মানুষ

তারা বদলে দিতে পারে পৃথিবীকে

ফিলিপ কটলার | তারিখ: ২৫-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • ফিলিপ কটলার

    ফিলিপ কটলার

  • প্রাপ্য সম্পদ কাজে লাগিয়ে কঠোর পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে সেসব অতিক্রম করার মতো সাহসী মানুষের দেশই হলো

    প্রাপ্য সম্পদ কাজে লাগিয়ে কঠোর পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে সেসব অতিক্রম করার মতো সাহসী মানুষের দেশই হলো বাংলাদেশ

    ছবি: সাহাদাত পারভেজ

বাংলাদেশের মানুষের দৃঢ় সংকল্প ও অদম্য প্রাণশক্তি তাঁদের নিয়ে এসেছে এক অফুরন্ত সম্ভাবনার দিগন্তের সামনে। তাঁরাই একদিন বদলে দিতে পারে চেনা এই পৃথিবীকে। তথ্য ও যুক্তি তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিপণন বিভাগের অধ্যাপক ও বিপণনগুরু ফিলিপ কটলার।

আমরা বাস করছি গুণগত মান আর পরিমাণের জন্য অবিরাম লড়াইয়ের এক সময়ে। হাজারো জিনিস যখন আমাদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য পাল্লা দিয়ে চলেছে, সময় তখন নিয়ন্ত্রণের অতীত এক অপ্রতুল সম্পদ। যোগাযোগের হট্টগোল যত বেড়ে উঠছে, ততই মানুষের মন, হূদয়, এমনকি আত্মাকেও কোনো বার্তার পক্ষে স্পর্শ করা কঠিন হয়ে পড়ছে—যদি না তার পেছনে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে স্পর্শ করার মতো শক্তিশালী কোনো কাহিনি থেকে থাকে। এককালে বিভিন্ন পণ্য আর সেবার জন্য তুলে রাখা অতি আধুনিক বিপণন কৌশল প্রয়োগ করে বিভিন্ন দেশ আজকাল সমান মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইছে। যেকোনো জাতি, বিশেষ করে উন্নয়নশীল জাতির পক্ষে এটি এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, বহির্বিশ্বের কাছে—তাদের মিডিয়া, বিনিয়োগকারী বা সরকারগুলোর কাছে—কীভাবে সে তার পূর্ণ সম্ভাবনাটি এমনভাবে তুলে ধরতে পারে যাতে সেটি তার বাস্তবতা, অন্ততপক্ষে আবিষ্কৃত বা উদ্ভাবিত বাস্তবতার কাছাকাছি কিছু একটা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত উন্নয়নশীল দেশগুলোর ধারণা ১০ বছর আগে সফল দেশগুলোর সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্ট কুড়োনোয় পর্যবসিত হয়েছে। এসব জাতি ব্যবসায়, বিনিয়োগ, পর্যটন ও অপরাপর আন্তর্জাতিক বিষয়ে অংশগ্রহণ এবং আরও সমৃদ্ধি লাভের সুযোগ নষ্ট করেছে।
সত্যি বলতে কি, ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা লাভের আগে বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার ধারণা খুবই সীমিত ছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের কাহিনি আর অধ্যাপক ইউনূসের হতদরিদ্র ও বিশেষ করে নারীদের নোবেল পুরস্কারের পথে নিয়ে যাওয়ার কথা জানতাম। তৈরি পোশাকশিল্প ছিল আরেকটি দিক, যা দেশের উন্নয়নকে তুলে ধরেছিল। কিন্তু এসব ধরাবাঁধা বিষয়গুলোর বাইরে বাংলাদেশের সম্পর্কে উৎসাহব্যঞ্জক আর কোনো কিছুই ছিল না। আসলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই দেশ সফর দুটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে: ও, বাংলাদেশ? কোথায় যেন দেশটা? কিংবা, আচ্ছা, বাংলাদেশে, তা-ই?
কিন্তু সত্যি সত্যি, এ দেশে আমার প্রথম সফরেই আমি বিস্মিত হয়েছি। মানুষের আতিথেয়তা, তাদের প্রাণশক্তি আর উৎসাহ দেখে আমি অভিভূত। জনসংখ্যার চ্যালেঞ্জ আর জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলা করে এ দেশের ১৬০ মিলিয়নের বেশি মানুষ এগিয়ে চলেছে এবং তাদের প্রাণের ছন্দ এতটাই সর্বব্যাপী যে ঢাকার গাড়িঘোড়ার শোরগোলের ভেতরও সেটা নজরে না পড়া প্রায় অসম্ভব।
তিন দিনে নানা পটভূমি থেকে আসা হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তাদের সবার একটা বিষয়ে মিল আছে: জীবনের নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিয়ে জীবনযাত্রার মানকে চ্যালেঞ্জ করার সংকল্প। স্নাতক পর্যায়ের প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমার, নিজেদের জীবন এবং দেশকে উন্নত করে তুলতে তাদের উৎসাহ আর আবেগ স্পষ্ট করে বুঝতে পেরেছি। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ ৩৫ বছরের নিচে বলে এরাই আসলে বাংলাদেশের সম্ভাবনার মূল। ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশ আগামী দুই দশকে দেশকে দারুণভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো জনসংখ্যার সুবিধা ভোগ করছে। তবে এ কথা বলতেই হবে যে মূল্যবোধরহিত ভ্রান্তনীতিতে পরিচালিত হলে এই মূলধন জনসংখ্যা-বোমায় পরিণত হতে পারে। সাংসদদের সঙ্গেও কথা বলার সুযোগ হয়েছিল আমার, সেখানেও সাধারণ পণ্য ও সরকারি সেবার উন্নয়নের জন্য সরকারি বিভিন্ন সংস্থার চিন্তাধারায় বিপণনকে আলিঙ্গন এবং এর চেতনা গড়ে তোলার উত্তেজনা লক্ষ করেছি। আলোচনার সময় হলঘরভরা বাজারের ‘নেতা’ অর্থাৎ বিপণন ক্ষেত্রে নতুন সবকিছু নিবিষ্টমনে জানতে আগ্রহী পেশাজীবীদের সঙ্গেও মিলিত হয়েছি। তা ছাড়া সারা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকদের সঙ্গেও আমার দেখা হয়েছে। বিশ্বের এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
যেখানে গেছি, সেখানেই একই ধরনের কৌতূহল আর শেখার আগ্রহ ও পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি লক্ষ করেছি। এখানকার মানুষ উন্নতির অবকাশ থাকার কথা স্বীকার করার ব্যাপারে বিনয়ী। আর এটিই উন্নয়নের পথে প্রথম পদক্ষেপ। মানুষের প্রাণশক্তি আর ইতিবাচকতাকে কর্মমুখী পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে পরিচালিত করতে পারলেই বাকিটুকু হয়ে যাবে। সব অর্থনীতিরই নিজস্ব শক্তি রয়েছে। আর এই শক্তির ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন কৌশল বেছে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। বিশ্বমান অর্জন করতে পারবে, বাংলাদেশের জন্য এমন দুটো বা তিনটি শিল্পখাত বেছে নেওয়া জরুরি। প্রধান শিল্পখাতগুলোকে শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলতে হলে প্রয়োজন হবে বিনিয়োগকারী ও উপকরণ জোগানদাতাদের ‘গুচ্ছ’ গড়ে তোলা। তা ছাড়া চীন, ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়া খুব দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে চলছে। ওদের কাছ থেকেও এ দেশটি শিক্ষা নিতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সেই প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলো—অর্থাৎ যারা দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বা পর্যটকদের আকর্ষণ করবেন—তাদের প্রতিও যথার্থ দৃষ্টি দিতে হবে। সুতরাং অনুপ্রেরণা-সৃষ্টিকারী ঘটনা, অসাধারণ সব অভিজ্ঞতা আর অভিভূত করা আতিথেয়তা দিয়ে ভাবমূর্তি উন্নত করতে হবে।
আমার সংক্ষিপ্ত অবস্থানের সময় আমিও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে, তাদের পর্যবেক্ষণ করে অনেক কিছু শিখেছি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু অসাধারণ সাফল্যের কথাও জানতে পেরেছি। এর সবই এ কথা বোঝায় যে বৈরী অবস্থা মোকাবিলার, সমস্যাকে সুযোগের দৃষ্টিতে দেখার এবং শেষ পর্যন্ত প্রাপ্য সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কঠোর পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে সেসব অতিক্রম করার মতো সাহসী মানুষের দেশই হলো বাংলাদেশ। তাই আমার মনে হয়েছে, বিপণনের মাধ্যমে উন্নত পৃথিবীর অনুসন্ধানের কাজটি এই অসাধারণ দেশ থেকেই শুরু হওয়া উচিত। পৃথিবীর প্রধান কিছু সমস্যা পিরামিডের একেবারে নিচে বসবাসকারী বিশ্বের চার বিলিয়ন মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আমার ধারণা, বাংলাদেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার প্রমাণিত নজিরের কারণেই যুগপ্রাচীন এসব সমস্যার সমাধান উদ্ভাবনের অসাধারণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
আমি বাংলাদেশের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করছি। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি জানাই আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, যারা এ পৃথিবীকে একদিন বদলে দেওয়ার মতো একটি আন্দোলন সূচনায় সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
ফিলিপ কটলার, যুক্তরাষ্ট্র

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন