শিরোনাম:

গোলটেবিল বৈঠক

৭০০ কোটির বিশ্বে বাংলাদেশ: সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

| তারিখ: ৩১-১০-২০১১

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

২০ অক্টোবর ইউএনএফপিএ ও দ্য ডেইলি স্টার-এর যৌথ আয়োজনে ‘৭০০ কোটির বিশ্বে বাংলাদেশ: সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় অংশ নেন। তাঁদের বক্তব্য এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে ছাপা হলো

যাঁরা অংশ নিলেন
মাহফুজ আনাম
সম্পাদক এবং প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার
আর্থার এরকেন
কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ, ইউএনএফপিএ, বাংলাদেশ
এ কে এম নুরুন্নবী
অধ্যাপক,জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ড. আতিক রহমান
চেয়ারম্যন, বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ(বিসিএএস)
ওমর রহমান
অধ্যাপক, ইন্ডিপেন্ডন্ট ইউনিভার্সিটি
বরকত-ই-খুদা
অধ্যাপক,অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নাশিদ কামাল
অধ্যাপক,গণস্বাস্থ্য বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
প্রমিত অনন্য চক্রবর্তী
ন্যাশনাল ইউথ ফোরাম, ইউএনএফপিএ
কাজী আলী রেজা
ইউএনআইসি
ফারজানা ইয়াসমিন
ন্যাশনাল ইউথ ফোরাম, ইউএনএফপিএ
এলা ডি ভগ্ড
ফার্স্ট সেক্রেটারী, ডাচ দূতাবাস
ড. নাসরিন আক্তার
প্ল্যান বাংলাদেশ
ড. গিয়াস উদ্দিন
ডেপুটি ডাইরেক্টর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
ড. শামসুল আলম
সদস্য, জেনারেল ইকোনোমিক ডিভিশন, প্ল্যানিং বাংলাদেশ
এ কে এম জাফর উল্লাহ খান
পপুলেশন কাউন্সিল
হাবিবুর রহমান
উপসচিব, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
ড. নূর মোহাম্মদ
এসিস্টেন্ট রিপ্রেজেনটেটিভ, ইউএনএফপিএ, বাংলাদেশ

আলোচনা
মাহফুজ আনাম
কিছু কাল ধরে পৃথিবীর জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি আমাদের উদ্বিগ্ন করছে, যেমনটা করছে ইউএনএফপিএ-কেও। যদিও আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাস্তব কিছু অগ্রগতি ঘটিয়েছি, তবে একটা সময় আমরা অতিমাত্রায় আত্মতুষ্টও হয়ে পড়লাম। আগের মতো আর কার্যকর রইল না আমাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ-তৎপরতা ও নীতিগুলো বাস্তবায়ন। আমার মনে হয়, আমরা সবাই-ই বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যার বিষয়টি উপলব্ধি করি। চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং অকপটে স্বীকার করা ভালো যে জনসংখ্যা বিষয়ে আমরা এখন বিপদের মুখোমুখি। আমার মনে হয় না গণমাধ্যমে আমরা যারা আছি, তারা বিষয়টিতে মোটেই আলোকপাত করছি। আমরা অনেক বেশি ব্যস্ত রাজনীতি, শেয়ারবাজার, অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে। কিন্তু জনসংখ্যা এমন এক সমস্যা, যা নাটকীয়ভাবে নয় বরং নিঃশব্দে ঘনীভূত হয় এবং এ কারণেই সম্ভবত গণমাধ্যমে একে উপেক্ষার প্রবণতা আসে। আমার ধারণা, জনসংখ্যা সমস্যা এখন নাটকীয় হয়ে উঠছে এবং প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে সত্যিই আমরা গুরুতর বিপদের মুখে। স্বাধীনতার সময় আমাদের জনসংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে সাত কোটি। যদি আমরা একে ১২ কোটি এমনকি সাড়ে ১২ থেকে ১৩ কোটির মধ্যেও রাখতে পারতাম, তাহলে হয়তো সত্যিই আমরা দারিদ্র্যের সেই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারতাম, যার মধ্যে পতিত রয়েছে আমাদের অনেক মানুষ। তাহলে কোন পর্যায়ে গিয়ে আমাদের জনসংখ্যা স্থিতিশীল হবে? ২২ কোটি না আরও বেশি? সত্যিই এটি এখন একটি দুঃস্বপ্নময় পরিস্থিতি। জনগণ সম্পদ—এটা বলা সহজ, কিন্তু তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের বাস্তবতা খুবই সংকুল।
ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে জনসংখ্যা সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট কাজ না করায় আমি অপরাধবোধে ভুগছি। তাই এই গোলটেবিল বৈঠককেই কাজের শুরু বলে ভাবি না কেন। আমাদের এমন এক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে যে জনসংখ্যা সমস্যা সত্যিই এক প্রধান সমস্যা, এখন এটাই টাইমবোমা, যা আমরা একেবারে ভুলে থাকছি। দুঃখের বিষয় হলো, রাজনৈতিক কার্যসূচিতে জনসংখ্যা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নেই বললেই চলে। আমি মনে করি না যে সংসদেও এটা নিয়ে গুরুত্ববহ আলোচনা হয় বা হয়েছে। জাতীয় দায়দায়িত্বের দিক থেকে এটা সত্যিই হুমকি। এ সমস্যা মোকাবিলার পথ আমাদের বের করতে হবে। আমার আরজি এটাই, এখান থেকে কিছু বৈশ্বিক ধারণা বের হয়ে আসুক, আসুক করণীয় বিষয়ে কিছু স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, ডেইলি স্টার পরিবেশ সমস্যাকে যেমন গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে, তেমনই গুরুত্ব দেবে এই সমস্যাকেও। আমরা চাই, এ সমস্যাটি মূলধারার কার্যসূচিতে উঠে আসুক, প্রতিষ্ঠিত হোক সামাজিক ও অন্যান্য চিন্তাভাবনার ভেতরেও।

আর্থার এরকেন
জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগের হিসাবে এই ৩১ অক্টোবর আমরা ৭০০ কোটি হয়ে যাব। মাত্র ৫০ বছরে ৪০০ কোটি মানুষ বেড়ে যাওয়া রীতিমতো হতবুদ্ধিকর ঘটনা। আমি দুটি দিকের ওপর জোর দিতে চাই। একটি হলো, গণমাধ্যমের ভূমিকা। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আপনি যদি মানুষকে নিয়ে কিছু করতে চান, তাহলে তাদের সমস্যা সম্পর্কে সজাগ করতে হবে। দ্বিতীয় দিকটি হলো, রাজনৈতিক সংকল্প। দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু গত চার বছরে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এ বিষয়ে কিছু করতে দেখা যায়নি। তার মানে এ বিষয়ে নিরন্তর চাপ থাকা দরকার। সমস্যাটিকে এখন জাতীয় ইস্যু করে তুলতে হবে।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ মন্দ করেনি। আমাদের দরকার হলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাওয়া। আমি ছয়টি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা জরুরি বোধ করছি।
প্রথমটি হলো, জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা। আমাদের দরকার জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে নতুন করে জোরদার করা। এ বিষয়ে নতুন মনোযোগ আসতে হবে। যারা পিছিয়ে পড়েছে, এখন তাদের লক্ষ করে কাজ চালাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কৃষিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করা, যাতে বর্ধমান জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করা যায়।
তৃতীয় বিষয় হলো, নগর পরিকল্পনা। নগরায়ণ আর প্রবৃদ্ধি সমান্তরাল ব্যাপার, এতে কোনো সমস্যা নেই। আমাদের দরকার অধিকতর পরিকল্পনা। আমাদের নগরায়ণটা হচ্ছে অনুভূমিক, অর্থাৎ তা আবাদি জমি খেয়ে ফেলছে। দরকার হলো, অল্প জমিতে বেশিসংখ্যক মানুষকে ধারণ করা। অন্য বিষয়টি হলো, শহুরে বস্তিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা।
চতুর্থ, শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করা। বিশেষ করে, নজর কাড়তে চাই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার ওপর। কারণ, আমাদের দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন।
পঞ্চম, বালিকা ও নারীদের ক্ষমতায়ন। ৫০ শতাংশ নারী জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে আমরা এগোতে পারব না।
সবশেষে, আমাদের দরকার অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টি করা। আমাদের দরকার আরও বেশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে চাই সুশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
জনসংখ্যা বোঝা হবে না সম্পদ হবে, তা নির্ভর করছে কীভাবে এর ব্যবহার হচ্ছে তার ওপর।

এ কে এম নুরুন্নবী
৭০০ কোটি জনসংখ্যার বিশ্বে পৌঁছানো মানুষের ইতিহাসে বিরাট মাইলফলক। মাত্র ২০০ বছরের কিছু বেশি সময়ে বিশ্বের জনসংখ্যা ১০০ কোটি থেকে বেড়ে ৭০০ কোটি হয়েছে। বিশ শতকের শুরুতে যেখানে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ১.৬ বিলিয়ন, সেখানে শতাব্দীর শেষাশেষি অঙ্কটি উল্টে হলো ৬.১ বিলিয়ন। এই মাইলফলক সৃষ্টির পেছনে রয়েছে ব্যাপক কিছু অর্জনও। মানুষের আয়ু বেড়েছে, স্বাস্থ্যও উন্নত হয়েছে। এটা একই সঙ্গে ধনী-গরিব উভয় দেশের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও হাজির করেছে। অনেক ধনী ও মধ্য-আয়ের দেশে প্রজনন সক্ষমতা, জন্মহার কমে যাওয়া এবং বয়স্কদের অনুপাত বাড়া নিয়ে চিন্তিত। অন্যদিকে, গরিব দেশগুলো একদিকে বিরাটসংখ্যক তরুণদের ভারে, অন্যদিকে ধীরে বাড়তে থাকা বয়স্ক জনগোষ্ঠী, ক্ষুধা, অশিক্ষা, দুর্বল স্বাস্থ্য, বেকারত্ব, বৈষম্য, জলবায়ুজনিত বিপর্যয় ইত্যাদির ভারে ভারাক্রান্ত।
পরের শত কোটিতে আমরা কবে পৌঁছাচ্ছি, তা নির্ভর করছে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনার সুযোগ, মেয়েদের শিক্ষা এবং নারীদের জন্য সুযোগের বিস্তার, দারিদ্র্য কমানো, পরিবেশের সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোতে তহবিল বাড়ানোর ব্যাপারে এখন আমরা কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি তার ওপর। ভবিষ্যতে আমরা একসঙ্গে একটি প্রাণবন্ত পৃথিবীতে বাস করব কি না, তা নির্ভর করছে আমাদের আজকের সিদ্ধান্তের ওপর। ৭০০ কোটি মানুষের পৃথিবীতে আমাদের দরকার পরস্পরের ওপর নির্ভর করা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম থাকলেও, এর পর থেকেই জনসংখ্যা বৃদ্ধি অনেক দ্রুত হারে ঘটতে থাকে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির ঐতিহাসিক হার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৭০০ সালের এক কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয় ২৩০ বছরে অর্থাৎ ১৯৩১ সালে। পরের দফায় দ্বিগুণ হতে সময় নেয় মাত্র ৪৩ বছর। অনুরূপভাবে, ১৯৩১-এর জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয় ১৯৭৪ সালে। তৃতীয় দফায় দ্বিগুণ হতে সময় নেয় মাত্র ৩০ বছর, অর্থাৎ ২০০৫ সালে। প্রতিবছর জনসংখ্যা বাড়ছে এক কোটি ৮০ লাখ থেকে দুই কোটি।
জনমিতির বিচারে বাংলাদেশের সংখ্যা আগামী অনেক দিন যাবৎ বাড়তেই থাকবে। এর কারণ, বিরাট তরুণ জনগোষ্ঠীর সন্তান-সম্ভাবনা জারি থাকার জন্য। এমনকি ২০১৫ সালের মধ্যে একটি মৃত্যুর বদলে একটি করে জন্ম ঘটলেও এই বৃদ্ধি চলবে।
তাহলেও এই তরুণ জনসংখ্যা এই অর্থে আশীর্বাদ যে এর মধ্যে নিহিত রয়েছে শক্তি, সামর্থ্য, উদ্যম, কর্মশক্তির ভান্ডার এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পূর্ণ সম্ভাবনা। বাংলাদেশের জন্য এটা এক জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বাড়তি পাওয়া। এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাস বাংলাদেশের জন্য বিরাট সুবিধা বয়ে আনতে পারে; যদি এই কাঁচামালকে ক্রমবর্ধমান পুঁজিতে পরিণত করা যায়। কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য এ রকম সুযোগ একবারই আসে। আমরা যদি এখনই এই সুবিধা হস্তগত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে এই তরুণ জনগোষ্ঠী জাতির জন্য বিরাট বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এই সুযোগ হয়তো দুই বা তিন দশক থাকবে, তারপর হারিয়ে যাবে।
আমাদের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক কাঠামোটি পিরামিডের মতো। এর মানে হলো শতাব্দীর মাঝামাঝি এই গ্রাফ থামের মতো হবে। অর্থাৎ অনেক বেশি বয়স্ক মানুষ এবং কম তরুণ কর্মশক্তি। তাই আমাদের এখনই এর সুবিধা কাজে লাগানো উচিত।
আমাদের জন্মহার লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। ২০০৭ সালে তা ছিল ২.৭। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। আমাদের এখনই কম বয়সে বিয়ে, কম বয়সে সন্তান গ্রহণ এবং ঘন ঘন বাচ্চা নেওয়া কমিয়ে আনতে হবে। আমরা মাতৃ মৃত্যুহার কমিয়ে আনায় সফল হয়েছি। ১৯৯১ সালের ৫৭৪ থেকে ২০১০ সালে তা কমে হয়েছে ১৯৪। এই হ্রাস পাওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—টিএফআর ও এমএমআর হ্রাস এবং বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি।
শিক্ষা অর্জনের বেলায় নারীরা এখনো পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে। এ ছাড়া কর্মসংস্থান, উপার্জন, অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ, স্বশাসন ও মর্যাদায়ও তারা পিছিয়ে। সন্তান জন্ম এবং পুনরুৎপাদনের বেলায়ও তাদের অংশীদারি সামান্য।
দৈনন্দিন গৃহস্থালি কেনাকাটাতেও মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে। সম্প্রতি বিয়ে করা নারীদের তিন ভাগের এক ভাগ (৩৮%) নারী তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকারী। সংসারের বড় আকারের কেনাকাটায় ৩৪ শতাংশ, অথবা তাঁদের আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার বেলায় ৩৩ শতাংশ নারী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
নারীরা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হলেও সেসবের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তাঁদের সামান্যই। বিশেষ করে, সাংসারিক নির্যাতন, যার জন্ম মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া, শিক্ষার অসম সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের অভাব থেকে। সম্প্রতি বিবাহিত নারীদের প্রায় অর্ধেকই তাঁদের স্বামীর দিক থেকে কোনো না কোনো রকম শারীরিক সহিংসতার শিকার হন।
দ্রুত প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমাতে সাহায্য করলেও আয়-বৈষম্যও বাড়ছে। নারীরাও এর বড় শিকার।
জনসংখ্যা সমস্যা মোকাবিলা করতে হলে আমাদের উচিত, একে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় বিষয় করে তোলা। বৈশ্বিক ৭০০ কোটি মানুষের পটভূমিতে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কি পন্থা আমরা চিন্তা করতে পারি?
এখনকার জন্য দরকার হলো, সত্বর দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে গতানুগতিক মৌলিক খাদ্যপূরণ থেকে আধুনিক খাদ্যবহির্ভূত ভোগে উত্তরিত হওয়া। জনসংখ্যা হ্রাস ও জন-ব্যবস্থাপনা জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম শর্ত।

আতিক রহমান
জনসংখ্যা বৃদ্ধিহার কমিয়ে আনায় আমরা কিছু প্রশংসনীয় সফলতা অর্জন করেছি। সন্তান উৎপাদনক্ষম জনগোষ্ঠী ২০ বছর আগের তুলনায় এ বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন। এ সফলতা ধরে রাখার জন্য দরকার এ বিষয়ক প্রতিষ্ঠানে এবং কর্মীদের মানোন্নয়নে আরও বেশি হারে বিনিয়োগ বাড়ানো।
সাধারণত আমরা জনসংখ্যা সমস্যা কমানোর বেলায় সুশাসনের বিষয়টি নিয়ে ভাবি না। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাপারই হলো এটা। মানুষ কীভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের নীতিগুলোকে গ্রহণ করবে, তা নির্ভর করে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর। সুশাসনের মাধ্যমে এসবই বিবেচনায় নেওয়া হয়।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শাহরিক ব্যবস্থাপনা। বি-নগরায়ণ খুব সহজেই এখানে করা যাবে না, কারণ আমাদের নগরায়ণের চরিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। এর বৈশিষ্ট্য হলো, গ্রাম শহরের পরস্পরযুক্ততা। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনকে সামলাতে হলে গ্রামে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারকে গ্রামীণ এলাকায় মৌলিক সুবিধাগুলো নিয়ে যেতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও গ্রামীণ এলাকায়ই বেশি গুরুতর। উদাহরণস্বরূপ, আইলা ও সিডরের ধাক্কা সামলিয়ে এখনো সেখানকার মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনে আসতে পারেনি। এটা মানুষকে উন্নয়নের স্বাভাবিক ইতিহাসের সাপেক্ষে পাঁচ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। এসব বিপর্যয় দরিদ্রদের সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। সুতরাং জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের পরিকল্পনার বেলায় জলবায়ু সমস্যাকে আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।

ওমর রহমান
জনসংখ্যা কমানোয় উল্লেখযোগ্য সাফল্য না ঘটলে আমাদের হয়তো পাকিস্তানের পরিণতি বরণ করতে হতো—দেশটি এখন জনসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করতে যাচ্ছে। কেবল সংখ্যার বিষয়টিতে ঝুলে না থেকে আমাদের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিগঠনের দিকে তাকানো উচিত। আমাদের সামগ্রিক জন্মদানের হারের তুলনায় অল্পবয়সীদের জন্মদান হার বেশি। এটাকে আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।
পূর্ণবয়স্ক বিবাহ বাড়ছে মূলত শিক্ষা বিস্তারে বিপুল বিনিয়োগের জন্যই। যত রকম চেষ্টা হয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষাই সবচেয়ে ফলদায়ক হয়েছে। তাই আমাদের শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়ে যাওয়াই উচিত।
আঞ্চলিক বৈষম্য আরেকটি বিষয়, যেখানে নজর দিতে হবে। আমরা সিলেট ও চট্টগ্রামে উচ্চ জন্মহার এবং নিম্ন শিক্ষাহার দেখতে পাই। এ থেকে প্রমাণ হয় যে টাকাই সব সমস্যার সমাধান—এই চলতি বিশ্বাস ভুল। এসব অঞ্চলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে, যাতে সামগ্রিকভাবে জন্মহার আরও কমে আসে।
নগরায়ণ নিয়ে আমি সমস্যা দেখি না। ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের অর্ধেক এলাকা শহরে পরিণত হবে। নগরের বিকাশ দ্রুত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। তাই, বি-নগরায়ণের বদলে আমাদের পরিকল্পিত নগরায়ণের দিকে মনোযোগী হওয়া উচিত।

বরকত-ই-খুদা
জনসংখ্যার কাঠামোর দিকে তাকালে আমরা দুটি জিনিস দেখতে পাই, একটি হলো তরুণ জনসংখ্যা এবং অন্যটি হলো ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যা, অনুপাত নয়।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দায়বদ্ধতার অভাবে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম দুর্বল হয়ে গেছে। গত ৪০ বছরে জনসংখ্যা সমস্যা নিয়ে সংসদে প্রায় কোনো আলোচনাই হয়নি। দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরাই যখন জনসংখ্যাকে সম্পদ বলে গণ্য করেন, তখন আমার ভয় হয় মন্ত্রী, সচিব ও মহাপরিচালক পর্যায়ে না-জানি কী ধ্যানধারণা বিরাজ করছে?
শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উন্নতি হওয়ায় অর্থনৈতিক উন্নতি ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়েছে। তাই শিক্ষা খাতেই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
পরের বিষয় হলো, বাড়তে থাকা জনসংখ্যার জন্য অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত করা। আমাদের পরিকল্পনা কমিশন জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ করার লক্ষ্য নিয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে প্রবৃদ্ধির এই হার যথেষ্ট নয়। গত দুই দশক ধরে আমাদের বিনিয়োগের হার ২৫ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। সঞ্চয়ের হার বাড়লেও বিনিয়োগের হার বাড়েনি। আমরা তীব্র মূল্যস্ফীতিতেও ভুগছি। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার চলমান সমস্যার জন্যও প্রবাসীদের আয় নিয়েও আমাদের নতুন করে ভাবা উচিত। কৃষিতে এখনো অর্ধেক জনশক্তি নিয়োজিত হলেও এই খাতের উৎপাদনশীলতা শ্লথ। সেবা খাতও নিম্ন-উৎপাদনশীল। উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্প খাত ছাড়া আমাদের প্রবৃদ্ধি ও মজুরি কোনোটাই বাড়বে না। তাই জনগণের জীবনমান ন্যূনতম মাত্রায় ওঠাতে হলেও এর জন্য উপযোগী অর্থনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে।
এর পরেই আসবে খাদ্য উৎপাদনের বিষয়টি। এ কথা সত্য যে খাদ্যোৎপাদন ভালো মাত্রায় বেড়েছে। তবুও এখনো খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে। ২০০৬ সালের হিসাবে ৪৫ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পতিত ছিল। আমরা কৃষি জমিও হারাচ্ছি। এসব আমাদের উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।
শহরে অভিবাসন আরেকটি সমস্যা। গ্রাম থেকে নিম্ন মাত্রায় অথবা সামান্য দক্ষ শ্রমিকেরা আসছে। তারা আকর্ষিত হয়ে আসছে না, বাধ্য হয়ে আসছে। ঢাকার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও উন্নত জীবনযাপনের সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের এখনই তাদের ক্ষমতায়নের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

নাশিদ কামাল
আমি শাহরিক বস্তিগুলোর দিকে নজর দিতে চাই। গবেষণার অনুসন্ধান দেখাচ্ছে, এরাই সবচেয়ে অবহেলিত। তাদের জন্য পরিবার পরিকল্পনার আয়োজন করায় সরকারের সামান্য ব্যবস্থাই আছে। চীন এ বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটিয়েছে। আমরা চীনের ভালো উদাহরণগুলো নিতে পারি।
বস্তিবাসীদের অবস্থার উন্নতিও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের তো বস্তিতে থাকার কথা নয়। সরকারের উচিত তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা নগরে আরও ভালো কর্মসংস্থান পেতে পারে।

প্রমিত অনন্য চক্রবর্তী
ধনীরা তাঁদের কন্যাদের অল্পবয়সে বিয়ে হোক তা চান না। কিন্তু আমি বেশ কয়েকজন ধনকুবের ব্যবসায়ীকে চিনি, যাঁদের চার-পাঁচটি মেয়ে থাকা সত্ত্বেও একটি পুত্রের জন্য তাঁরা অধীর যে কে বৃদ্ধাবস্থায় সম্পত্তির দেখাশোনা করবে। এ ধরনের প্রথা এখনো আমাদের মনে আছর করে আছে এবং এর জন্য আমাদের যথেষ্ট ভুগতেও হয়। নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া এ ধরনের ব্যাধি থেকে আমরা মুক্ত হব না। গ্রামের নারীরাই এ ধরনের বদ্ধচিন্তার শিকার হয় বেশি। নারীদের ভালোভাবে শিক্ষিত হতে হবে যাতে তারা সন্তান নেবে কি নেবে না সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিজেদের মত জানাতে এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারে। আমাদের এই শূন্যতা পূরণ করতে হবে এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছাতে হবে।

কাজী আলী রেজা
আমাদের জনসংখ্যার বেশির ভাগ দারিদ্র্যে ভুগছে। আমরা ইতিমধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) ১৫ বছরের মেয়াদি শর্তের ১১টি বছর পার করেছি। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, আমাদের অর্জন বেশ ভালো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা যখন স্বাধীন হই তখন আশি ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল, তাদের সংখ্যা ছিল ছয় কোটি। এখন যদিও সেই অনুপাতটা কমেছে কিন্তু দরিদ্র মানুষের সংখ্যা তেমনটাই আছে। এটা এক হতবিহ্বলকর পরিস্থিতি। আরেকটি যন্ত্রণাকর পরিসংখ্যান হলো, প্রতিবছর আমরা ১ শতাংশ করে কৃষি জমি হারাচ্ছি। এটা দুশ্চিন্তার বিষয়। গ্রাম বড় হচ্ছে। গ্রাম থেকে গ্রামের দূরত্ব ৩০ বছর আগের তুলনায় অনেক কমেছে। মানুষ এখন কৃষি জমি ব্যবহার করছে বেড়ে যাওয়া জনসংখ্যাকে জায়গা দেওয়ার জন্য। এতে করে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

ফারজানা ইয়াসমিন
বয়ঃসন্ধিকালের স্বাস্থ্য এবং প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। আমার মনে হয়, বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিতে থাকা মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা দরকার। পাঠ্য পুস্তকে এ সমস্ত বিষয়গুলো আনা দরকার।

এলা ডি ভগ্ড
সংসারজীবনে নারী ও পুরুষের মধ্যকার বৈষম্যও আমাকে যথেষ্ট পীড়িত করে। ডাক্তারের কাছে যাবে কি যাবে না, সে বিষয়ে মেয়েদের প্রায়শই কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার থাকে না। তাই নারী ক্ষমতায়ন ইস্যুকে সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

নাসরিন আক্তার
শহুরে বস্তিতে কাজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আমাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী মাসের মাঝামাঝিই শেষ হয়ে যায়, তখন অপেক্ষা করতে হয় পরের চালানের জন্য। তার মানে, সরকারের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিরাট রকম ঘাটতি রয়েছে। আমরা দেখেছি, সামগ্রিকভাবে প্রজননের হার কমলেও সত্য হচ্ছে, আওতার বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে এর প্রভাব পড়ছে না। যেমন ধরা যাক সাতক্ষীরার কথা, সেখানকার ত্রিপুরা পরিবারগুলোর সদস্যসংখ্যা সাধারণত ৮-১০ জন। তারা স্বাস্থ্য বা পরিবারপরিকল্পনা-সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানতে পারে না। উত্তরে দেখেছি, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা মূলত বয়ঃসন্ধিতে থাকা বিবাহিতদের মধ্যেই সীমিত, অন্য বয়ঃসন্ধিকালীন গ্রুপগুলো থাকে উপেক্ষিত। বয়ঃসন্ধিতে থাকা সবাইকেই প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতন করে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের তথ্য বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে থাকা উচিত।

গিয়াস উদ্দিন
জনসংখ্যা আর উন্নয়ন গভীরভাবে সম্পর্কিত বিষয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী হলো পরিবার পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু জড়িত অন্যান্যদের সঙ্গে মিলেই যৌথ কর্মসূচি থাকতে হবে। আগে পরিবার পরিকল্পনা দপ্তর স্বল্প লোকবল ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ভুগেছে। কিন্তু এখন আমাদের পর্যাপ্ত লোকবল ও অবকাঠামো আছে। বয়ঃসন্ধি কর্মসূচিকেও গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। আমরা তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করা এবং এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করায় সচেষ্ট আছি যাতে করে তাদের সহযোগিতা আমরা পাই। বাল্যবিবাহ আমাদের চোখে মারাত্মক এক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। বয়স নিরূপণেও জন্ম নিবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই ব্যাপকভাবে এর প্রচার হওয়া দরকার। পাশাপাশি উৎসাহী গণমাধ্যম ছাড়া গণমানুষের কাছে এ ধরনের তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

শামসুল আলম
আমাদের ভূমির যা সামর্থ্য তার থেকে বেশি জনসংখ্যা সবখানে। প্রতিবছর আমরা ১ শতাংশ করে আবাদি জমি হারাচ্ছি। এটা খুবই গুরুতর দুশ্চিন্তার বিষয়।
জনসংখ্যাতাত্ত্বিক দিক থেকে আমরা এক সুবিধাজনক অবস্থায় উপনীত হয়েছি। আমাদের ৬৩ শতাংশ মানুষই ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মধ্যে এবং যারা খুবই তৎপর। এ অবস্থা বেশি দিন ধরে রাখা যাবে না। দ্রুত উন্নয়নের জন্য আমাদের এই সুবিধা কাজে লাগানো উচিত।
জনসংখ্যা বিষয়টিকে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে হচ্ছে। কিন্তু এর জন্য স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় দরকার। মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে পরামর্শ দেওয়া এবং উদ্দীপ্ত করার জন্য আমাদের অনেক কর্মী দরকার। আমাদের ১৪টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৮৪টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এখন চালু আছে। আমাদের তাগিদ হলো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে জনসংখ্যা কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত করা। গ্রামীণ এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। গত ৪০ বছরে প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতির ফলে দারিদ্র্যের ৩৫ শতাংশ কমিয়ে আনার সফলতা এসেছে।
শহরে অভিবাসনের মাত্রা খুবই বেশি হওয়ায় শহরের বস্তিগুলোতে গুরুতর চাপ বাড়ছে। তাই বস্তি বিষয়ে আমাদের আরও মনোযোগী হতে হবে।

এ কে এম জাফর উল্লাহ খান
আমি বিবাহের নিম্নতম বয়সের বিষয়টিতে নজর দিতে চাই। এখন শৈশবের শেষ সীমার বছরটি, অর্থাৎ ১৮ বছর বয়সকে বিবাহের নিম্নতম সীমা করা রয়েছে। বয়সের এই সীমাকে আরও বাড়ানো উচিত। আমাদের সংসদ সদস্যরাও এ ব্যাপারে আইন সংশোধন করায় একমত। মাননীয় স্পিকারের মত হচ্ছে, বিবাহের নিম্নতম বয়স হওয়া উচিত বিশ। তাহলে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কীভাবে আমরা এটা বাস্তবায়ন করব। আমাদের পরামর্শ হলো সব বিবাহকে অবশ্যই নিবন্ধিত হতে হবে। নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বয়সের প্রত্যয়নপত্র জোগাড় করতে হবে। বাধ্যতামূলক নারীশিক্ষা আরেকটি উপায়। দশম শ্রেণীর আগে কোনো মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যাবে না।

হাবিবুর রহমান
আমাদের জাতীয় জনসংখ্যা নীতিটির নবায়ন দরকার। আমরা এখন ২০০৪ সালের নীতি দিয়ে চলছি। আরেকটি বিষয় হলো, যদিও ২০ বছর আগের তুলনায় আমাদের জনশক্তি এখন অনেক বেশি, তারপরও আরও দরকার। জনশক্তি রিক্রুট করা ভালো বিষয়। শেষ বিষয় হলো, প্রচার-প্রচারণা দরকার, সচেতনতা সৃষ্টি দরকার আর দরকার গণমাধ্যমের সহযোগিতা।

নূর মোহাম্মদ
এই পলিসি ডায়ালগের সব বক্তাকে ধন্যবাদ। আজকের এ আলোচনায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ এসেছে। বিশেষ করে দুটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কার্যক্রম নেওয়ার কথা এসেছে স্পষ্টভাবে। এরা হলো: নারী ও তরুণ জনগোষ্ঠী। আমরা সবাই জানি, আমাদের দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাই নারী। তাদের বাদ রেখে কোনো উন্নয়নের কথা ভাবাই যায় না। সুতরাং তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে হবে। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের মতামত নিতে হবে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীই হলো তরুণ। যেভাবে আমরা জেনেছি আজকের মূল উপস্থাপনা থেকে যে বিশাল জনগোষ্ঠী তরুণ এবং তারা কর্মক্ষম। এ তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি প্রশিক্ষিত করে তুলতে না পারি, তাহলে তারাই আবার বোঝা হয়ে দেখা দেবে। তাদের লাগসই প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে হবে, অন্যথায় আমরা একটা বিরাট সুযোগ হারাব। তারাই জাতিকে বাড়তি সম্পদ এনে দিতে পারে। এখানে উপস্থিত সম্মানিত মেম্বার, প্লানিং কমিশনের মাধ্যমে আমি অনুরোধ করব, আমাদের এখনই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে, যদি কিনা আমরা এই জনমিতিক সুযোগকে কাজে লাগাতে চাই। এ সুযোগ আমাদের দোরগোড়ায় এসে কড়া নাড়ছে, এখনই আমাদের প্রয়োজনীয় নীতিনির্ধারণ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন