে লাফিয়ে নামে ছোট বাচ্চাসমেত পুরো পরিবার। মা খাবারের প্যাকেট বের করেন। বাচ্চা একবার মুখে পুরেই দে ছুট। খেলা জুড়ে দেয় অন্য পরিবারের বাচ্চার সঙ্গে।
ঝিলের পাড় ঘেঁষে মহানগর আবাসিকে ঢোকার রাস্তাটাও এখন জমজমাট তরুণ-তরুণীদের আড্ডায়। সেখানে দেখতে দেখতেই গজিয়ে উঠেছে অনেক চায়ের দোকান। মাত্র তিন দিন হয়েছে উদ্বোধন করেছেন, এমন এক চায়ের দোকানের চা-বিক্রেতা জানালেন, ঘুরতে আসা অনেকেই চা খেতে এখানে আসেন। বিক্রিবাট্টাও ভালো। হাতিরঝিল হওয়ায় আরেকটা লাভ হয়েছে বলে তিনি জানান, আগে এখানে অনেক মশা ছিল। এখন নেই।
এখন যে হাতিরঝিল দেখা যাচ্ছে, সেখানেই এর শেষ নয়। আসছে আরও নতুন চমক। কথা হলো হাতিরঝিল প্রকল্পের অন্যতম পরিকল্পনাবিদ ও নকশাকারী মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, কিছুদিনের মধ্যেই চালু হবে দুটি ওয়াটার ট্যাক্সি টার্মিনাল। এতে করে দর্শনার্থীরা ঝিলে নৌকা করে ঘুরে বেড়াতে পারবে। তৈরি হবে অ্যাম্ফিথিয়েটার। ঝিলের মাঝখানে তৈরি করা হবে একটি ছোট্ট দ্বীপ যাতে পাখিরা এসে বসতে পারে। ঝিলের পানিতে ছাড়া হবে মাছ। ইতিমধ্যে বেশ কিছু হাঁস ছাড়া হয়েছে। এদের পরিমাণও বাড়ানো হবে। এ ছাড়া দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য রয়েছে পাবলিক টয়লেট ও নিরাপত্তার জন্য পুলিশবক্স বসানোর পরিকল্পনা।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

Abdullah Al-Mamun. রংপুর ।

Abdullah Al-Mamun. রংপুর ।

২০১৩.০১.২৫ ০৫:০৩
সত্যি বিস্ময় । হাতিরঝিলে ঘুরে বেরিয়েছি । এটি ঢাকাবাসির জন্য একটি সহজ বিনোদনের মাধ্যম ।

Muzibur rahman

Muzibur rahman

২০১৩.০১.২৫ ০৫:০৫
I do not support an islad in the middle of hatir jheel for Birds,later it will become dirty. People will come to hunt birds. If possible make a little bangladesh country style home in the middle with, Deki,, Symbolic Palki, Fishing gears,Mango tree,Hizal tree- own Boat for fun race-and so on , as picnic spot for a day rent by RaJUk. If it is being done this way then it will be looked after well from rent collection.

Mohammad Shah Alam

Mohammad Shah Alam

২০১৩.০১.২৫ ০৯:২৩
একটা ভাল কাজ কীভাবে মানুষ গ্রহন করে কীভাবে প্রশংসা করে হাতারঝিল তারই উদাহরন। অামরা চাই এভাবে সরকারের প্রশংসা করতে। সরকার অারও ভাল কাজ করে জনগনের সেবা করুক দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক এই কামনা করি । অামরা অাওয়ামিলীগ বি এন পি বুঝি না অামরা বুঝি সরকার অার উন্নয়ন।

Md Nure Alam Sarker

Md Nure Alam Sarker

২০১৩.০১.২৫ ০৯:৪৫
আশা করি এটি কোন চাঁদা বাজ, মাস্তান বা ছিন্তাই করীর অভয়ারণ্যে পরিনত হবে না। জানি না কোন দিন দেখা হবে কি না। থাকি বহু দূরে, বহু ক্রশ মাইল দূরে। তবে মনে আশা থাকে- একদিন এসে দেখব আমার সোনার বাংলাদেশ সোনার মতো না হলেও হাতির ঝিলের মতো ঝল মল করছে।

২০১৩.০১.২৫ ১০:৩৭
We don't want to see a dead project at the end of the day...please don't rent it out as a picnic spot...as we know it will be very dirty.......after some while no body will be there to clean.....think more about tourism.........how there can be good relaxing place as well as foreigner......

মাহতাব হোসেন # বাউফল # পটুয়াখালী #

মাহতাব হোসেন # বাউফল # পটুয়াখালী #

২০১৩.০১.২৫ ১১:৩৯
হাতির ঝিলের নামকরণের সার্থকতা প্রতিপন্নের নিমিত্তে, এটার সোনারগা প্রান্ত অথবা অন্য কোন উপযুক্ত স্থানে একটা দ্বীপ তৈরী করে সেখানে বেশকিছু ছোটবড় হাতির ভাষ্কর্য নির্মাণ করা উচিত, যার কয়েকটা দ্বীপের উপরে, কয়েকটা ঝিলে অবতরণরত আর কয়েকটা ঝিলের জলে অবগাহনরত অবস্থায় থাকবে। ঝিলে অবগাহনরত হাতিগুলোর শুর থেকে পর্যায়ক্রমিক পানির ফোয়ারার ব্যাবস্থা থাকলে আরও চিত্তাকর্ষক হবে, যেন হাতিগুলো তাদের শুরে পানি নিয়ে তা স্প্রে করছে।

tishad

tishad

২০১৩.০১.২৫ ১৩:৩৮
এখন ধীরে হলেও আস্তে আস্তে শ্রী হারাচ্ছে হাতিরঝিল।জত্রতত্র ময়লা ফালাচ্ছে, গাছ নষ্ট করছে, রাস্তার পাশে দোকান করার চেষ্টা ও পরিলক্ষিত হচ্ছে।যথাযথ কত্রিপক্ষ এখনি নজর দিন এসব বিষয়।

shirin

shirin

২০১৩.০১.২৫ ১৬:৩৭
Hateer Jhil... It's a wonderful place. When I watched it on BTV World from abroad,I felt so proud of my country. And I am also thanking to this Government. We will expect that no one will do business there like tea hawker or other types of business . If so it happens, that place will not be nice or clean..So,I want to request those who are in charge of that place, to please stop doing that business. Try to decide to make some of stall out of those area. .Give there some public notice for not making dirty place,if some one make dirty, please fine them.