বিদেশিরা বাংলাদেশকে কমই জানে

ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল

ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল

ছবি: সাহাদাত পারভেজ

বিগত ১৪ বছরে প্রথম আলোর এগিয়ে যাওয়া আমি বেশ আগ্রহের সঙ্গে দেখে এসেছি। সম্পাদক থেকে শুরু করে সাংবাদিক, যাঁরা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন দারুণসব সংবাদ আমাদের পরিবেশন করে চলেছেন, তাঁদের সবাইকে আমার পক্ষ থেকে অভিনন্দন। সত্যিকার অর্থেই প্রথম আলো বাংলাদেশের অনেক মানুষের জীবনের জন্যই প্রথম আলো হয়ে আবির্ভাব হয়েছে। শুধু সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়েই নয়, বরং তার প্রতিদিনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও সেবার মাধ্যমে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে প্রথম আলো।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সেবায় প্রথম আলো যে মাসিক পরামর্শসেবার আয়োজন করে, আমি তার নিয়মিত সমর্থক এবং একজন সক্রিয় সহযোগী। মাদকাসক্ত-কষ্টে ভারাক্রান্ত মানুষগুলো, যারা লক্ষ্যহীন, সাহায্যহীন; তাদের অন্তর্গত চেতনাকে জাগিয়ে তুলে আলোকিত করার কাজটি করে প্রথম আলো।
বাংলাদেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে পথশিশুদের মাদকাসক্তি। কীভাবে মাদকের নেশা থেকে মুক্ত হবে, এই শিশুরা তা জানে না। বহু বছর ধরে প্রথম আলো ‘আপন’কে সাহায্য করছে পথশিশুদের মাদকমুক্ত সুন্দর জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আপনকে ঘিরে আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পথশিশু, নারী, পুরুষ—সব ধরনের মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সহায়তা করা। এমনকি ঠিকানাবিহীন মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্যও আমরা যথেষ্ট সময় দিই। ঢাকার কাছে সিঙ্গাইর উপজেলার আপনগাঁওয়ে মাদক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে বর্তমানে ২০০ জনের অধিক লোক বাস করছে।
আমাদের বর্তমান কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মিরপুর মাজারের কাছে ড্রপ ইন সেন্টার গড়ে তোলা। এটি গড়ে তোলা হয়েছে মূলত চার থেকে ১৪ বছর বয়সের মাদকাসক্ত তরুণ পথশিশুদের জন্য। এরা মাদক ব্যবহার করছে কিন্তু মাদকমুক্ত হওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাস্তা থেকে সরিয়ে তাদের এমন জায়গায় নিয়ে আসা, যেখানে তারা নিরাপদে থাকতে পারবে, প্রয়োজনীয় খাবার ও ওষুধ পাবে, খেলাধুলা ও বিশ্রামের সুযোগ পাবে। এই সেন্টারে যে শিশুরা রয়েছে, তাদের বলা হয় ‘আমাদের আপন’। আরও আর্থিক সহযোগিতা পেলে আমরা আমাদের এই ড্রপ ইন সেন্টারকে আরও প্রসারিত করব এবং মাদকাসক্ত শিশুদের রাত কাটানোর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করব।
বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বাইরে বেশ কিছু সম্মেলনে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। বেশির ভাগ মানুষই যখন বাংলাদেশের নাম শোনে, তখনই বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি দুর্যোগে ভারাক্রান্ত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের একটি দেশের কথা ভেবে নেয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা সাহসী বাংলাদেশির দুর্যোগ মোকাবিলার কথা জানে না। তারা জানে না এমন কঠিন সময়ে দুর্গত মানুষের সাহায্যে পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলোর কথা। বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে জানলেও বিশ্বের অনেক মানুষই এ দেশের মানুষ সম্পর্কে খুব কমই জানেন। তাই শুধু খারাপ দিকগুলো নয়, দেশ ও দেশের মানুষের ভালো দিকগুলো তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
দেশের কিছু কিছু জায়গার মানুষ স্কুলের শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায়নি, তবু জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান তাদের রয়েছে। এ দেশে এমন মানুষ রয়েছে, যারা তাদের উদ্ভাবনীশক্তিকে কাজে লাগাতে চায়, কঠিন পরিশ্রম করে বেঁচে থাকার জন্য উপার্জন করতে চায়, তবু ভিক্ষা করে বাঁচতে চায় না। রাস্তায় অনেক জায়গায়ই দেখা যায়, এক জায়গায় বসে ভিক্ষা করার চেয়ে একটা হাত বা একটা পা নিয়েই সে মানুষটি হয়তো কোনো জিনিস বিক্রি করছে। জীবিকার তাগিদে খুব ভোরে তাদের দিন শুরু হয়, গভীর রাত অবধিও তাদের কাজের যেন কোনো ছুটি মেলে না।
গ্রামীণ জীবনযাত্রায় পুরুষ-মহিলা উভয়েই বেশ কঠিন পরিশ্রমে অভ্যস্ত। জমি তৈরি করা, ফসল বোনা, জমির দিকে খেয়াল রাখা, আগাছা পরিষ্কার করা, ফসল সংগ্রহ করে সেখান থেকে চাল আলাদা করা—এসব কাজ ভীষণ দক্ষতার সঙ্গে তারা করে চলেছে, যদিও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো সামর্থ্য তাদের নেই। আমি যত দিন ধরে এখানে আছি, এর মধ্যে বেশ দারুণ কিছু পরিবর্তন আমার চোখে পড়েছে। যেমন আগের সেই পালতোলা নৌকার জায়গায় এখন এসেছে পাম্পচালিত নৌকা। আগে এ ধরনের পাম্প শুধু জমিতে সেচ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো, অথচ এখন নৌকায়ও ব্যবহার হচ্ছে। আগে যাকে মাঝি বলে ডাকা হতো, এখন তাকে বলা হয় চালক। গ্রামের স্থানীয় মানুষেরা তাদের সাধারণ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় নানা জিনিস তৈরি করে নিচ্ছে। অনেক জায়গায় মেশিন ব্যবহার করা হলেও এখনো বেশ কিছু জায়গায় লাঙল-গরু দিয়েই চাষাবাদ করা হয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সনাতন অনেক পদ্ধতি ও ধারণার পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। এর একটা উদাহরণ হলো, ১৯৮৮ সালে প্রথম যখন আমি মাদক পুনর্বাসন কর্মসূচি শুরু করি বাংলাদেশে, তখন যতজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তাদের সবার একই কথা—তারা নাকি এমন কাউকে পায়নি, যে মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে। তাই তারাও মনে করে, তাদের অবস্থা একই রকম হবে—মাদক নিতে নিতেই একসময় পরপারে যেতে হবে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ মাদকমুক্ত জীবন পাচ্ছে এবং জীবনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে নতুনভাবে বাঁচতে শিখছে।
শুধু ওষুধ নয়, এর পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ব্যবহার ও অভ্যাসগত পরিবর্তন আনাটা জরুরি।
অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন যে বাংলাদেশ আমার কেমন লাগে? অন্য অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেরও কিছু ভালো দিক এবং খারাপ দিক রয়েছে। একটা খুব ভালো দিক হলো—এ দেশের তরুণ প্রজন্ম। প্রথম আলো এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে নানাভাবে সহযোগিতা করে চলেছে। এখনকার তরুণেরাই অন্য সব তরুণকে মাদকমুক্ত করতে চেষ্টা করছে, জনসচেতনতা গড়ে তুলছে এবং ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ দেশ গড়ার কাজে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
 ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল: যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। শিশু মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের জন্য ১৯৮৮ সালে ঢাকায় তিনি কার্যক্রম শুরু করেন। এই প্রকল্পের কাজ এখনো অব্যাহত রয়েছে। ১৯৯৪ সালে তিনি ‘আপন’ নামে পুনর্বাসনকেন্দ্র গড়ে তোলেন। বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর এই উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ায় অদ্বিতীয় বলে গণ্য করা হয়। ব্রাদার রোনাল্ড ড্রাহোজাল বাংলা বোঝেন ও বাংলায় কথা বলেন।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন