চায়ের দোকানদার। অসামান্য তাঁর শিক্ষানুরাগ। চা বিক্রির টাকায় ৫২ শতক জমি কিনে বিদ্যালয় তৈরির জন্য দান করেন। সেই বিদ্যালয়ে এখন শত শত শিক্ষার্থী। নিঃসন্তান। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই তাঁর সন্তান এবং নাতি-নাতনি। বিদ্যালয়ের পাশেই এখনো চায়ের দোকান চালান। স্বপ্নপূরণের আনন্দের কথা বলছেন তিনি

আমার স্বপ্নের পাঠশালা

আবদুল খালেক | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শিক্ষকদের সঙ্গে আবদুল খালেক

বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শিক্ষকদের সঙ্গে আবদুল খালেক

ছবি: এম সাদেক

আর দশটি গ্রামের চেয়ে একটু আলাদা এই গ্রামটি। এখানকার অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত। মানুষের মধ্যে কিছুটা কুসংস্কারও রয়েছে। এর মধ্যেও এলাকার হাতে গোনা কয়েকজন তরুণ বিএ পাস করেছেন। গ্রামের মানুষজন ওদের নাম বিকৃত করে উচ্চারণ করত। বিষয়টি আমার মতো একজন নগণ্য চায়ের দোকানদারের মনে দাগ কাটে। চা বানাতে গিয়ে একদিন প্রতিজ্ঞা করলাম, গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাঁদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। ওই ভাবনা থেকেই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই। তাই তো চা বিক্রির টাকায় নিজের কেনা ৫২ শতক জমি উৎসর্গ করি প্রতিষ্ঠানের জন্য। এখন আমার ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শত শত শিক্ষার্থী। প্রতিদিন বিদ্যালয়ের সামনে বসে চা বানাই, আর শিক্ষার্থীদের হই-হুল্লোড় দেখি। এসব দেখে পরান জুড়িয়ে যায়। মনে শান্তি পাই। মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীরা আমার সঙ্গে দুষ্টুমি করে। আমার স্ত্রী, সন্তান না থাকায় ওদেরই আমার সন্তান এবং নাতি-নাতনির মতো মনে হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাকে ‘দাদু’ বলে সম্বোধন করে। শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ একে দাদুর স্কুল নামেই ডাকে। তখন কী যে ভালো লাগে, তা বলে শেষ করা যাবে না। আমি বলি, এটি আমার স্বপ্নের পাঠশালা। সেই পাঠশালার নাম আমার নামে করতে চেয়েছিল অনেকেই। আমি রাজি হইনি। গ্রামের নামের সঙ্গে মিল রেখে বিদ্যালয়ের নাম রাখা হলো ‘নলুয়া চাঁদপুর উচ্চবিদ্যালয়’।
কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক লাগোয়া বরুড়া উপজেলার নলুয়া চাঁদপুর গ্রাম। গ্রামের প্রয়াত মাক্কু মিয়া ও হাসমতের নেছার বড় ছেলে আমি। আমার জন্ম ১৯৩০ সালে। ১৯৪২ সালে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার বিজয়পুর উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করি। এরপর পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাঁধে করে ভার নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি শুরু করি। আইয়ুব খানের আমলে চায়ের দোকান দিই। মহাসড়কের লাগোয়া চায়ের দোকানে প্রতিদিন নানা ধরনের মানুষ আসত। এদের কেউ শিক্ষিত, কেউ বা অশিক্ষিত, আবার কেউ অর্ধশিক্ষিত।
আমি নিম্নমাধ্যমিকের (জুনিয়র) গণ্ডি পার না হলেও কথা বলতাম শুদ্ধ করে। কিন্তু গ্রামের লোকজন অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। শিক্ষিত তরুণদের নাম বিকৃত করে ডাকে। বিষয়টি আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। ইতিমধ্যে, অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ১৯৬৫ সালে নলুয়া চাঁদপুর গ্রামের আশুতোষ চন্দ্র সরকারের কাছ থেকে সাত হাজার টাকা দিয়ে ৫২ শতক জমি কিনি। স্বাধীনতার পর ওই জমি রেজিস্ট্রি হয়। একদিন মনে হলো জমিটা স্কুলের জন্য দিয়ে দিই, মানুষ আমাকে এ জন্য মনে রাখবে। ওই ভাবনা থেকেই ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি নলুয়া চাঁদপুর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ৫২ শতক জায়গা দান করি। জমি দানের খবর শুনে আমার স্ত্রী সকিনা আক্তার আমাকে ‘পাগল’ বলে। ১৯৯৯ সালের ৫ অক্টোবর ওই স্কুল দেখতে যায় সকিনা আক্তার। বিদ্যালয় দেখার পর বাড়ি ফেরার পথে সে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়।
এর পর থেকে একাই আছি। বিদ্যালয়ের পাশেই চায়ের দোকান। ওই দোকানেই ঘুমাই। দোকানে কিছু বিস্কুট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী রয়েছে। এগুলো বিক্রি করে যা পাই, তা দিয়ে দিন চলে যায়।
শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে অসহনীয় গরমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করতে হয়। মাত্র দুটি খাম্বা বসালেই বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। অথচ কেউ এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। আমি বিদ্যালয়ে দলাদলি পছন্দ করি না। অথচ আমার স্বপ্নের বিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে রয়েছে রাজনীতি। বিদ্যালয়ের সভাপতি উমেশ চন্দ্র দাস ইতালি চলে যাওয়ার পর কমিটি নিয়ে সমস্যা হয়। পরে পাঁচপাড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান সভাপতি হন। বিদ্যালয় চালাতে গেলে একজন উপযুক্ত সভাপতি দরকার। মোস্তাফিজ দলীয় লোক। এত কিছুর পরও প্রতিদিন দুই দফা বিদ্যালয়ে যাই। নিজে চা বানিয়ে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকদের বিনা পয়সায় খাওয়াই। আমার বয়স ৮২ হলেও নিজেকে এখনো ২৮ বছরের তরুণ মনে করি। প্রতিদিন চা বিক্রি করে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পাই। আমি একলা মানুষ, ওই টাকায় আমার হয়ে যায়। নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকাবস্থায় অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা যখন বিদায় নিত, তখন হাউমাউ করে কাঁদতাম। এখন উচ্চবিদ্যালয় হওয়ায় বেশ ভালো লাগছে। পাকা দালান আর বিদ্যুৎ পেলে বিদ্যালয়টি পূর্ণতা পেত।
আমার বিদ্যালয় গড়ার গল্পটা সবার আগে জেনেছে প্রথম আলো পত্রিকা। কুমিল্লা থেকে প্রতিনিধি পঠিয়ে প্রথম আলো আমার স্কুলের কথা পত্রিকায় তুলে ধরে। এরপর দেশ-বিদেশের কত লোক আমার খোঁজ নিলেন। মানুষের অতুল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। গত ২০ অক্টোবর কুমিল্লা-৮ (বরুড়া ও সদর দক্ষিণের একাংশ) আসনের সাংসদ নাছিমুল আলম চৌধুরী এমপি সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। তাঁকে বলেছি বিদ্যালয়টিকে পূর্ণতা দিতে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রথম সভাপতি ও ১৪ নম্বর লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) বর্তমান চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম মজুমদার, নলুয়া চাঁদপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সফিউল্যাহ, বিদ্যালয় এলাকার ইউপি সদস্য ও লক্ষ্মীপুর ইউপির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুর রশিদ, ভবানীপুরের বাসিন্দা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব নেসার আহমেদ, আমার ভাইয়ের ছেলে সিরাজুল হক ও আবদুর রহিম, উমেশ চন্দ্র দাশ, তাজুল ইসলাম, সুভাষ দাশ, কেরামত আলী, মোস্তফা মিয়া ও আলী হোসেন—এঁরাসহ গ্রামের প্রত্যেকের সম্মিলিত অনুদানে স্কুলঘরটি ওঠে।
এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছি। শরীরের চামড়া কুঁচকে গেছে। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটি। হাতে লাঠি থাকলেও হাঁটায় ক্ষিপ্রতা রয়েছে। আমার স্বপ্ন বিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফল দেখে যাওয়া। বিদ্যালয়ের সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলা। আমার মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকেও এ ধরনের কাজে অংশ নেওয়া উচিত। সবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে।
 অনুলিখিত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন