একটি বিদ্যালয়। চারদিকে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। নোংরা শ্রেণীকক্ষ। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়বিমুখ। সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক একদিন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিলেন দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের পুরস্কার। কীভাবে ঘটল বিস্ময়কর এই কাণ্ড। তিনিই সেই তুলনাহীন ক্রিয়াকাণ্ডের নায়ক। তাঁর কাছ থেকেই জানা যাক

আমাদেরবিদ্যালয় আমাদের ভালোবাসা

বিজয় কুমার | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
শ্রেণীকক্ষে বিজয় কুমার

শ্রেণীকক্ষে বিজয় কুমার

ছবি: মজিবর রহমান খান

১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এমনটি ছিল না। বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা খুবই কম হাজির হতো। মাঠের চারদিক ছিল নোংরা-আবর্জনায় ভরা, সেই দুর্গন্ধে বিদ্যালয়ে টেকা যেত না। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দিতে গিয়ে স্কুলের পরিবেশ দেখে ভাবনায় পড়ে গেলাম। সে সময় মনে পড়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সন্দীপন পাঠশালা উপন্যাসের মূল চরিত্র সীতারাম পণ্ডিতের কথা। সীতারাম পণ্ডিত স্বপ্ন দেখতেন আলোকিত সমাজের। সেই চেতনা থেকে শত ঝড়-ঝঞ্ঝা, বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে একদিন প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন সন্দীপন পাঠশালা। যতই বাধা থাক, স্কুলটিকে পরিবর্তন করতে হবে—সেদিন প্রতিজ্ঞা করলাম। একদিন সকালে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঠে ডেকে বললাম, স্কুলটি কার? উত্তরে ছাত্রছাত্রীরা সমস্বরে চিৎকার করে বলল, ‘কেন, আমাদের’। তবে স্কুলের মাঠ এত নোংরা থাকবে কেন? উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজেই প্রস্তাব দিয়ে ফেললাম, ‘আজ আমরা স্কুলের মাঠের শুধু চার হাত জায়গা পরিষ্কার করব।’ এই বলে নিজেই মাঠ পরিষ্কার করা শুরু করে দিলাম। আমার সঙ্গে যোগ দিলেন শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী সবাই। সেদিনই বিদ্যালয়ের গোটা মাঠ পরিষ্কার হয়ে গেল। বিদ্যালয়টির পরিবর্তনে বিশ্বাস জন্মাল। সেই শুরু বিদ্যালয়ের বদলে যাওয়া।
এরপর এলাকার সুধীজনদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিদ্যালয়ের পড়ালেখার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সহযোগিতা চাইলাম। সবাই পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন। তাঁরা সবাই মিলে স্কুলের বিদ্যুৎ-সংযোগ দিলেন, নির্মাণ করে দিলেন আরও দুটি শ্রেণীকক্ষ। তবুও কেন যেন বিদ্যালয়ের প্রতি ছাত্রছাত্রীরা বিমুখ। ছাত্রছাত্রীদের এই বিমুখতার কারণ খুঁজতে গিয়ে শিক্ষকদের নিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীর বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করলাম। পাশাপাশি অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করলাম। সেই থেকে বিদ্যালয়ে শুরু হলো মা সমাবেশ। সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নিয়ে গঠন করলাম একটি সর্বজনীন কমিটি। স্কুল পরিচালনা পর্ষদের পাশাপাশি বিদ্যালয় উন্নয়নে একটি শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি গঠন করা হলো। সেই কমিটিগুলো স্কুলের উন্নয়নে একযোগে কাজ করে এবং সেই সঙ্গে লেখাপড়ার দেখভাল শুরু করে।
আকৃষ্ট করতে না পারলে শিশুরা বিদ্যালয়মুখী হয় না। এ কথা ভেবেই মন দিলাম বিদ্যালয়সজ্জায়। বিদ্যালয় ভবনের বারান্দায় সাজানো বিভিন্ন ফুলের টব। শ্রেণীকক্ষের নাম রাখা হয়েছে বিভিন্ন মনীষীর নামে। কক্ষের দেয়ালে দেয়ালে সেসব মনীষীর ছবি এঁকে দেওয়ার উদ্যোগ নিলাম। আমি বিশ্বাস করি, শিশুদের মনে দেশের প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে শিশুকাল থেকেই ওদের দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে হয়—এই চেতনা থেকে বিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে তুলে ধরা হলো মুক্তিযুদ্ধের সচিত্র ইতিহাস। বর্তমানে প্রাক্-প্রাথমিকসহ ছয়টি শ্রেণীর ১১টি শাখা রয়েছে। প্রতিটি শাখায় ৫০ জন ছাত্রছাত্রী, তাদের মধ্যে একজন ক্লাস ক্যাপ্টেন। ফুলের নাম নিয়ে প্রতিটি শাখায় রয়েছে ১০টি করে উপদল। মেধা অনুসারে আলাদা করা হয়েছে দলগুলো। দলগুলোর দলপতি শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা স্কুল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে। সে অনুযায়ী আমরা সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিই। তবুও বিদ্যালয়ের ফলাফলে এসব উদ্যোগ খুব একটা কাজে এল না। শুরু করলাম দুর্বল ছাত্রছাত্রীদের অতিরিক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা। নিয়োগ দেওয়া হলো অতিরিক্ত শিক্ষক। প্রত্যেক অভিভাবকের কাছ থেকে মাথাপিছু অতিরিক্ত দুই টাকা করে নিয়ে গড়ে তুললাম একটি কল্যাণ তহবিল। সেই তহবিল থেকে অসহায় ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ের নতুন পোশাক ও যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, সেসব শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে বই-খাতা ও কলম বিতরণ করা শুরু হলো। উপস্থিতি বাড়াতে পরীক্ষায় উপস্থিতির ওপর রাখা হলো বিশেষ নম্বর। পিছিয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য সব অভিভাবকের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে শুরু করলাম তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ।
বিদ্যালয়ের উন্নয়নে স্কুল পরিচালনা পরিষদের পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে কল্যাণ সমিতি ও শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি। কমিটিগুলো স্কুলের উন্নয়নে একযোগে কাজ করে ও সেই সঙ্গে লেখাপড়ার দেখভাল করতে লাগে। ছেলেমেয়ের শিক্ষার প্রতি মায়েদের সচেতন করতে নিয়মিত আয়োজন করা হলো মা সমাবেশ। সবার সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে নিশ্চিত হলো শিক্ষার পরিবেশ, বাড়ল ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির হার, সেই সঙ্গে পরিবর্তন হতে লাগল পরীক্ষার ফলাফল। সেই থেকে বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করছে। এভাবে মফস্বলের একটি পশ্চাৎপদ বিদ্যালয় দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ে রূপ নিল।
২০১০ সালের জানুয়ারি মাস। অফিসে কাজ করছি। ডাকপিয়ন এসে হাতে তুলে দিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিলমোহর দেওয়া একটি খাম। খামটি খুলেই চোখ হকচকিয়ে গেল। আমাদের স্কুল জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হয়েছে, এটা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষককে একটু মনোযোগ দিয়ে পড়তে বললাম। পড়েই তিনি চিৎকার করে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগলেন। আমাদের স্কুল জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে। খবরটি শুনে শিক্ষার্থীদের উল্লাস আর থামে না। পরে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা হাতে তুলে দিলেন শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতির সম্মাননা। সেই দিনটি আমার জীবনের সেরা দিন, সে দিনটির কথা আমি কখনো ভুলব না। এরপর ২০১১ সালে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী উপস্থিতি বিবেচনায় আবারও জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক পায় বিদ্যালয়টি। সে সময় শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার শতকরা ৯৮ দশমিক ২৫ ভাগ থাকলেও বর্তমানে বিদ্যালয়টির ছাত্রছাত্রীদের গড় উপস্থিতির হার প্রায় শতভাগ।
২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে প্রথম আলোর ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি এসে আমার সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে বিদ্যালয় সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য নেওয়ার পর বিভিন্ন শ্রেণীকক্ষ ঘুরে দেখে গেলেন। এরপর ১৭ ডিসেম্বরের সকাল। মুঠোফোনের শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। ফোনটি ধরতেই ভেসে এল পরিচিত এক কণ্ঠ। কণ্ঠস্বর বলল, তুমি তো খুব ভালো কাজ করছ। প্রথম আলোর পাতায় তোমাকে নিয়ে বিশাল প্রতিবেদন বেরিয়েছে। মফস্বল শহরে পত্রিকা হাতে পেতে অনেক সময় লাগে। স্কুলপত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে পারলাম না। সকালের নাশতা না সেরেই স্কুলে গিয়ে হাজির হলাম। এরপর ল্যাপটপটা খুলে ঢুকে পড়লাম প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে। ওয়েবসাইটটি ওপেন হতেই ‘মফস্বলে দেশসেরা বিদ্যালয়!’ শিরোনামে বেরিয়ে এল প্রতিবেদনটি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগলাম প্রতিবেদনটি। কিন্তু তৃপ্তি মিটল না। দ্বিতীয়বার পড়ে ফেললাম। তবুও তৃপ্তি না মেটায় তিন-চারবার হবে হয়তো, ঠিক মনে নেই কতবার যে পড়েছি প্রতিবেদনটি। প্রতিবেদনটি পড়ে আমি শিহরিত হয়েছি, আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছি। প্রতিবেদক তাঁর প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের অর্জন, ফলাফল, দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ, শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের শৃঙ্খলা, পাঠদানপদ্ধতি, ছাত্র উপস্থিতির পেছনের ঘটনা, অভিভাবক-জনগণের অংশীদারি সম্পর্ক সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন। চোখ পড়ে পাঠকদের মন্তব্যের দিকে, সেখানে ৬৯ জন পাঠক মন্তব্য করেছেন। পাঠক শাহানা পারভীন এই দেশটিকে যদি স্কুলটির মতো সাজানো যেত, তা হলে বেশ ভালো হতো বলে মন্তব্য করেছেন। আর দেশের প্রতিটি এলাকায় সবাই মিলে দেশের সব স্কুলে রানীশংকৈল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন আরেক পাঠক আবদুল মজিদ কাজি। প্রতিবেদনটি সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টাঙিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন রাহুল নামে এক পাঠক। আর নূর উল্লাহ নামে আরেক পাঠক তো মুঠোফোন নম্বর দিয়ে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছেন। আরও যাঁরা আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতি ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার নেই।
এর আগেও জাতীয় অনেক পত্রিকায় আমাদের বিদ্যালয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত করেছে, কিন্তু প্রথম আলোর প্রতিবেদনটির ধরন সারা দেশে সাড়া ফেলে দিয়েছে। কত যে অভিনন্দন, কত যে প্রশংসা আর ধন্যবাদ পেয়েছি, বলতে পারব না। যাঁদের অবদানে আমাদের এই অর্জন, তাঁদের অভিনন্দন জানিয়ে অনেকে চিঠিও দিয়েছেন। প্রথম আলো গোটা বিশ্বে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। একসময় অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আমরা দেশের ভালো স্কুলগুলোতে বেড়াতে যেতাম, এখন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ দলে দলে আমাদের স্কুলে বেড়াতে আসেন। একজন শিক্ষকের জীবনে এর থেকে বড় আর কী প্রাপ্তি হতে পারে?
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিদ্যালয়ের প্রতি এলাকার মানুষের বেড়ে গেছে অংশীদারি, সৃষ্টি হয়েছে মালিকানাবোধ। সেই বোধ থেকেই অনেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন বিদ্যালয় উন্নয়নে। নির্মাণ করে দিয়েছেন একটি পাকা পতাকা দণ্ড, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতিসৌধ ‘চিরঞ্জীব ’৭১’ ও অভিভাবকদের অপেক্ষার জন্য একটি কক্ষ। পাঠাগারে দিয়েছেন বিখ্যাত সব লেখকের গল্প, উপন্যাস, কবিতার বই ও নানা শিক্ষার উপকরণ।
নিজের ছেলেমেয়েকে যেভাবে আমরা ভালোবাসি, সেভাবে বিদ্যালয়ের সব ছেলেমেয়েকে ভালোবেসে ফেলেছি। সেই জায়গা থেকেই আমার শিক্ষাভাবনার শুরু। শিক্ষকতা একটি ধর্ম, একে জীবনে ধারণ করতে হয়। নিজের কাজটুকু সব সময় যত্ন দিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। ঘটাতে হয় নেশা ও পেশার সমন্বয়। পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ শুরু করলে তা একদিন সফল হবেই। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ হলে যেকোনো কাজ ভালো হয়ে যায়। সেই জায়গা থেকে আমরা সবাই একত্র হয়ে একটি ভালো কাজের সূচনা করেছি মাত্র, যা চালিয়ে যেতে চাই জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত।
 অনুলিখিত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন