অ্যাসিড-সন্ত্রাস
৪৪ মামলার মাত্র দুটি নিষ্পত্তি
অ্যাসিড নিক্ষেপকারী মনির ও মাসুমের শাস্তির দাবিতে ইডেন কলেজের ছাত্রীরা গতকাল কলেজের সামনে মানববন্ধন করেন
ছবি: প্রথম আলো
অ্যাসিড-সন্ত্রাসের অভিযোগে বিচারাধীন ৪৪টি মামলার মধ্যে মাত্র দুটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে গত এক বছরে। অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন অনুযায়ী, ৯০ কর্মদিবসের মধ্যে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের মামলার বিচার শেষ করার কথা।
গত এক বছরে নিষ্পত্তি হওয়া দুটি মামলার সব আসামিই খালাস পেয়েছে, কারও সাজা হয়নি। তবে গত ১০ বছরে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের মামলায় ১৩ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। অবশ্য এখনো কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। এই সময়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে ১০২ জনের।
নারীদের ওপর অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর শিকার যাঁরা হয়েছেন, তাঁরা বেশির ভাগই অপরাধীর পূর্বপরিচিত, স্বামী, প্রেমিক অথবা আত্মীয়। আর নারীর ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপকারী সবাই পুরুষ।
তবে অ্যাসিডের সহজলভ্যতায় বর্তমানে শুধু নারীই সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে না, পুরুষ এমনকি ছোট শিশুর জীবনও বিপন্ন হচ্ছে। প্রেমসংক্রান্ত কারণ ছাড়িয়ে এখন শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধা দেওয়া, যৌতুক ও জমি নিয়ে বিরোধ অথবা রাজনৈতিক কোন্দলের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহূত হচ্ছে অ্যাসিড। আবার অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ধরনও পাল্টেছে। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, আগে আহত করে পরে অ্যাসিড নিক্ষেপ করা হচ্ছে। সর্বশেষ মঙ্গলবারও ইডেন কলেজের ছাত্রীর ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপের পাশাপাশি তাঁকে কোপানোও হয়।
জাতীয় অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলের সদস্য এবং অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) নির্বাহী পরিচালক মুনিরা রহমান একে দেখছেন চরম নিষ্ঠুরতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। এটা হামলাকারীদের মানবিক অবক্ষয়েরও প্রকাশ বলে মনে করেন তিনি।
২০০২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ১০ বছরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে এক হাজার ৭৭৯টি। অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে ৬৯৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। ৪৮৮টি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছে। আর সাজা হয়েছে এমন মামলার সংখ্যা মাত্র ১৭০টি। বর্তমানে ১৮টি মামলার তদন্ত চলছে। বাকি ৪০৮টি মামলা স্থগিত আছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে অ্যসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা মোটামুটি স্থিতিশীল। তবে ২০০২ থেকে ২০১০ সালের পরিসংখ্যানে সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছিল। আবার ২০১০-এর তুলনায় ২০১১ সালে সামান্য বেড়েছে।
তবে অ্যাসিড অপরাধ মামলার তদারক কমিটির হিসাব বলছে, ২০১১ সালে অ্যসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা বাড়লেও ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অপরাধ আবার কমতির দিকে ছিল।
অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, বাদী চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন দেওয়ার পর অনেকটা বাধ্য হয়েই আদালতে অভিযোগপত্র দিচ্ছে পুলিশ। কিন্তু এরপর সাক্ষী পাওয়া যায় না। আইনজীবীদের অনেকেও জড়িয়ে পড়েন অনৈতিক চর্চায়। আবার রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়া হয়। এ ছাড়া নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা তো রয়েছেই।
অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০২ সালে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে ৩৬৭টি। ২০০৩ সালে ৩৩৫, ২০০৪ সালে ২৬৬, ২০০৫ সালে ২১৭, ২০০৬ সালে ১৮০, ২০০৭ সালে ১৫৫, ২০০৮ সালে ১৩৭, ২০০৯ সালে ১২০, ২০১০ সালে ১১৫, ২০১১ সালে ১১৯ এবং ২০১২ তে ৯৮টি মামলা হয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘অ্যাসিড-সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটির ও জেলার সরকারি কৌঁসুলিকে বিশেষ যত্নবান হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের দ্রুত সাজার আওতায় আনতে এবং দ্রুত অ্যাসিডের মামলা নিষ্পত্তির আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদারকি করছি।’
অ্যাসিডের সহজলভ্যতা: দেশের কিছু এলাকায় এখনো চাইলেই অ্যাসিড সংগ্রহ করা যায়। মূলত ক্ষুদ্র ব্যবহারকারীদের কাছ থেকেই অ্যাসিড সংগ্রহ করে আক্রমণকারীরা। সোনার দোকান, আসবাবপত্রের দোকান, মাইকের দোকান, ব্যাটারির দোকান থেকে অ্যাসিড সংগ্রহের নজির বেশি। এসব ব্যবহারকারীর বেশির ভাগের অ্যাসিড ব্যবহারের লাইসেন্স না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
আইন অনুযায়ী লাইসেন্সের শর্ত পালন না করে কোনো অ্যাসিড উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, মজুত, বিক্রয় বা ব্যবহার করলে বা দখলে রাখলে শাস্তি হিসেবে তিন থেকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্স ছাড়াই চলছে এর কেনাবেচা ও ব্যবহার।
আটকে আছে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তর: অ্যাসিড নিক্ষেপকারীদের বিচারের আওতায় আনার লক্ষ্যে এই অপরাধের মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। গত বছরের ১৪ মে অ্যাসিড অপরাধ মামলা তদারক কমিটির ষষ্ঠ সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। প্রায় নয় মাস পার হতে চললেও এ সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
এএসএফের নির্বাহী পরিচালক মুনিরা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে অ্যাসিড অপরাধের মামলা স্থানান্তর করা হলে বিচার তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হতো। এতে এ ধরনের অপরাধ কমে আসত।







s rahman
২০১৩.০১.১৭ ১০:৪৬আলমাস চৌধুরী, লন্ডন
২০১৩.০১.১৭ ১১:৪৩
২০১৩.০১.১৭ ১১:৪৭Firoz Alam
২০১৩.০১.১৭ ১৪:২৮