যখন মাধ্যমিক পরীক্ষা দেন, তখন থেকেই গাছ লাগানোর নেশা। বয়স ৭৫। এখনো গাছ লাগান, গাছের পরিচর্যা করেন। এলাকার মানুষের প্রিয় ‘গাছদাদা’ বলছেন তাঁর বৃক্ষপ্রেমের বিস্তারিত
সবাই আমাকে ‘গাছদাদা’ ডাকে
আজিজুল হক: গাছের সঙ্গে বসবাস
ছবি: তুহিন আরন্য
১৯৬০ সালে আমি দশম শ্রেণীতে পড়ি। এসএসসি পরীক্ষার্থী। তখন একদিন পাঠ্যপুস্তকে পড়া একটি লাইন আমাকে ভাবিয়ে তোলে—‘ছায়া যে দান করে, আল্লাহপাক তাকে ছায়া দেন।’ এই কথাটি পড়ে আমি ভীষণ উদ্বুদ্ধ হই। ওই বছর ১ মার্চ রাস্তার পাশে প্রথম একটা পাকুড়গাছ লাগিয়ে বনায়ন শুরু করি। পাকুড়গাছ বছরে চার-পাঁচবার ফল দেয়। পাখিরা তা খায়। এই গাছ বড় হলে বিশাল আকৃতির হয়। ছায়া দেয়। রোদ-বৃষ্টিতে সেই গাছের নিচে মানুষজন আশ্রয় নেয়। তা ছাড়া গাছ অক্সিজেন দেয়। তাই গাছ লাগাই।
মেহেরপুরের বিস্তীর্ণ রাস্তা ও গ্রামে গাছ লাগানোর স্বীকৃতিস্বরূপ লোকজন আমাকে ‘গাছদাদা’ উপাধি দেয়। শিক্ষকতার বেতন ও নিজের ঝাড়ের বাঁশ দিয়ে ঝাঁপ বানিয়ে গ্রামে গ্রামে গাছ লাগিয়েছি। ১৯৯৭ সালে অবসরে যাই। এখন ৭৫ বছর বয়স। তবুও গাছ লাগানো বন্ধ করিনি। এসএসসি পরীক্ষার পর গাছ লাগানোর বিষয়টি আমার নেশায় পরিণত হয়। মাথায় চেপে বসে বনায়নের অর্থ সংগ্রহের চিন্তা।
১৯৬১ সালে শিক্ষকতা চাকরির পরীক্ষা দিয়ে পাস করি। শিক্ষকতা শুরু করি। তখন থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত পুরোদমে গাছ লাগিয়েছি। আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে ও মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কসহ গাংনী উপজেলার ২০-২৫ কিলোমিটার পথজুড়ে আমার লাগানো গাছ রয়েছে। তখন সকালে দু-তিনটি গাছ লাগিয়ে স্কুলে যেতাম। স্কুল শেষ করে বিকেল পর্যন্ত সাইকেলে চড়ে আবার গাছ লাগানো ও গাছের পরিচর্যা করে বেড়াতাম। গ্রামের এমন কোনো বাড়ি নেই, যেখানে আমার লাগানো গাছ নেই। তা ছাড়া শিক্ষকতার কারণে যে স্কুলেই বদলি হয়েছি, সেই স্কুলের সীমানাজুড়ে শত শত গাছ লাগিয়েছি। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান ঘোষণা দেন, রাস্তার পাশে যে বনায়ন করবে, সে ওই গাছের মালিক হবে। এতে দ্বিতীয়বার উদ্বুদ্ধ হই আমি। রাস্তার দুই পাশে ১০ ফুট দূরত্বে ফলদ ও ঔষধি গাছ ব্যাপকহারে লাগানো শুরু করি। সেই গাছই এখন বড় হয়ে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের দুই পাশে ছায়া দিচ্ছে এবং সুশোভিত করে রেখেছে। এ ক্ষেত্রে কাঁঠালগাছ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। কেননা, কাঁঠাল পুষ্টিকর ও জাতীয় ফল। কাঁঠালের কোনো কিছুই ফেলা যায় না। গাছ ফল দেওয়া শুরু করলে তা আশপাশের মানুষজন খায়। লোকজন আমার লাগানো গাছের ফল খায়। ছায়ায় আশ্রয় নেয়। অক্সিজেন নেয়, যা দেখে খুবই আনন্দ পাই।
এখন আমাকে সবাই ‘গাছদাদা’ বলে ডাকে। আমাকে নিয়ে প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এই প্রতিবেদন দেখে দেশি-বিদেশি টিভি চ্যানেল আমার সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রচার করেছে। এখন অনেকেই আমাকে দেখতে আসে। বলে, ‘আপনিই সেই গাছদাদা?’ এই প্রশান্তিতে আজ ৭৫ বছর বয়সে নীরোগ দেহ নিয়ে হেঁটে বেড়াই। এখনো খাওয়া স্বাভাবিক, খালি চোখে দেখি। আর গাছ লাগানোর কাজটি অব্যাহত রেখেছি।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সাহারবাটি ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া গ্রামে বাড়ি হলেও আশপাশের তিন-চারটি গ্রামজুড়ে আমার লাগানো হাজার হাজার গাছ আছে। এখনো আমি নিড়ানি, কোদাল, মাথাল নিয়ে গাছের জন্য ছুটে বেড়াই। আমার ছেলেমেয়েরা সবাই স্বাবলম্বী। তারা নিষেধ করে কাজ করতে। কিন্তু দীর্ঘদিনের নেশা আমার পিছু ছাড়েনি। ১৯৬১ সালে এক টাকা পারিশ্রমিকে শ্রমিক নিয়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ করেছি। এখন সেই শ্রমিকের হাজিরা ২২০ টাকা। তখন প্রতি ছয় ফুট লম্বা আম ও কাঁঠালের চারার দাম ছিল পাঁচ পয়সা। এখন সেই চারার দাম ২৫০ টাকা। আমার শিক্ষকতার প্রথম বেতন ছিল ৩৫ টাকা। আইয়ুব আমলে বেতন ১০ টাকা বাড়ে। তখন আমার গাছ লাগানোও বেড়ে যায়। নিজের গ্রাম ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী ধানখোলা, চিৎলা, বাগুন্দা, সাহারবাটি, খোকসা, মদনাডাঙ্গা গ্রামজুড়ে গাছ লাগাই। গরু-ছাগল যেন গাছ মুড়িয়ে না খেতে পারে, সে জন্য গ্রামের এ মুলুক থেকে ওই মুলুক ঘুরে বেরিয়েছি।
এখন চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। উপার্জন নেই। তাই বলে সন্তানদের দ্বারস্থ হই না। পেনশনের টাকা দিয়ে এখনো গাছ লাগাই। তবে সাইকেল চালিয়ে আর গাছের পরিচর্যা করা সম্ভব হয় না। আগে প্রতিদিন ১০-১২টা গাছ লাগিয়েছি। এখন অন্তত প্রতিদিন একটা গাছ লাগাই। কেননা গাছ না থাকলে পরিবেশ, জীবজন্তু কিছুই থাকবে না।
আমার কিছু কষ্ট আছে। মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের যেসব জায়গায় আমার লাগানো গাছ আছে, সেসব জায়গার মালিক ছিল মেহেরপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগ। তারা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ২০০৩ সালের ১৮ আগস্ট মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের বিভিন্ন স্থানের প্রায় ২৪ কিলোমিটার পথের দুই পাশের কয়েক শ ফলদ গাছের ফলভোগের ক্ষমতা দেয় আমাকে। এতে সেই ফল গ্রামের অভাবী মানুষেরা ইচ্ছেমতো খওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। খুশি হয়ে তখন গ্রামবাসীও আমার সঙ্গে গাছের পরিচর্যা করত। এখন মেহেরপুর জেলা পরিষদ সেই রাস্তার মালিক হওয়ায় তারা গাছেরও মালিক হয়ে গেছে। গাছের ফল গ্রামবাসী আর পায় না। ফলে, রাস্তার পাশের লোকজন গাছের পরিচর্যা ও দেখভালের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। পরিচর্যার অভাবে অনেক গাছ মরে যাচ্ছে। তাই গ্রামের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে আমি আবার পুরোনো সেই রীতি চালুর দাবি জানাচ্ছি।
আমি নিজেকে একজন সফল পরিবেশকর্মী ও পিতা বলে দাবি করি। আমার পাঁচ ছেলে, তিন মেয়ে। এক মেয়ে ছাড়া সবাই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছে।
প্রথম লাগানো গাছটি এখন বিশাল আকৃতির। বাড়ির পাশেই এই গাছের নিচে মাচা বানিয়েছি। খাওয়া ও গোসলের সময় ছাড়া সারা দিন সেই গাছের নিচে মাচায় বসে সময় কাটাই। নিজের লাগানো গাছে, পাতায় হাত দিয়ে তৃপ্তি মেটাই। মাচায় এলাকার যুবক ও ছাত্রদের ডেকে নিই। নিজের জীবনের গাছ লাগানোর গল্প তাদের শোনাই। গাছ লাগিয়ে পরিবেশ রক্ষার তাগিদ দিই। কথা বলতে বলতে দুপুর হয়ে গেলে মাচাতেই ঘুমিয়ে পড়ি। এই মাচাতেই ঘুমন্ত অবস্থায় মরতে চাই। কেউ গাছ কাটলে, সেখানে ছুটে যাই। পরামর্শ দিই একটা গাছ কাটার আগে দুইটা গাছ লাগানোর। এভাবে পরিবেশ রক্ষায় কাজ করছি।
অনুলিখিত







রাশেদ সরকার
২০১২.১১.২৪ ২০:০৮