স্মরণ
রাজনীতির এক শুদ্ধতম মানুষ
নূরুল ইসলাম
মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু-স্বজন, জনপ্রিয় শ্রমিকনেতা নূরুল ইসলাম ও তাঁর একমাত্র পুত্র তমোহর ইসলামের মৃত্যুর পর তিনটি বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু এখনো তাঁর স্বজন, সহকর্মী, আদর্শে বিশ্বাসী মেহনতি মানুষ নিশ্চিতভাবে জানতে পারলেন না এটা কি সত্যিই দুর্ঘটনায় মৃত্যু, না পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড! সেই রহস্যের জট এখনো শক্ত প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে যেন। তাঁর স্ত্রী ষাটের দশকের আধুনিক জীবনমনস্ক কবি রুবী রহমান এখনো নিথর, পাথরের মতো স্তব্ধ, নির্বাক। একই সঙ্গে স্বামী ও পুত্র হারানোর বেদনায় প্রতিনিয়ত অশ্রুসজল। এরই মধ্যে নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছেন তাঁদের মৃত্যুর সঠিক কারণ সবার সামনে নিয়ে আসার। তাঁর প্রশ্ন, ঘটনাস্থল-ফ্ল্যাটজুড়ে বিস্ফোরণের আলামত এবং বিষাক্ত কালো ধোঁয়ার চিহ্ন সুস্পষ্ট থাকার পরও কেন তদন্তে আসল সত্য উঠে আসছে না? অদৃশ্য কোনো সুতার টানে এই সত্যটি বারবার চাপা পড়ে যাচ্ছে।
নূরুল ইসলাম ষাটের দশক থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শ্রমিকদের দাবি ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। এই নূরুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় তাঁর স্ত্রী রুবী রহমানের সূত্র ধরে। কিন্তু তাই বলে তিনি আমার জানাশোনার বাইরে ছিলেন, তা কিন্তু নয়। তাঁকে আমি জানতাম একজন নীতিনিষ্ঠ, ত্যাগী, জনপ্রিয় শ্রমিকনেতা হিসেবে। শ্রদ্ধা করতাম অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষ, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। ১৯৬২-এর শিক্ষা কমিশন, সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা, আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থানসহ মুক্তিযুদ্ধ—সর্বত্রই তাঁর ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল ও অগ্রগণ্য।
আমি একটি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে থাকায় রুবী রহমানের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল শুধু কবিতার জন্য নয়, তাঁর সহজাত অপূর্ব কিছু গুণের জন্য। তিনি আমার প্রিয় মানুষও হয়ে উঠেছিলেন। সেই পরিচয় আরও দৃঢ় হলো কচিকাঁচার মেলার সুবাদে। এই সংগঠনের সঙ্গে রুবী আপা যেমন, তেমনি আমিও গভীরতম ভালোবাসা নিয়ে আদর্শিকভাবে দীর্ঘদিন যুক্ত। এই কচিকাঁচার মেলার পক্ষ থেকে মেলার পরিচালক খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ভাইয়ের সঙ্গে এক বিকেলে রুবী আপার লালমাটিয়ার বাসায় গেলে নূরুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। সেদিন এই প্রখর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সহজিয়া হাসিখুশি, সামাজিক রূপটি আমায় মুগ্ধ করে। খুব কাছ থেকে অসাম্প্রদায়িকতার আইকন, শির উঁচু এই মানুষটিকে দেখে নিজের ক্ষুদ্রতাকে উপলব্ধি করে বিব্রত হয়েছিলাম। তারপর নানা অনুষ্ঠানে এবং কচিকাঁচার মেলায় তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। শিশু-সংগঠন না করলেও শিশুদের প্রতিভা বিকাশ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম ছিলেন। তাই কচিকাঁচার নানা কর্মসূচিতে তিনি উপস্থিত থেকে তাদের উৎসাহ দিয়েছেন। সব দিক বিবেচনায় শুধু এ কথাটি জোর দিয়ে বলতে পারি, তিনি সত্যিই উদাহরণতুল্য বিরল বৈশিষ্ট্যের মানুষ। কোথায় ছিলেন না তিনি। ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, ট্যানারি শ্রমিক সংগঠন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শ্রমিক কর্মচারীদের ইউনিয়ন সর্বত্র সব আন্দোলনে। রাজনীতিসচেতন আজীবন সংগ্রামী এই মানুষটি মৃত্যুর আগে গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ছিলেন। এবং পার্টির নেতা হিসেবেই তিনি সহ-অংশীদার ক্ষমতাসীন মহাজোটের এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। হয়তো নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন বলেই, কোনো কোনো মহল তাঁকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। তাই ২০০৮-এর নির্বাচনের আগেই তাঁকে বিদায় নিতে হলো মর্মান্তিকভাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এর পরও এই সরকারের সময় তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ আজও জনসমক্ষে উদ্ঘাটিত হলো না। প্রশ্ন সবার মনে, এই সরকার থাকাকালীন উদ্ঘাটিত না হলে আদৌ কি তা কখনো আলোর মুখ দেখবে?
রাজনীতির শুদ্ধতম মানুষ, সৎ রাজনীতি ও শ্রমিক আন্দোলনের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব চেয়েছিলেন নির্বাচনে জিতে মেহনতি মানুষের অধিকার সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে। এই স্বপ্ন দেখাটাই কি তাঁর কাল হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু আমরা জানি, স্বপ্ন তো ভালোবাসারই ফসল। আমরা তো তাঁর সারা জীবনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ভেতরের কল্যাণকামী মানুষটিকে দেখতে পেয়েছিলাম, কোনো সন্দেহ নেই। তিনি জিনিয়াস, নির্ভীক এবং শুদ্ধ। কোমলে-কঠোরে গড়া এই আপসহীন মানুষটিকে তাই কি বৈরী নিষ্ঠুর সমাজ বাঁচতে দিল না? নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি বলে গেলেন, ‘আর কত বিচারহীন অসহায় মৃত্যু তোমরা দেখতে চাও?’
আমরা সাধারণ মানুষ এর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার চাই। না হলে এ দেশটি ক্রমশ ভালো মানুষশূন্য হয়ে স্থায়ীভাবে সন্ত্রাস ও পেশিশক্তির করতলগত হবে। মানুষের মুক্তির জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করছেন, আর তাই এই মুক্তিকামী মানুষের মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন চিরদিন। রাজনীতিতে সুনীতির মৌলিক অবস্থানকে দৃঢ় করা এই মানুষটি কখনো হারিয়ে যাবেন না।
দিল মনোয়ারা মনু
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






