তরুণদের হাতেই গুরুভার
চৌধুরী সাদিদ আলম: আই-জিনিয়াস গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর
ছবি: কবির হোসেন
তরুণেরাই মানবসভ্যতার আদিলগ্ন থেকে নবজীবনের গান শুনিয়ে এসেছেন। যেকোনো ক্রান্তিকালে তরুণেরাই বুক পেতে দিয়েছেন, এনেছেন নতুন দিন। আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশেও উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার এই শক্তিশালী তরুণ সমাজ।
আমাদের দেশ আজও উন্নয়নের কাতারে পশ্চাৎপদ। দেশের এই পরিস্থিতিতে তরুণ সমাজও তাই অবধারিতভাবে অনেকটাই সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত। শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের পশ্চাৎপদতার কারণেই হয়তো তরুণেরা অনেকাংশেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কিছুটা পিছিয়ে। কিন্তু তার পরও আমাদের যুবসমাজের আছে গর্ব করার মতো শক্তি।
দেশের উন্নয়নের জোয়ার আনতে প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার। আমার মনে হয়, অলিখিতভাবেই এই গুরুভার নিয়ে নিয়েছেন আমাদের তরুণেরা। ইন্টারনেটসহ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বক্ষেত্রেই তাঁদের অবিশ্বাস্য ইতিবাচক বিচরণ। বাংলার ছেলেমেয়েরা আর পিছিয়ে নেই। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মনোভাবই হয়তো বের করে এনেছে আমাদের প্রতিভা। বাংলাদেশেও আবিষ্কৃত ও তৈরি হচ্ছে অবিশ্বাস্য নানা প্রযুক্তিজাত পণ্য, যাতে মূলত রয়েছে তরুণদের অবদান।
তরুণ সমাজ অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে। মেধার অপূর্ব শক্তি যে আমাদেরও কম নেই, তার প্রমাণ আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান উৎসবে আমাদের ধারাবাহিক সাফল্য।
তথ্যপ্রযুক্তি ও মেধাই শেষ কথা নয়। প্রবল ইচ্ছাশক্তি ছাড়া দেশের উন্নয়ন-ভাবনা মুখ থুবড়ে পড়ে। দেশের তরুণেরা বারবার তাঁদের অফুরন্ত প্রাণশক্তির প্রমাণ দিয়েছেন। তরুণেরা আছেন বলেই বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে বন্ধুসভার কর্মকাণ্ড নিয়ে। প্রথম আলোর উদ্যোগে তৈরি করা বন্ধুসভা আজ স্থান করে নিয়েছে মানুষের হূদয়ে। দুর্যোগ-দুঃখ-দুর্দশা-জরা সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে এসেছেন তরুণেরা। মাদকবিরোধী ও সমাজ সচেতনতামূলক নানা অনুষ্ঠানে তাঁদের উপস্থিতিই মুখ্য। বন্ধুসভার মতোই তরুণদের আরও কিছু সংগঠন তৈরি হয়েছে। তারাও চেষ্টা করছে দেশের উন্নতির পথে অবদান রাখার। তাই দেশের তরুণদের কল্যাণেই আমরা আজও আশা করি সচেতন ও উন্নত বাংলাদেশের।
একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখি, সমাজ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে বারবার জাগরণের গান গেয়েছেন বাংলার সাহসী তরুণেরা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি আমরা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের রঞ্জিত রাজপথ তরুণ সমাজের দৃঢ়চেতা মনোভাবের সাক্ষী। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান আজও অবিনশ্বর। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আজও বাঙালির হূদয়ে জ্বালিয়ে দেয় অধিকারের নেশা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে আমাদের অরুণোদয়ের তরুণ দল। দেশের ক্রান্তিকালে ঠিক পথ বেছে নিতে কখনোই দ্বিধা করেননি তরুণেরা; বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দেশের অস্তিত্ব রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে গেছেন।
তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, সারা দেশ-জাতি গর্ব করতে পারে, বাংলার তরুণেরা থেমে থাকেননি। থেমে থাকবেন না। দেশের নানা প্রান্তে যে অনাচার-দুর্দশা, তার চিত্র দেশের উচ্চমহলকে নাড়া দিতে পারুক আর না-ই পারুক, নাড়া দেয় তরুণদের। তাই তো নিজের ঈদের খরচের টাকা বাঁচিয়ে সংঘবদ্ধ তরুণেরা নতুন কাপড় তুলে দেন দরিদ্র পথশিশুদের। ঈদের আগের রাতে নতুন কাপড় পেয়ে পথশিশুদের সেই হাসির তুলনা করার মতো আর কিছু কি পাওয়া যাবে? তরুণের কোমল হূদয় কঠিন হতে একবিন্দু সময় লাগে না, যখন তারা চোখের সামনে কোনো অন্যায় হতে দেখেন। তাই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে ওঠেন আমাদেরই দামাল ছেলেরা।
আমরা আশা করি উন্নত বাংলাদেশের; আশা করি দুর্নীতিহীন বাংলাদেশের; সোনার বাংলাদেশের। হয়তো সে পথ অনেকটাই বন্ধুর। কিন্তু বাংলার জাতীয় সংগীত শুনে তরুণের দেহে উষ্ণ রক্তের স্রোত বয়ে যায়, গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে এবং তাতেই বোঝা যায়, এই তরুণেরা কখনোই থেমে থাকবেন না। বর্ষার অঝোর বৃষ্টি, গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ, আর রাজনীতির আবর্জনা উপেক্ষা করেই আমরা এগিয়ে যাব। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ আর ১৯৯০-তে যেমন আমরা পেরেছি; তেমনি পারব এ দেশকে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড় করাতে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের পাশাপাশি সর্বক্ষেত্রের উন্নতির পথ ধরেই আমরা এগিয়ে যাব। দেশের সর্বস্তরের তরুণ সমাজের প্রতি আমার এই আহ্বান।
চৌধুরী সাদিদ আলম: আই-জিনিয়াস গ্র্যান্ডমাস্টার-২০১১
উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ-২০১২
গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজ
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






