তাঁর পেশা কৃষি, নেশা সুগন্ধি ধান সংগ্রহ। কৃষকের ঘর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অপূর্ব সব সুগন্ধি ধান। সেসব ধান চাষ করে তিনি দেখিয়েছেন এ ধানে কীভাবে ফলনও বাড়ে। বিষমুক্ত ধান চাষেও তাঁর ভূমিকা অগ্রণী। জানাচ্ছেন তাঁর এই নেশা-পেশার কথা
সুগন্ধি ধানের সন্ধানে
আবদুল বাছিত সেলিম: সুগন্ধি ধানের সান্নিধ্যে
ছবি: আনিস মাহমুদ
ধন থাকলেই ধনী। ধনী বলতে এখন অনেক কিছুই বোঝায়। কিন্তু কৃষক কিংবা গৃহস্থ পরিবারে ধনী বোঝাতে ঘরে কী পরিমাণ ধান মজুদ আছে, ধানের জাত কী, ফসলি জমির পরিমাণ কত, খেতের ধান খাওয়া-দাওয়ার পর বছর শেষে উদ্বৃত্ত থাকে কতটুকু—এসবই বোঝায়। অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ বোঝাতে ধানের খোঁজখবর নেওয়া অপরিহার্য। ধনীর সংজ্ঞা ধান দিয়ে নির্ধারণের গ্রামবাংলার আবহমান রীতি আমাকে ছোটবেলা থেকেই আলোড়িত করে। সমৃদ্ধির প্রতীক ধান। ধানে আছে ঘ্রাণ। সুঘ্রাণযুক্ত ধান আমাকে বিমোহিত করে। সুগন্ধি ধানের সন্ধানকাজের পেছনে আছে অন্য এক আকর্ষণ।
এ আকর্ষণ আমার প্রয়াত বাবা আবদুল হামিদের ছিল। প্রগতিশীল বাম রাজনীতির সংগঠক ছিলেন তিনি। বাবার সঙ্গে হাটে-মাঠে ঘোরা থেকে কৃষক ও কৃষিজীবীদের সান্নিধ্য আমাকে ধানের সংগ্রহের দিকে নিয়ে যায়। আমার বয়স যখন সাত-আট, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে আমার বাবা আবদুল হামিদের ঘনিষ্ঠতা দেখেছি। রাজনৈতিক ভাবাদর্শে জীবন কাটিয়েছেন বাবা। কৃষকদের অধিকার ও মেহনতি মানুষেরাই ছিলেন বাবার কাছে সবচেয়ে দামি। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কদমতলী গ্রামে কৃষকদের ডাক দেন মওলানা ভাসানী। বাবা ছিলেন ওই ডাকের একজন সংগঠক। গ্রামের কৃষকদের অধিকার-সচেতনতার সেই ডাক দেওয়ার আগে আরেকটি কৃষক সমাবেশ হয় কদমতলীর বর্তমান বাস টার্মিনালসংলগ্ন ভার্থখলা গ্রামে। তখন থেকে কৃষকদের জন্য আমার দরদ। ধন, ধান আর ধনী—এ তত্ত্ব বাবার কাছ থেকে শেখা।
ছোটবেলায় দেখেছি, বিচিত্র সব জাতের আর নানা নাম ও রঙের ধান। এসব ধানের ঘ্রাণ আর স্বাদও আলাদা। সুঘ্রাণ ও স্বাদ যেন কৃষির ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। কৃষিতে কাজের অনুপ্রেরণা আমার বাবার কাছ থেকে পেয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে আমি মাঠে কাজ শুরু করি। ১৯৯০ সালে নিজের নামের (আবদুল বাছিত সেলিম) প্রথম দুই অক্ষর নিয়ে একটি কৃষিপণ্যের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ি ‘এবি কৃষি প্রকল্প’। পরবর্তীকালে ‘বাছিত কৃষি প্রকল্প লিমিটেড’ করে কাজের প্রসার ঘটাই। আমার সুগন্ধি ধান উৎপাদন আর সন্ধানের পরিধি বেড়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো।
যেখানে পাই সেখানেই কৃষকদের উৎসাহ দিই। গ্রামে গ্রামে ঘুরে পুরোনো দিনের নানা জাতের ধান সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রবীণ কৃষকদের কাছ থেকে ধানের নাম ও ঐতিহ্য সম্পর্কে তথ্য নেওয়া শুরু করি। আমার পর্যবেক্ষণে ধানি জমির রং ছিল অগ্রহায়ণ মাসে লাল-কালো-সোনালি। আর বোরোতে ছিল টেফি, খইয়া, বড়হাইল, রাতা, দামান্দরমুখসহ নানা জাতের সুগন্ধি ধান। ধান কেটে বাড়ির উঠানে রাখলেই যেন ভাত রান্নার সুগন্ধ পাওয়া যেত। কৃষকদের মনের আনন্দ, ঘরে ঘরে ধান তোলার উৎসব—ধান কাটা শুরুর আগে থেকেই বোঝা যেত।
আমার খেত-মাঠ চষে বেড়ানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা কৃষিতে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে অনুপ্রাণিত করেছে। সেই সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে যখন সুগন্ধি ও ঐতিহ্যবাহী ধানের বিষয়ে জানতাম, তখন থেকেই ধানের নাম-স্বাদ-বৈশিষ্ট্য লিখে রাখতাম। এখন আমার সংগ্রহ ৭০টি জাতের সুগন্ধি ধান। সুগন্ধি ধানের খেত তৈরির ক্ষেত্রে আমি সাফল্য পাই ১৯৯৬ সালে। তখন কৃষকদের হাতে-কলমে আমি দেখিয়ে দিয়েছি যে সুগন্ধি ধানে ফলনমূল্য অনেক বেশি। সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় একজন কৃষককে দিয়ে কাটারিভোগের চাষ করাই প্রায় এক বিঘা জমিতে। ১৬ মণ ধান উৎপাদন হয়। ধান চাষে খরচ হয় মাত্র আড়াই হাজার টাকা। খেতের ওই ধান বিক্রি করে পাওয়া যায় ২২ হাজার টাকা।
৪১ জাতের সুগন্ধি ধান সংগ্রহ করার পর আমার সংগ্রহের নেশাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে প্রথম আলো। ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর প্রথম আলোয় আমার ধান সংগ্রহ নিয়ে শনিবারের বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ‘সেলিমের সুগন্ধি ধান’ শিরোনামে সচিত্র প্রতিবেদন পড়ে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক মানুষ আমাকে নতুনভাবে চিনলেন। আমার চেনা-জানা বন্ধু ও আত্মীয় মহলে আমার নতুন পরিচিতি হয়। তাঁরা বলেন, সুগন্ধি ধান দেখলেই নাকি মনে পড়ে আমাকে। এ প্রতিবেদন আমার জগৎকে প্রসারিত করে। পেছনের সব ক্লান্তি দূর করে আগামীর পথে চলার অনুপ্রেরণা দেয়। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমি একটি কাজ প্রতিবছরই করি। ‘বাছিত কৃষি প্রকল্প লিমিটিড’-এর উদ্যোগে বিষমুক্ত কৃষি আবাদ দেখাতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঠ পর্যায়ের একটি কর্মসূচি আমি ২০১০ সাল থেকে শুরু করেছি। প্রতিবছর শস্য কর্তন দিবসে কৃষি শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন প্রদর্শনী দেখাই, যাতে তাঁরা শিক্ষাজীবন শেষে বিষমুক্ত কৃষি আবাদের প্রচারক হন।
আমি গর্বের সঙ্গে সব সময় একটি কথাই বলি। তাহলো যেকোনো সৎ কর্মের ফল মানুষ জীবিত থাকতেও পাবে, মৃত্যুর পরও পাবে। প্রথম আলোর বিশেষত্ব বিশেষ প্রতিবেদনগুলো। আমি প্রতিটি প্রতিবেদন পড়ি ও সংগ্রহে রাখি, যা থেকে আমার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। বগুড়ায় জিরাশাইল ধানের বিশেষ প্রতিবেদন পড়ে সিলেটে তিন ফসলের আবাদ আমার উদ্যোগেই সম্পন্ন হয়েছে এবার। আগামী কার্তিক মাসেই একটি সুখবর সিলেটবাসীকে উপহার দিতে পারব। বাংলাদেশে প্রতিটি জেলায় আমার কাজে উৎসাহ প্রকাশ পেয়েছে। কৃষি পেশায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাপক উপকার হয়েছে। বাংলাদেশে কৃষিতথ্য সার্ভিসের ‘কৃষি ডায়েরি’তে ২০১২ সালে ১২ জন সেরা কৃষকের তালিকায় আমার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে প্রথম আলোর ওই বিশেষ প্রতিবেদনের কল্যাণে।
‘বাংলাদেশ ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে আমি কাজ করছি। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কৃষিকে নিয়েই। বাংলাদেশের কৃষক এখন মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে পরিচিতি লাভ করেছে। এর প্রধান উৎস সংবাদমাধ্যম। এ দেশের কৃষক কৃষির কলাকৌশল জানেন, তবে তাঁদের কৃষিনির্ভর করে তুলতে হবে। ভাত-কাপড়-শিক্ষা-স্বাস্থ্য—এসব নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। দেশে রপ্তানিজাত কৃষিপণ্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা এবং কৃষকদের নিয়ে কৃষিশিল্প গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। দেশের কৃষি, পোলট্রি, মৎস্য ও পশুপালন—এসব খাতকে সমান অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষকদের স্বয়ংসম্পূর্ণরূপে গড়ে তোলার সমন্বিত আন্দোলনে আমি থাকতে চাই। তাই পরিবেশ দূষণকারী যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে কৃষি থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছি।
অনুলিখিত
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






