বাংলা ভাষা
বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক নীতি
-
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
ছবি: সৈকত ভদ্র
-
ভিলেম ভ্যান শেন্ডেল
বাংলা পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। এ ভাষা ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একে দৃশ্যগোচর করার জন্য এখন দরকার একটি নীতি। লিখেছেন আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক এশীয় ইতিহাস বিভাগের সভাপতি ও বাংলাদেশ-গবেষক ভিলেম ভ্যান শেন্ডেল।
আমি কথা বলি ডাচ ভাষায়। এটাই আমার মাতৃভাষা। শিশুকালে আমি এই ভাষা শিখেছি, এই ভাষায় আমি স্বপ্ন দেখি, আমার ভাবনাচিন্তা আর অনুভূতিগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে আমি এই ভাষাতেই প্রকাশ করতে পারি। আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও আমি এই ভাষাতেই কথা বলি।
খুব সম্ভবত আপনিও বাংলাভাষী এবং ডাচ ভাষা আপনার সামান্যই অথবা একেবারেই অজানা। আপনি হয়তো জানেন, ভাষা দুটি দূর সম্পর্কের ভাইবোন। কিছু কিছু শব্দে তো দারুণ মিল। যেমন মুখের যে সাদা জিনিসটিকে আপনি ‘দাঁত’ বলেন, আমি তাকে বলি ‘তাঁত’। ‘ইসক্রুপ’ বা ‘হরতন’ বা ‘তুরুপ’ শব্দগুলো বলার সময় হয়তো না জেনেই আপনি ডাচ ভাষা ব্যবহার করছেন। এ রকম অজস্র মিল আছে আমাদের দুই ভাষার মধ্যে। যেমন বাংলা ও ডাচ উভয় ভাষারই প্রথম শনাক্তযোগ্য বাংলা পাণ্ডুলিপির কাল দশম শতাব্দী। দুটি ভাষাতেই বিপুল ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক ঐতিহ্যের বিকাশ হয়েছে। পৃথিবীতে তিনটি দেশের—নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও সুরিনামের—জাতীয় ভাষা ডাচ। বাংলাও তেমনই বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা এবং ভারতের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা।
বাংলাভাষীরা ডাচ ভাষা সম্পর্কে সামান্যই জানেন। ডাচভাষীরাও বাংলা সম্পর্কে অতি অল্পই ধারণা রাখেন। এতে কি কিছু যায় আসে, দুনিয়াতে ভাষা যেখানে হাজারটা? অন্যেরা কেন বাংলা ভাষা সম্পর্কে জানতে আসবে? কিন্তু কেবল ডাচভাষীরাই যে বাংলা সম্পর্কে অজ্ঞ তা নয়, বঙ্গীয় বদ্বীপ আর বিশ্বময় ছড়ানো অভিবাসী বাঙালিদের বাইরে বাংলা প্রায় এক অদৃশ্য ভাষা। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক এবং চিন্তারও বিষয়। বাংলা পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম ভাষা হলেও আন্তর্জাতিকভাবে এটা সবচেয়ে কম পরিচিত ভাষাগুলোর একটি। সত্যি বলতে কী, এমন কথাও কেউ বলতে পারেন যে পঞ্চাশ বছর আগেও যতটা ছিল, বাংলা ভাষা এখন তার চেয়ে কম দৃশ্যমান। এক পণ্ডিত যখন লেখেন, ‘নবম অথবা দশম শতাব্দীতে লিখিত বৌদ্ধ সান্ধ্যভাষার সময় থেকে...বর্তমান পর্যন্ত বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যে কোনো ছেদ পড়েনি। তবু এটা এক রকম বিস্ময়ের ব্যাপার, এত প্রাচীন ও এত সমৃদ্ধ সাহিত্য সম্পর্কে পাশ্চাত্য সামান্যই সজ্ঞান।’ তখন আপনি যুক্তি দিতে পারেন, পঞ্চাশ বছর আগের চেয়ে তো বাংলার পরিচিতি কিছুটা বেড়েছে।
পঞ্চাশ বছর আগে, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বেশ কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা শেখা যেত। কিন্তু আজ আর সেই দিন নেই। বাংলাভাষীরা সংখ্যায় ডাচভাষীদের চেয়ে ১০ গুণ বেশি হলেও আজকাল দুনিয়ার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলা কোর্সের চেয়ে বেশি হারে ডাচ ভাষার কোর্স চালু আছে। যেমন বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে লেখা আছে: ‘যুক্তরাষ্ট্রে একমাত্র একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নিয়মিতভাবে বাংলা শেখানো হয়, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তা হয় বিক্ষিপ্তভাবে।’ পরিণামে, বাংলা ভাষা এর বৈশ্বিক আবেদন ও দৃশ্যমানতা বিপুলভাবেই হারিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ, বিদেশে বাংলা শেখানো লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে।
পরিষ্কারভাবে, আমাদের এখন বাংলার জন্য একটি আন্তর্জাতিক নীতি প্রণয়ন করা দরকার। খুবই আশ্চর্যের বিষয়, তার ভাষা আন্দোলনের জন্য যে বাংলাদেশ গর্বিত, যারা সফলভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠা করেছে, বিদেশে বাংলা শেখানো উৎসাহিত করায় এখনো পর্যন্ত তাদের কোনো কার্যকর নীতিমালা নেই।
এ ব্যাপারে ডাচ ভাষার অভিজ্ঞতা থেকে প্রেরণা পাওয়া যেতে পারে। ১৯৮০ সালে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও সুরিনামের সরকার হাতে হাত মিলিয়ে ‘তালুনি’—ডাচ ভাষায় যার অর্থ ‘ভাষিক ঐক্য’—গঠন করেছে। তালুনির কাজ দুনিয়াজুড়ে ডাচ ভাষার শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়া। এটা এক অনন্য সংগঠন। পৃথিবীর আর কোথাও একই ভাষার দেশগুলোর মধ্যে এ রকম কোনো চুক্তি হয়নি। এটা খুবই কাজের কাজ হয়েছে। এখন বছরে ১৫ হাজার শিক্ষার্থী—মেক্সিকো থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা, তুর্কি থেকে জাপান, ফ্রান্স থেকে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত—এই ভাষা অধ্যয়ন করে। এবং তাদের সেরা অংশকে গ্রীষ্মের ছুটিতে নেদারল্যান্ডসের সামার স্কুলে আমন্ত্রণ করা হয়।
আমরা কি ভাবতে পারি না যে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা সরকার একই রকম কিছু করুক? বাংলা একাডেমী কি বাংলা ভাষার জন্য একটা মোক্ষম আন্তর্জাতিক নীতি প্রণয়নের কাজ সমন্বয় করতে পারে না? বিশ্বজুড়ে ছড়ানো প্রবাসী সংগঠনগুলো কি এ ধরনের উদ্যোগে জড়িত থাকতে পারে না? অবশ্যই পারে। বাংলা ভাষাকে বর্তমানের চেয়ে আরও জোরালোভাবে বিশ্বময় উপস্থাপন করা গেলে বাঙালিদের মতো ভাষাগর্বী সমাজের মানুষ অবশ্যই বিপুলভাবে লাভবান হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
অধ্যাপক ভিলেম ভ্যান শেন্ডেল, নেদারল্যান্ডস







Masum
২০১২.১১.২৭ ২৩:৩৯