১৭ হাজার নবজাতক শিশুর পরিচর্যা করেছেন এই মমতাময়ী নারী। ১৯৯১ সালে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝাড়ুদারের কাজে যোগ দেন। দেড় দশক ধরে গর্ভবতী নারীদের পরিচর্যা ও তাঁদের নবজাতক সন্তানদের দেখভালের কাজ করছেন। প্রায় ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে থাকেন। এই অতুলনীয় নারী বলেছেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা

ভালো মানুষের বড় দরকার

আছমা খাতুন | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
আছমা খাতুন: রোগীর শিয়রে

আছমা খাতুন: রোগীর শিয়রে

ছবি: সাইফুল হক মোল্লা

একদিন ভাবতাম লেখাপড়া করে বড় হব, দেশ ও দশের কাজ করব। কিন্তু অভাব-অনটনের সংসারে লেখাপড়া হয়নি। প্রাইমারি পাসের পর আমার পরিবার আর পড়াতে পারেনি। আমার বয়সীরা সবাই যখন বিদ্যালয়ে যেত আমারও ইচ্ছা করত যেতে। কিন্তু সামর্থ্য ছিল না। তবে ছোটবেলা থেকেই মানুষের হাসিমুখ দেখতে বড় ভালো লাগত। অভাবের কারণে ১৯৮৮ সালে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বরকা গ্রাম থেকে আমার বড় বোন জয়তুন আক্তারের কাছে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
বড় বোন জয়তুন ছিলেন কিশোরগঞ্জ হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। বোনের সঙ্গে থাকতে গিয়ে দেখলাম, গ্রাম থেকে কোনো রোগী হাসপাতালে এলে কতটা অসহায় বোধ করেন। কোনো নার্স বা হাসপাতালের কোনো স্টাফ পাশে দাঁড়ালে রোগী যেন ভরসা খুঁজে পান। বড় বোনকে দেখতাম, রোগী এলে চিকিৎসক না আসা পর্যন্ত তাঁর পাশে থাকতেন। রোগীর নানা সমস্যা জেনে নিয়ে তাঁকে সহযোগিতা করতেন। তখনই রোগী যেন অর্ধেক ভালো হয়ে যেত।
বোনের বাসায় আসার পর পরই ১৯৮৮ সালে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার রুপুখালী শোলাকিয়া গ্রামের সোহরাব উদ্দিনের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। তখন স্বামীর কোনো রোজগার ছিল না। জীবন যেন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, লেখাপড়া যতটুকুই আছে আল্লাহ তো হাত-পা দিয়েছেন। অন্তত রোগীদের সেবা তো করতে পারব। এই ভাবনা থেকেই হাসপাতালের কাজ আমাকে টানতে লাগল। স্বামীর সঙ্গে আলাপ করে ১৯৯১ সালে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝাড়ুদারের কাজ নিই।
নিজের নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে রোগীদের নানাভাবে সাহায্য করতে শুরু করি। খুব আনন্দ নিয়েই এসব কাজ করতাম। আমি বুঝতাম, পৃৃথিবীর কোনো কাজই ছোট না। মানুষ যত বড়ই হোক, সে যখন রোগী হয় তখন শিশুর মতো অসহায় হয়ে পড়ে। অসহায় মানুষকে সাহায্য করার আনন্দই আলাদা। আর গর্ভবতী নারীদের পরিচর্যা ও তাদের সন্তানদের প্রথম দেখভালের কাজ করছি দেড় দশক ধরে। নারী জীবনের পূর্ণতা আসে সন্তান জন্ম দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সুস্থ সন্তান প্রসবের পর আনন্দে আত্মহারা মায়ের আনন্দের অংশীদার হতে পেরে নিজেকে খুব গর্বিত মনে হয়।
জীবনের সেই শুরুর সময়ে ঝাড়ুদার হলেও রোগীদের প্রতি আমার আন্তরিকতার জন্য কিছুদিনের মধ্যেই কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে যাই। সিভিল সার্জন সবকিছু জেনে আমাকে জেলা হাসপাতালে বদলি করেন। এখানে রোগী বেশি, দায়িত্বও বেশি। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় মহিলা ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে রোগীদের সেবা-যত্ন সবই করতাম। গভীর রাতে কারও কোনো সমস্যা হলে ডাক পড়লেই বাসা থেকে ছুটে যেতাম রোগীর পাশে। কাজে কখনো ফাঁকি দিইনি। যত রাত হোক আছমাকে ঠিকই পাওয়া যেত। তাই হাসপাতালের সবাই ছড়া কেটে বলত, ডাক দিলেই যাকে দেখি/ সে তো মোদের আছমা ভাবী। এসব শুনতে শুনতে আমিও যেন আমার কাজের সঙ্গে আরও মিশে যেতে থাকি। আমার কোনো বিশ্রাম ছিল না। অনেক সময় নিজেই নিতাম না।
মজার বিষয় হলো, কিশোরগঞ্জের ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ১৯৯৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো গর্ভবতী মায়েদের জন্য অস্ত্রোপচার-ব্যবস্থা চালু হয়। আমিই ছিলাম ওই অস্ত্রোপচার টেবিলের প্রথম রোগী। ওই দিন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আমার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়। সার্জন মাহমুদ হাসান স্যার (বর্তমানে ঢাকা সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান সার্জন হিসেবে কর্মরত), অবেদনবিদ (অ্যানেসথেটিস্ট) নৌশাদ খান স্যার সেই অস্ত্রোপচার করেন। সুস্থ হওয়ার এক মাসের মধ্যেই আমি আবার ওই কক্ষেই কাজের সুযোগ পাই। আজ পর্যন্ত ওখানেই আছি। এ পর্যন্ত হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রায় ১৭ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে। জন্মের পর এসব শিশুর প্রথম পরিচর্যার কাজটি আমি করি। আমার মনে হয়, এর চেয়ে শান্তি আর কিছুতে নেই।
আমার মনে অনেক স্মৃতি জমে আছে প্রসূতি মা ও শিশুদের ঘিরে। তার মধ্যে একটা ২০০৯ সালের ঘটনা। ওই বছর মার্চ মাসের একদিন রাত দুইটার সময় মুমূর্ষু এক মা আসেন। তাঁর তখনই অস্ত্রোপচার লাগবে। সার্জন নেই, অবেদনবিদ নেই। যতক্ষণ তাঁরা না এলেন আমি রোগীকে সাহস জোগালাম। শশাংক স্যার ও নৌশাদ স্যার এলেন। তাঁদের সঙ্গে থেকে অস্ত্রোপচার কক্ষের যাবতীয় যন্ত্রপাতি, ট্রলি ও জরুরি ওষুধপাতি প্রস্তুত করে পরে অস্ত্রোপচার করে একটি ছেলেশিশুর জন্ম হয়। প্রায় মরে যাওয়া মা ও শিশু বেঁচে যায়। এমন ঘটনা জীবনে অসংখ্যবার ঘটেছে। মৃত্যু আর জীবনকে এভাবেই খুব কাছ থেকে দেখেছি।
দুঃখের স্মৃতিও কম নেই। ২০০৮ সালের ঘটনা। তারিখ মনে নেই। নান্দাইল উপজেলার কান্দিপুর গ্রামের মুসলিম উদ্দিনের স্ত্রী ফাতেমা বেগম মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি হলেন। মা ও শিশু দুজনেরই বাঁচার সম্ভাবনা নেই। কোনো রকমে অস্ত্রোপচার করে শিশুটিকে পৃথিবীতে আনা হয়। কিন্তু সন্তান জন্ম দিয়েই মারা যান প্রসূতি। বাচ্চাটিকে তিন দিন রেখে প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে পরে আত্মীয়দের কাছে দিই। ওই বাচ্চার প্রথম কান্নাটা হয়তো মা শুনে যেতে পেরেছিলেন। আহা, তারপর আর নাড়িছেঁড়া ধনকে বুকে নিতে পারেননি।
২০১০ সালে ‘যাঁর কোলে ১৫ হাজার শিশুর প্রথম কান্না’ প্রথম আলোয় শনিবারের বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগসহ সর্বত্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে হাসপাতালে অস্ত্রোপচার কক্ষে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সবার মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। অনেকেই অস্ত্রোপচার কক্ষে কাজ নিতে চান। কিন্তু সবাইকে কাজ করার জন্য নেওয়া কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তার পরও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ফুল বানু, মুন্নি হরিজন, ডলি রানী, খুরশেদা বেগম, সেবিকা ফরিদা ইয়াসমিন, শোভা আচার্য্য, ফরিদা পারভীন, কেয়া গোস্বামী কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষে কাজ নেন। সবার মধ্যে হাসপাতালে রোগীর সেবায় আত্মনিয়োগের স্বপ্ন। তাঁরাও পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এঁরা সবাই কর্তব্য খাতার তালিকা (ডিউটি রোস্টার) অনুযায়ী আট ঘণ্টা কাজ করেন। কিন্তু আমার জন্য কাজের কোনো সময় নেই। প্রথম আলোয় প্রতিবেদন ছাপার আগে এবং এখনো আমাকে ২৪ ঘণ্টা পাওয়া যায়। আমার জন্য কোনো ডিউটি রোস্টার নেই। হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টা প্রয়োজন হলে জরুরি অস্ত্রোপচার হয়ে থাকে। হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টাই চিকিৎসক, সেবিকা ও সাহায্যকারীসহ প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি থাকেন। তাই প্রতি মাসে গড়ে ৪০০ অস্ত্রোপচার হয়। বছরে চার হাজার ৮০০।
আজ হাসপাতালে মানুষের সেবাই আমার সংসারধর্ম। সৃষ্টিকর্তাও প্রতিদানে আমাকে কম দেননি। আজ আমার বড় মেয়ে আইরিন আক্তার কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে সম্মান শ্রেণীতে পড়ছে। ছোট মেয়ে নাসরিন আক্তার এসএসসি পরীক্ষা দেবে, ছেলে সাগর মিয়া অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। আমি পড়তে পারিনি। আমার সব সন্তান শিক্ষিত হচ্ছে। এর চেয়ে আর বেশি কী পাওয়ার আছে এক জীবনে।
হাসপাতালের বড় বড় স্যার যখন বলেন, আছমার মতো মানুষ আর নিবেদিত কর্মী থাকলে সারা দেশ বদলে যেত, তখন বুক ভরে যায়। নৌশাদ স্যার তো মাঝেমধ্যে বলেন, আমাকে আল্লাহ কী দিয়ে বানিয়েছে? আমি মানুষ, না জিন? সব জায়গায় আমি কীভাবে থাকি? কিন্তু আমার মনে হয়, আমি শুধু দায়িত্বই পালন করছি। নিজের কাজকে মন থেকে ভালোবাসি। যত দিন বাঁচব এভাবেই কাজ করে যাব। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জেলা বিএমএ একাধিকবার আমাকে পুরস্কৃতও করেছে।
নিজের জীবন আর কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি, দিন দিন আমাদের আন্তরিকতা কমে যাচ্ছে। সবাই যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি। সবাই এখন অর্থের পেছনে দৌড়াই। আগের চিকিৎসকেরা আগে রোগীকেই সুস্থ করতেন। পরে প্রাপ্য নিতেন। এখন টাকাই আগে। আমার মনে হয়, আজ বড় মানুষ না, ভালো মানুষের বড় দরকার।
 অনুলিখিত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন