জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। অসামান্য মনের জোরে সব বাধা তুচ্ছ করে স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেছেন। গ্রামের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নিয়ে গাছতলাতেই শুরু করেন পাঠশালা। প্রথম আলোয় তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হলে নানাজন সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন তাঁর পাঠশালার জন্য। তিনিই বলেছেন সেসব কথা
আমার জীবন আমার পাঠশালা
নিজের বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন সুবীর বিশ্বাস
ছবি: দিলীপ কুমার সাহা
আমাদের বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার অবদা গ্রামে। বাবার নাম বারীন্দ্র বিশ্বাস। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে আমি চতুর্থ। আমার বয়স তখন পাঁচ-সাত বছর। পাড়ার সমবয়সী সব ছেলেমেয়ে বিদ্যালয়ে যেত। বাড়িতে থাকতাম শুধু আমি। খেলার কোনো সঙ্গী ছিল না। খুব ইচ্ছা করত অন্যদের মতো বিদ্যালয়ে যেতে। কিন্তু আমি যে জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। মাঝে মাঝে মনে হতো পৃথিবীতে এসে আলো-বাতাস সবকিছু আমার কাছে বৃথা। অনেক সময় মনে হয়েছে, আমার জীবনটাও বৃথা, আমাকে দিয়ে দেশের বা সমাজের কোনো কাজ হবে না। বরং আমাকে সমাজ ও সংসারের বোঝা হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। এর পরও একসময় মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, বেঁচে থাকতে হলে আমাকে লেখাপড়া শিখতে হবে। কিন্তু আমি তো হাতে কলমই ধরতে পারতাম না। পারি না ভালোভাবে হাঁটতে। তবু দরিদ্র বাবা-মাকে বলি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে।
একদিন আমার বড় বোন সাবিত্রী আমাকে কলম ধরতে শেখান। আমার হাতের ওপর হাত ধরে অ, আ, ই, ঈ শেখান। কয়েক দিন পর তিনি আমাকে অবদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করতে নিয়ে যান। শিক্ষকেরা বলেন, আমি নাকি কলম ধরে লিখতে পারব না। আমি তাঁদের সামনেই কলম ধরে অ, আ, ই, ঈ লিখি। তারপর তাঁরা আমাকে ভর্তি করেন। আমাকে খুব আদর করতেন শিক্ষকেরা। পাড়ার ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় আমাকে নিয়ে যায়। তারাও আমাকে খুব ভালোবাসত। খুব কষ্ট করে স্কুলে যেতাম। এভাবে পঞ্চম শ্রেণী পাস করি।
এরপর কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় গুরুই ইউনিয়নের শিবিরপাড়া গ্রামে মামা সাধন বিশ্বাসের বাড়িতে আসি। মামা আমাকে হিলচিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দেন।
হিলচিয়া উচ্চবিদ্যালয়: আমার মামার বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূর। তবু আমি ভর্তি হই। কারণ যতই কষ্ট হোক না কেন আমাকে যে পড়াশোনা করতেই হবে। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী সবাই আমাকে খুব পছন্দ করত। তবে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করতে কষ্ট হতো খুব। পা ফেটে রক্ত বের হতো, কারণ কোনো জুতা পরতে পারতাম না। হাতে ছাতাও নিতে পারতাম না। মাঝেমধ্যে মনে হতো আমার জীবনে এত কষ্ট কেন! বাড়িতে এসে কান্নাকাটি করতাম। ভাবতাম কষ্ট করলে তো আমারই ভালো হবে। এই ভেবে মাঝেমধ্যে বিদ্যালয়ে যেতাম। আমার কষ্ট বুঝতে পারতেন শিক্ষকেরা। তাই শত কষ্টের মধ্যেও হাল ছাড়িনি। এভাবে এসএসসি পাস করি।
এরপর বাজিতপুর ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হই। কলেজ ছিল মামার বাড়ি থেকে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার দূরে। প্রথমে হাঁটতাম এক কিলোমিটার। এরপর রিকশায় করে পাঁচ কিলোমিটার, বাসে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। বাকি রাস্তা যেতাম হেঁটে। আমাকে সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বের হতে হতো। আসতে হতো প্রায় সন্ধ্যায়। তখন শরীর খুব ক্লান্ত হয়ে যেত, পড়ার শক্তি থাকত না। কিন্তু কলেজের শিক্ষকেরা আমাকে অনেক উৎসাহ দিতেন। সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করেন। তাঁদের ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না। এ বছর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছি।
আমি তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। একদিন বিকেলে মামার বাড়ির সামনের গাছতলায় বসে বই পড়ছি, দেখি একটি ছেলে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি যাচ্ছে। কারণ জানতে চাইলে ছেলেটি জানায়, সে পরীক্ষায় ফেল করেছে। শুনে খুব খারাপ লাগল। কারণ তাকে পড়ানোর মতো কেউ ছিল না। প্রাইভেট পড়ারও সামর্থ্য ছিল না। ভাবলাম বিকেলে অবসর থাকি। তখন তার মতো শিশুদের যত্ন নিয়ে পড়াব। ঠিক পরের দিন থেকে বাড়ির গাছতলায় কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে পড়ানো শুরু করি। বর্তমানে আমার পাঠশালায় প্রায় ৬০ জন ছাত্রছাত্রী। তাদের কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নিই না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল তাদের পড়ানোর মতো কোনো ঘর নেই। বৃষ্টি এলে পড়াতে পারি না। মাঝেমধ্যে তাদের চকলেট দিই। সব ছাত্রছাত্রী আমাকে খুব ভালোবাসে।
একদিন বিকেলে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর সময় প্রথম আলোর প্রতিবেদক (দিলীপ সাহা) আমার গাছতলায় উপস্থিত। আমার গাছতলার পাঠশালা নিয়ে প্রতিবেদন লিখবেন বলে জানালেন। এই বলে পাঠশালার কয়েকটি ছবি তুললেন। প্রতিবেদনটি প্রথম আলোতে ছাপানোর পর অনেক লোক আমার মোবাইলে কল করেন। অনেকে আসেন পাঠশালা দেখতে। অনেকে সাহায্য-সহযোগিতা করেন। অনেকে প্রতিশ্রুতি দেন।
গত ২৮ এপ্রিল প্রথম আলোয় আমাকে নিয়ে ‘স্যালুট সুবীর তোমায়’ প্রতিবেদনটি ছাপার পর দেশ-বিদেশ থেকে অনেক লোক আমার কাছে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে খোঁজখবর নেন। অনেকে স্কুল করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এর মধ্যে প্রথম আলোর নিকলী প্রতিনিধির পরামর্শে নিকলী সোনালী ব্যাংক শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। বর্তমানে অ্যাকাউন্টে ১৪ হাজার টাকা জমা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারিভাবে দুই টন চাল দেওয়া হয়েছে।
সবকিছুর জন্য প্রথম আলোর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। আমাকে তো কেউই তেমন চিনত না, আমাকে দেখতে আসত না। আজ আর আমি একা নই। আমার সঙ্গে আছে অনেক ভালো মনের মানুষ।
আমি আমার পাঠশালার লেখাপড়ার পাশাপাশি শিশুদের শেখাই শরীরচর্চা, খেলাধুলা, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বড়দের সম্মান করা, রাস্তায় ঠিকভাবে চলা ও ছবি আঁকা। প্রতি মাসের শেষে তাদের মূল্যায়ন পরীক্ষা নিই। পরীক্ষার খরচ আমি নিজেই বহন করি।
আমার পাঠশালার ছাত্রছাত্রীরা খুব ভালো ও ভদ্র। তারা আমার খুব প্রিয়। সারা জীবন সমাজের ও দেশের জন্য ভালো কাজ করতে চাই। এ জন্য চাই সবার সহযোগিতা।
অনুলিখিত
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






