অজগ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছাত্র। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান। কিন্তু গ্রামের পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের জন্য তাঁর মন কাঁঁদে। উঠানে, আঙিনায় চট বিছিয়ে শুরু করেন দরিদ্র শিশুদের পাঠদান। ক্রমে গ্রামের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একদল তরুণ যুক্ত হন তাঁর সঙ্গে। গড়ে তোলেন ‘গরিব শিক্ষার্থীদের বন্ধু পাঠশালা’। এখন দেশ-বিদেশের মানুষ আসেন তাঁদের পাঠশালা দেখতে। সেই স্বপ্ন, সংকট আর সংগ্রামের কথা জানাচ্ছেন তিনি
তারুণ্যের শক্তি বদলে দেবে দেশ
মো. আবু রায়হান: শিক্ষার্থীদের মধ্যে
ছবি: সোয়েল রানা
নানা দিক থেকে পিছিয়ে পড়া একটি নিভৃত পল্লির অজপাড়াগ্রাম। সেই গ্রামের হতদরিদ্র একটি পরিবারে জন্ম রাশেদুলের। বাবা দিনমজুর। ছোটবেলা থেকে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পড়ালেখা করছিল ছেলেটি। অসম্ভব রকমের মেধাবী ছাত্র সে। ক্লাসে কখনো দ্বিতীয় হয়নি। অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার পর রাশেদুল পড়ালেখা বাদ দিয়ে সংসারের হাল ধরতে ভ্যান চালানোর পেশা বেছে নেয়।
২০০৫ সালের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদের ছুটি। ঢাকা থেকে বাসে চড়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। ঢাকা-জয়পুরহাট মহাসড়কের পুনট বাসস্ট্যান্ডে নামলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার জন্য একটি ভ্যান খুঁজছিলাম। কিন্তু কাঁচা রাস্তা বলে শিকটা গ্রামে যাওয়ার জন্য কেউ রাজি হচ্ছিল না। এ সময় কিশোর এক ভ্যানচালক নিজে থেকেই আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এল। খুব আস্তে করে বলল, ‘ভাই, ভ্যানে ওঠেন, আমি যাব।’ এবড়োখেবড়ো মেঠোপথ। ভ্যান চালাতে ছেলেটির খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমি কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এ বয়সে ভ্যান চালাচ্ছ কেন? বাড়িতে তোমার কে কে আছে? বাড়ি কোথায় তোমার?’ ছেলেটি তখন শুকনো গলায় উত্তর দিল, ‘ভাই, আমি রাশেদুল, আপনার গ্রামের ছেলে। আপনার কাছে অঙ্ক কষতে যেতাম, মনে পড়ে?’
আমি চিনতে পারি ওকে। পাল্টা প্রশ্ন করি, ‘তুমি পড়ালেখা করতে না? বাদ দিয়েছ! ভ্যান চালাচ্ছ কেন?’ রাশেদুল উত্তর দেয়, ‘বাবা রিকশা চালাতে ঢাকায় গেছে। সংসারে ভাত জোটে না। তাই পড়ালেখা বাদ দিয়ে বাবার ভ্যান চালাচ্ছি।’ রাশেদুলের কথাটা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেধাবী একটা ছাত্রের শিক্ষাজীবন এভাবে ঝরে গেল! ঈদের ছুটিতে গ্রামের বন্ধু-সহপাঠীরা সবাই এসেছে। ২০ জনের একটা দল। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে পড়ি। ইকবাল বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে সম্মান শ্রেণীর ছাত্র। কাছাকাছি থাকে বলে গ্রামের সব খবরাখবর ওর নখদর্পণে। ইকবাল জানায়, ওপাড়ার শেফালীকে (ছদ্মনাম) জোর করে বিয়ে দিয়েছে ওর মা-বাবা। চমকে উঠলাম। শেফালী সবে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ছে। অসম্ভব রকমের মেধাবী ছাত্রী সে। পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তিও পেয়েছে। আমার কাছে একসময় ইংরেজি পড়া বুঝে নিতে আসত। বাবা-মা অশিক্ষিত হলেও তাদের সংসার সচ্ছল ছিল। বাল্যবিবাহের কারণে শেফালীর মতো একটা মেধাবী ছাত্রীর শিক্ষাজীবন ঝরে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। দুই রাত ঘুমোতে পারলাম না। শৈশব থেকে আমি নিজেও দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে পড়ালেখা চালিয়েছি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছি।
গ্রামের মেধাবী ছেলেমেয়েদের এভাবে একের পর এক শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার বিষয়টি সহজে মেনে নিতে পারলাম না। কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করলাম। এক সকালে রাশেদুলের বাড়ি গেলাম। ওর মাকে অনেক বুঝিয়ে রাশেদুলকে নতুন করে পড়ালেখা করাতে রাজি করালাম। ওর মায়ের হাতে কিছু টাকাও দিলাম। পরদিন থেকে রাশেদুল আবার বইখাতা হাতে ক্লাসে যেতে শুরু করল। রাশেদুলের মতো হতদরিদ্র পরিবারের আরও ২০ জন শিক্ষার্থী গ্রাম ঘুরে খুঁজে বের করলাম। বাড়ির ওঠানে বিছানা-চট বিছিয়ে প্রতিদিন সকালে দুই ঘণ্টা করে পড়ানো শুরু করলাম। এভাবেই শুরু হলো গরিব শিক্ষার্থীদের বন্ধু পাঠশালার পথচলা। এ উদ্যোগে সাড়া দিল গ্রামের সহপাঠী-বন্ধুরাও।
একঝাঁক টগবগে তরুণ শিক্ষার্থী তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নেমে পড়লাম শিক্ষার আলোয় আলোকিত গ্রাম গড়ার আন্দোলনে। এ উদ্যোগে সাড়া দিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম, মাসুদ হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহমুদুল হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিকুল ইসলাম ও রবিউল ইসলাম, বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের ইকবাল হোসাইন, মঈনুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম, সুজাউল ইসলাম, মোকাদ্দেস হোসেন, খলিলুর রহমান, শহীদুল ইসলাম, জয়পুরহাট সরকারি কলেজের আফসানা আফরিন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল কাইয়ুম, এরশাদুল (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়), স্থানীয় কলেজে পড়ুয়া মেহেদী হাসান, রুমি, সুমি এবং শিক্ষিকা তাহেরা খাতুন। সবাই পালা করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াতে শুরু করলাম।
এরপর তারুণ্যের শক্তিতে এগিয়ে গেছি আমরা। দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে ‘গরিব শিক্ষার্থীদের বন্ধু পাঠশালা’র পরিধি বেড়েছে। ২০ থেকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা একসময় দেড় শ ছাড়িয়েছে। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বই, খাতা, কলম বিতরণ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ালেখার প্রতিযোগিতা এবং জ্ঞান অর্জনে আগ্রহ বাড়াতে এককালীন ও মাসিক বৃত্তি প্রদান, বছর শেষে পুরস্কার চালু করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ জাতীয় সংগীতচর্চা কার্যক্রম, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলার আসর, শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করতে অভিভাবক মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে চলছে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন, মাদক সেবন, ফতোয়ার মতো সামাজিক অনাচার নির্মূলে গণসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান কার্যক্রম।
নিজেদের দেওয়া টাকায় বিদ্যালয়ের খরচ চলছে। মাঝেমধ্যে ফসল ঘরে উঠলে সবাই দলবেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিদ্যালয়ের খরচ চালানোর জন্য ধান-চাল চেয়ে নিচ্ছি। গ্রামের উঠান, খুলি, আঙিনা, ফাঁকা জায়গায় চট বিছিয়ে চলছে পাঠশালার শিশুদের পাঠদান কার্যক্রম। বেড়েই চলেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অথচ বিদ্যালয়ের নিজস্ব জায়গা ও স্থায়ী ঘর নেই। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম আমরা বন্ধ হতে দিইনি।
২০০৯ সালের ৪ জুলাই প্রথম আলোয় ‘গরিব শিক্ষার্থীদের বন্ধু পাঠশালা’ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হলো। চারদিকে হইচই পড়ে গেল। রাতারাতি আমরা নায়ক বনে গেলাম। মুঠোফোনে কয়েক দিন ধরে কয়েক শ পাঠকের ফোন এল। অনেকেই দেশ-বিদেশের নামীদামি ব্যক্তি। সবাই ফোন করে আমাদের এমন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। কেউ ধন্যবাদ জানালেন। অনেকে ধন্যবাদপত্র পাঠালেন। দেশ-বিদেশের অনেকেই এলেন বিদ্যালয়ের কার্যক্রম দেখতে। কেউ কেউ আর্থিক সাহায্য করারও প্রতিশ্রুতি দিলেন। সে এক অন্য রকম অনুভূতি। তবে আমাদের ইচ্ছে ছিল, কারও সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে নয়, নিজেদের উদ্যোগে বিদ্যালয়টিকে দাঁড় করাব।
একটি বিশেষ ঘটনার কথা খুব মনে পড়ছে। প্রথম আলোয় প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর অনেক পাঠকের ফোন পেয়ে আমরা প্রচণ্ড উচ্ছ্বসিত। পাঠকদের প্রশংসিত উচ্ছ্বাস পাঠশালাকে দাঁড় করানোর প্রেরণা জোগাল। নতুন উদ্যমে সাহস আর মনোবল নিয়ে আমরা নিজেদের উদ্যোগে পাঠশালার জন্য জমি কেনা এবং ঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলাম। এরই মধ্যে ঢাকা থেকে একজন নারী পাঠক আমাদের ডেকে পাঠালেন। আমি আর ইকবাল গেলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি আমাদের হাত ছুঁয়ে দিলেন। বললেন, ‘দেশে কত তরুণ বিপথে যাচ্ছে, কেউ নেশার পথে পা বাড়াচ্ছে, কেউ অস্ত্র হাতে সন্ত্রাস করছে। আর তোমরা অজ পাড়াগাঁয়ে থেকে আলোকিত দেশ গড়ার আন্দোলন করছ, তোমাদের এ সোনার হাত ছুঁয়ে দেখার খুব ইচ্ছে করছিল, এ জন্য ডেকেছি তোমাদের।’ সেদিন আমরা বাক্রুদ্ধ হয়েছিলাম। আবেগে-খুশিতে চোখে পানি এসেছিল। গর্বে বুকটা উঁচু হয়েছিল সেদিন।
পাঠশালাকে ঘিরে আরেকটি স্মৃতি কখনো ভোলার নয়। প্রথম আলোয় প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর পাঠশালা দেখতে অনেকেই জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার শিকটা গ্রামে ছুটে এলেন। অনেকেই আমাদের অভিভাবকদের সঙ্গে দেখা করে ছেলেমেয়েদের এমন উদ্যোগের জন্য প্রশংসা করলেন। এই প্রশংসায় আমার মায়ের বুকটা গর্বে ভরে গেল। আমাদের পাঠশালার একটা ঘর তোলার জন্য তিনি বাবার কাছে চার শতক জমির আবদার করলেন। বাবা হতদরিদ্র কৃষক। সামান্য জমিজমা চাষাবাদ করে সংসার চলে। চার শতক জমি তাঁর কাছে অনেক কিছু। কিন্তু তিনি ‘না’ করলেন না। তিনি খুশি হয়েই পাঠশালার নামে চার শতক জমি লিখে দিলেন। অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা ফিরিয়ে দিলেও মা-বাবার এ দান ফিরিয়ে দিতে পারিনি। কিছুদিন পরেই মা দিলজন বিবি মারা গেলেন। তিনি তাঁর দান করা জমিতে পাঠশালার ঘর দেখে যেতে পারলেন না। অর্থাভাবে আমরা এখনো পাঠশালার ঘর তুলতে পারিনি। তা ছাড়া চার শতক জায়গায় পাঠশালার ঘরও হবে না, আরও জায়গা দরকার।
ভাবতে ভালো লাগে, এ পাঠশালার অনেক শিক্ষার্থীই এখন নামকরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। প্রতিবছরই জেএসসি ও এসএসসিতে শিক্ষার্থীরা তাক লাগানো ফল করছে। এভাবে এগিয়ে চলেছে তারুণ্যের শক্তির জয়জয়কার দিয়ে গড়ে তোলা ‘গরিব শিক্ষার্থীদের বন্ধু পাঠশালা’। আমরা বিশ্বাস করি, তারুণ্যের দুর্বার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এভাবে এগিয়ে গেলে সব অসাধ্যকেও জয় করা সম্ভব।
আমরা স্বপ্ন দেখি, তারুণ্যের শক্তি দিয়ে আলোকিত সমাজ গড়ে তোলার এমন উদ্যোগে অন্যরাও এগিয়ে এলে এ দেশটা আলোকিত হবেই একদিন।
অনুলিখিত
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






