বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য

অশুল্ক বাধাগুলোর অপসারণ এখন প্রধান কাজ

আসজাদুল কিবরিয়া | তারিখ: ০৩-১২-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook

শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার পরও ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি; বরং ২০১০-১১ অর্থবছরে যেখানে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি ৫০ কোটি ডলার অতিক্রম করেছিল, সেখানে ২০১১-১২ অর্থবছরে তা আবার ৫০ কোটি ডলারের নিচে নেমে গেছে।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, শুল্কমুক্ত সুবিধার সুফল পেতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের অশুল্ক বাধা, বিশেষত প্রক্রিয়াগত বাধা অপসারণ করা হবে এখন প্রধান কাজ। ভারত যত দ্রুত এসব বাধা অপসারণে অর্থবহ পদক্ষেপ নেবে, তত দ্রুত শুল্কমুক্ত সুবিধার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পাশাপাশি বাংলাদেশকেও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশের দিক থেকে যেসব জটিলতা বা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত অপসারণ করতে হবে। তা না করে একতরফাভাবে ভারতকে অভিযুক্ত করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হবে না।
উল্লেখ্য, ভারত সরকার গত বছরের নভেম্বর থেকে মাদক ও তামাকজাতীয় পণ্য বাদে সব পণ্যে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সদস্য মোস্তফা আবিদ খান প্রথম আলোকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অশুল্ক বাধাও আগের চেয়ে এখন অনেক কমেছে। যেমন, পণ্যের গুণগত মানের ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের সনদ আগের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছে। স্থলবন্দরগুলোতে পণ্য খালাসের সময়ও কিছুটা কমেছে। ভারতের দিক থেকে মূলত প্রক্রিয়াগত অশুল্ক বাধাগুলোই এখন বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এসব নিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে ও হচ্ছে। আশা করা যায়, আগামী দিনে এসব বাধাও অনেক কমে আসবে।’
মোস্তফা আবিদ খান আরও বলেন, ‘শুল্কমুক্ত সুবিধা যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা সৃষ্টিও একটা ব্যাপার। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের এ বিষয়ে সক্রিয় হতে হবে।’
ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ভারতে পণ্য রপ্তানিতে একটি বড় ধরনের অশুল্ক বাধা হলো, একাধিক ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বা হস্তক্ষেপ। পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যবিষয়ক মহা-অধিদপ্তর (ডিজিএফটি) এককভাবে ক্ষমতাবান নয়। ভারতের একাধিক সরকারি সংস্থা ও কর্তৃপক্ষও সে দেশে বিদেশি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা রাখে। ভারতে ডিজিএফটি যেমন নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে, তেমনি রাজ্য সরকারের শুল্ক বিভাগও দিতে পারে। এর ফলে ভারতের এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে প্রবেশের সময় কখনো কখনো বাংলাদেশি পণ্য আটকে দেওয়া হয়।
একাধিক রপ্তানিকারক জানান, রপ্তানিমুখী পণ্যের মোড়কীকরণ নিয়ে মাঝেমধ্যেই বিপাকে পড়তে হয়। যেমন, মোড়কের কোনখানে মেয়াদ উল্লেখ করতে হবে, তা নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ নির্দেশনা পরিবর্তিত হয়। কোনো পানীয় পণ্যের মেয়াদ বোতলের গায়ে, না বোতলের তলায় লেখা থাকবে, তা নিয়ে ভারতীয় শুল্ক কর্তৃপক্ষ একেক সময় একেক ধরনের নির্দেশনা দেয়।
রপ্তানিকারকেরা আরও বলেন, রপ্তানি করা পণ্যের রাসায়নিক পরীক্ষার ফল পেতে বেশ সময়ক্ষেপণ হয়। তামাবিল-ডাউকি সীমান্ত দিয়ে কোনো পণ্য প্রবেশ করার পর নমুনা পরীক্ষার জন্য যদি চেন্নাই বা দিল্লি পাঠানো হয়, তখন তার ফল আসতে মাস খানেক লেগে যায়। এই সময়কালে ভারতীয় স্থলবন্দরে পণ্য সংরক্ষণ করাও কঠিন।
পণ্য পরীক্ষার ফলাফল ডাকযোগে পাঠানোর বদলে ফ্যাক্সযোগে বা ই-মেইলে পাঠিয়ে সময় কমানোর জন্য একটি সুপারিশ অনেক দিন আগেই মেট্রো চেম্বারের (এমসিসিআই) পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) উপদেষ্টা মনজুর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অশুল্ক বাধা যেমন আছে, তেমনি বাংলাদেশের দিক থেকেও অনেক ঘাটতি আছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করি না। আর বিশ্বের কোনো দেশই তার ভোক্তাদের জন্য নিম্নমানের পণ্য নেবে না।’
মনজুর আহমেদ আরও বলেন, যেসব ক্ষেত্রে ভারত অযৌক্তিকভাবে বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধানের সঙ্গে সংগতিহীনভাবে বাণিজ্য-বাধা তৈরি করে, সেগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হলে দ্রুতই তা তুলে নেওয়া হয়। গত চার-পাঁচ বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এই অগ্রগতি হয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্যে বাংলাদেশের মান-সনদ কোনো প্রশ্ন ছাড়াই গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশকে পণ্যমান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়াতে হবে, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে হবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে ভারতে পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৪৯ কোটি ৮৫ লাখ ডলার আর ২০১০-১১ অর্থবছরে ভারতে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৫১ কোটি ২৫ লাখ ডলার। এর মানে হলো, ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ২ দশমিক ৮০ শতাংশ কমে গেছে।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন