শিরোনাম:

মাতৃভাষা দিবস

ভাষা বাঁচলে আমরাও বাঁচি

ইরিনা বোকোভা | তারিখ: ২৫-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
  • ইরিনা বোকোভা

    ইরিনা বোকোভা

  • ভাষাশহীদদের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে শোভাযাত্রা

    ভাষাশহীদদের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে শোভাযাত্রা

    ছবি: প্রথম আলো

বাঙালির একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদ দিবস এখন বিশ্ববাসীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিবস পৃথিবীর প্রতিটি বিপন্ন ভাষার আত্মরক্ষার প্রেরণা। এর বর্তমান তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছেন ইউনেসকোর মহাসচিব ইরিনা বোকোভা।

নেলসন ম্যান্ডেলা একবার বলেছিলেন, ‘কারও জানা ভাষায় কথা বললে সেটা তার মাথায় ঢুকবে। কারও আপন ভাষায় বললে তা স্পর্শ করবে তার হূদয়।’ ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই সত্যিকারের সংলাপ ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সৃষ্টির সূচনা হয়। সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করায়, সবার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোয় এবং টেকসই মানব উন্নয়নে বহুভাষিকতা আমাদের মিত্র বটে। আমাদের সময়ে পৃথিবী যখন ভুগছে প্রাকৃতিক সম্পদের অভাবে, তখন আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদের বড় অংশকেই সম্পদ বলেই গণ্য করা উচিত। এর মধ্যে মহামূল্যবান সম্পদ হলো আমাদের চিন্তা আর ভাব প্রকাশের ভাষা।
অনুভবের গভীরতা দিয়ে আমরা যা আগে থেকেই জানতাম, গবেষণায় এখন তা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা জেনেছি, বহুভাষিকতা ও ভাষাবৈচিত্র্য ‘সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ অর্জন এবং ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে আরও বেগবান করে। সমীক্ষা আরও দেখাচ্ছে, বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী নিদান। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষাদানকে উন্নত করায় এই জ্ঞান আমাদের অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। দেখা গেছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো, যেমন আদিবাসী জনসাধারণের মাতৃভাষা প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। সমতা ও সবার সংহতির বোধকে সমাজে জোরদার করতে হলে খুব ছোটবেলাতেই তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দিতে হবে। এরপর আসবে জাতীয়, সরকারি বা অন্যান্য ভাষায় শিক্ষাদানের প্রশ্ন।
বহুভাষিকতার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটালে কাজের সুযোগ বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ বছর আগে বাংলাদেশে কারোরই মোবাইল ফোন ছিল না। আজ জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশই এ প্রযুক্তি প্রতিদিন ব্যবহার করছে। এসব তারা কাজে লাগাচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ পাওয়ার কাজে, চিকিৎসার প্রয়োজনে কিংবা শিক্ষার দরকারে। এসব উপকরণের সুবাদে জ্ঞানের বিনিময়ের ক্ষেত্রে সবার প্রবেশাধিকার ঘটেছে এবং সবাই ঠাঁই পাচ্ছে বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ জগতে। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে বহুভাষিকতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মিলমিশ ঘটানো মানে বহু রকম উদ্ভূত সমস্যা মোকাবিলায় সৃজনশীলতার অর্গল খুলে দেওয়া। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় বিশ্বের জন্যই এটি একটি উন্নয়নের সুযোগ।
এসব কারণেই ইউনেসকো ইন্টারনেটের পরিসরে বহুভাষিকতার পৃষ্ঠপোষকতায় সংকল্পবদ্ধ। পৃথিবী সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং জ্ঞানের সব উৎস ও প্রকাশের সব রকম অভিব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়ার কাজে প্রগতির শক্তিকে বেগবান করতেই হবে। আমাদের প্রজন্ম যোগাযোগের অজস্র নতুন প্রযুক্তিতে বলীয়ান। আমাদের রয়েছে বিশ্বজুড়ে ছড়ানো ইন্টারনেট-নির্ভর জনমঞ্চ। এ অবস্থায় আমাদের ভাষাগুলোর কোনো রকম গৌণকরণ আমরা মেনে নিতে পারি না। কারণ এই ভাষাগুলো সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সৌধের একেকটি সোপান। বহুভাষিকতা এই নতুন বৈশ্বিক সুযোগ ও বিস্তৃত পরিসরের সম্ভাবনার চাবিকাঠি।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমাদের বিশ্বায়িত পৃথিবীরই বাস্তবতা। এখন এর শ্রেষ্ঠ সুফল পাওয়ার নীতি প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। সংগীত ও চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে প্রকাশনা ও মাল্টিমিডিয়া এবং সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শিল্প খাতগুলো আমাদের উদ্ভাবনাকে এগিয়ে নিচ্ছে। সৃষ্টি করছে কাজের সুযোগ এবং বাড়াচ্ছে সামাজিক নিবিড়তা। বিশেষ করে বাংলাদেশে এর গতি অত্যন্ত শক্তিশালী। কেননা, এখানে ভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষার প্রশ্নটিকে জাতীয় উন্নয়নের সামনের সারিতে রাখা হয়েছে।
সংস্কৃতি মানে কাজ এবং বিকাশ ও অংশীদারি। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা ব্যাপক। সামনের বছরগুলোতে বিনোদন ও মিডিয়াশিল্পে এশিয়াই সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির রেকর্ড করতে চলেছে। বাৎসরিক গড় হিসাবে তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দা সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক সৃজনশীল খাতগুলো এ অঞ্চলে সজীব ও বিকাশশীল থাকতে পেরেছে।
এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। বিশ্বের অনেক দেশই তাদের সৃজনশীল ক্ষেত্রের অর্থনৈতিক বিকাশের নীতি প্রণয়ন করছে। এসব আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। আরও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আমাদের প্রয়োজন নতুন ধ্যানধারণা ও মনোভঙ্গি। নাগরিকতার নতুন ধরন এবং সমৃদ্ধ ও বহুপক্ষীয় পরিবেশের স্বার্থে আমাদের দরকার হবে একসঙ্গে থাকা ও একসঙ্গে কাজ করার উপযোগী নতুন নতুন দক্ষতার বিকাশ। এই যাবতীয় প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে বহুভাষিকতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেতনা।
এ জন্য আমাদের দরকার সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সমন্বিত সহযোগিতার প্রণালি এবং অধিকতর অংশগ্রহণমূলক সুশাসনের কাঠামো। উন্নয়নের কারিগর এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোক্তা ও শিল্পীদের মধ্যে তাই উন্নয়নের সাংস্কৃতিক মাত্রা বিষয়ে অধিকতর সচেতনতা সৃষ্টি এবং সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আমাদের শক্ত ভিত্তি নির্মাণের প্রয়োজন আছে। সাংস্কৃতিক প্রকাশের সুরক্ষা ও সহায়তা শীর্ষক ইউনেসকোর ২০০৫ সালের যুগান্তকারী সম্মেলনই ছিল প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কার্যক্রম। এর উদ্দেশ্য ছিল সাংস্কৃতিক পণ্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে আত্মপরিচয়ের বাহন হিসেবে দেখা এবং সংস্কৃতি ও উন্নয়নকে এর কেন্দ্রে স্থাপন করা। এই সম্মেলন ছিল বৈচিত্র্যে স্পন্দমান দুনিয়ায় আমাদের হাতিয়ার।
রাষ্ট্রগুলো ধাপে ধাপে তাদের প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নির্মাণে এই সম্মেলনের প্রভাবকে কাজে লাগাতে পারছে। এখানে দায়িত্বটি ব্যাপক। ২০০০ সালের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সংস্কৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাই ২০১৫ সালে যে নতুন বিশ্ব উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হবে, অবশ্যই তার কেন্দ্রে সংস্কৃতির প্রশ্নটি থাকতে হবে। এসব কারণেই ইউনেসকো চেষ্টা করছে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে উন্নয়ন কৌশল এবং সহযোগিতার সম্মুখভাগে স্থাপন করতে। জনগণের সাংস্কৃতিক বিশেষত্বের প্রতি যত্নবান থেকে নীতিনকশা প্রণয়ন করা আমাদের যৌথ দায়িত্ব। তাদের পূর্ণ সমর্থন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার স্বার্থে আমাদের এসব বিবেচনাকে একত্রে গাঁথতে হবে।
ক্রমেই বাড়তে থাকা আন্তসম্পর্কের এই পৃথিবীতে, পারস্পরিক জানাজানি ও সহযোগিতার বর্ণাঢ্য সব সুযোগের দরজা খুলে দিচ্ছে বহুভাষিকতা। আজ এই সম্ভাবনা হুমকির মুখে। ইউনেসকো প্রকাশিত অ্যাটলাস অব দা ল্যাঙ্গুয়েজেস ইন ডেনজার দেখাচ্ছে, পৃথিবীর ছয় হাজারেরও বেশি ভাষার প্রায় অর্ধেকই এই শতাব্দীর শেষাশেষি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। যেকোনো একটি ভাষার বিলোপে সব ভাষাই বিপন্ন হয়ে পড়ে। সে জন্য আবার আমাদের প্রত্যেকের অধিকার রক্ষা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করার লড়াইয়ে ফিরে আসতে হবে। মানব উন্নয়ন যেন মানুষের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করে। এ জন্য মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের পূর্বশর্ত হিসেবে অবশ্যই আমাদের ভাষার বৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিকে দেখতে হবে। জীববৈচিত্র্য মানুষের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ভাষাবৈচিত্র্যের গুরুত্বও ততটাই এবং এই দুই বৈচিত্র্য নিবিড়ভাবে পরস্পর-সম্পর্কিত।
এই সময়ে যখন সব সমাজে অসহিষ্ণুতা বেড়েই চলেছে, বহুভাষিকতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্ব তখন বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের রসদ। এ জন্যই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার জন্য সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির সংলাপ ঘটানোর উদ্যোগ আমাদের অবশ্যই দ্বিগুণ শক্তিশালী করতে হবে। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে যাতে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়, তার জন্য আমাদের প্রতিটি সুযোগই কাজে লাগাতে হবে। এটিই হলো শান্তির সংস্কৃতির বুনিয়াদ।
এর সবই ভাষার বহুত্বকে রক্ষার কাজে দুনিয়াকে আলোড়িত করার মতো নেতাদের আহ্বান জানাচ্ছে। মাতৃভাষাকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকারকে পারস্পরিক বোঝাপড়া, শ্রদ্ধা ও সবার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বাহন হিসেবে নেওয়ায় ইউনেসকো বাংলাদেশকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা জানায়। ভাষার বৈচিত্র্য রক্ষাকে যাতে প্রলম্বিত শান্তির ভিত্তি এবং টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি করে তোলা যায়, সে লক্ষ্যে ইউনেসকো ভাষার জন্য বাঙালির রক্তঢালা ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে এবং ১২ বছর ধরে দিবসটি পালন করে আসছে। আমাদের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেন সবার কণ্ঠস্বর শোনা যায়, তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। ভাষাই বলে দেয় আমরা কে। ভাষা বাঁচলে আমরাও বাঁচি।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
ইরিনা বোকোভা, বুলগেরিয়া

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন