গ্রামের দরিদ্র মানুষের একটি অনন্য সাফল্য

ড. এডরিক বেকার | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পের সামনে ড. এডরিক বেকার

স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পের সামনে ড. এডরিক বেকার

ছবি: কামনাশীষ শেখর

প্রতিটি দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যেই থাকে ব্যাপক বৈচিত্র্য। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের মানুষ সম্পর্কে আমার ধারণা হলো, এরা সংবেদনশীল, রসবোধসম্পন্ন ও সহূদয়। আবার খুব সহজেই বিরোধে জড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশে বন্ধুত্ব ও সহূদয়তার অনেক অভিজ্ঞতা আছে আমার। কম জনবসতির দেশ নিউজিল্যান্ডের মানুষ বলে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলই আমাকে বেশি টানে। এ দেশের গ্রামের মানুষের সঙ্গেই তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সম্পর্কটা বেশি পোক্ত।
বাংলাদেশ খুবই সুন্দর একটি দেশ। তবে এখানকার নাগরিক জীবন খুবই কঠিন। আমি এ দেশের পরিবেশদূষণের বিষয়টি নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন, যা এখন পল্লি অঞ্চলেও থাবা বিস্তার করছে। আমার আন্তরিক বিশ্বাস, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি নির্মূল করা গেলে বাংলাদেশ আরেকটি সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান বা হংকং হতে পারে। তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি যতই হোক, ন্যায়বিচার ও দরিদ্র জনগণের প্রয়োজনের প্রতি নজর না দিলে দরিদ্রদের জীবনযাত্রা কঠিনই থাকবে।
১. বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছুদিন আগে জাতিসংঘে তাঁর ভাষণে বিশ্ব নেতাদের প্রতি শান্তি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সবার সমর্থন ও প্রশংসা কুড়ান। শেখ হাসিনার বক্তব্য বিশ্বের সর্বজনীন মঙ্গল ও সংহতির প্রতি বাংলাদেশের গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাই তুলে ধরে। এখানেই নিহিত এ দেশের শক্তি।
কিন্তু বাংলাদেশের অসাধারণ জাতীয় উন্নতি সত্ত্বেও (শিশু ও প্রসূতিমৃত্যুর হার কমানোসহ) বলা হয়, দেশটির ৩০ শতাংশ মানুষ এখনো দরিদ্র। তার মানে হলো, এই ৩০ শতাংশ মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো ঠিকমতো পূরণ করতে পারে না। এসব চাহিদার একটি হলো স্বাস্থ্যসেবা।

২. টাঙ্গাইল জেলার উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামে স্থানীয় মানুষ একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প গড়ে তুলেছে। মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি দূর করতে এই প্রকল্পে যা যা করা হচ্ছে তা হলো:
ক. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা।
খ. স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রতি জোরালোভাবে গুরুত্ব দেওয়া।
গ. সাধারণ রোগের জন্য কম মূল্যের একটি প্রমিত চিকিৎসাকৌশল গড়ে তোলা।
ঘ. অপ্রয়োজনীয়/ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধ এড়ানো।
ঙ. চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য গ্রামের সাধারণ মানুষকে প্যারামেডিক ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া। একে বলা যায় দরিদ্রদের দিয়ে দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা।
চ. সরকার ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা।
ছ. বাইরের তহবিল সংগ্রহ।

৩. এই প্রকল্পে চমকপ্রদ ফল পাওয়া গেছে। গত বছর সেখানে বহির্বিভাগে ৩৩ হাজার রোগীকে সেবা দেওয়া হয়েছে, ২১ হাজার মানুষ স্বাস্থ্যশিক্ষা পেয়েছে, ১২ হাজার ডায়াবেটিসের রোগীকে সহায়তা করা হয়েছে এবং এক হাজার ১০০ রোগীকে ভর্তি করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিয়মিত বাড়ি গিয়ে এক হাজার শিশু ও ৩৭০ জন সন্তানসম্ভবা নারীকে সেবা দেওয়া হয়েছে, যক্ষ্মায় আক্রান্ত ৭০ জন রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে এবং ৬০ জন রোগীকে শল্যচিকিৎসার জন্য উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। দেওয়া হয়েছে ৮৮ জন কর্মীর বেতন। এত কিছু করতে মাত্র এক কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ওষুধ কেনা এবং ভর্তি হওয়া রোগী ও তাঁদের দেখাশোনা করতে সঙ্গে থাকা লোকজনের খাওয়ার খরচও রয়েছে এর মধ্যে।
এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবার জন্য অতি প্রয়োজনীয় বিষয় হলো রোগী ও সমাজের কল্যাণের প্রতি অঙ্গীকার, স্বচ্ছতা, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা। এই প্রকল্প প্রমাণ করেছে প্রস্তুতি, নেতৃত্ব ও একটি কাঠামো থাকলে সাধারণত নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত সাধারণ মানুষও অতি সামান্য আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অন্যের সেবায় সময় ও শ্রম দিতে প্রস্তুত। শেখ হাসিনা জাতিসংঘে বাংলাদেশের মানুষের যে অন্তর্নিহিত শক্তির কথা তুলে ধরেছেন এ সাফল্য তারই প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের লোকেরাও যে মানুষকে সাহায্য করতে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে, এমনকি কখনো একত্রে প্রার্থনাও করতে পারে, তারও বিস্ময়কর প্রমাণ দেখেছি আমরা।

৪. বলা হয় শেখ হাসিনা শান্তির সন্ধানে ব্যাপৃত। এ জন্য বৈষম্য দূর করতে সঠিক পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। প্রয়োজন অন্যের সমস্যা সম্পর্কে ভালোভাবে জানা এবং অঙ্গীকারবদ্ধ যথাযথ পদক্ষেপও। শেখ হাসিনা যা বলেছেন বাংলাদেশের মানুষের হূদয়-মনে যে তারই প্রতিধ্বনি তা আমাদের স্বাস্থ্য কর্মসূচির কর্মীদের আত্মনিবেদিত অঙ্গীকার থেকেই স্পষ্ট। গণমাধ্যমে আমাদের কথা প্রচারের পর যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি তাও এর একটি প্রমাণ। বাংলাদেশের মানুষের এই অসাধারণ সহানুভূতির প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমাদের স্বাস্থ্যসেবা কৌশলের দুটি দুর্বলতা আছে—
ক. বাইরের আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা।
খ. কর্মীদের সহায়তা দিতে এক বা দুজন আবাসিক চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা।
আমরা এই উভয় ক্ষেত্রে সহায়তা কামনা করছি।
জানি, চিকিৎসকদের বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করার আহ্বান জানাচ্ছি আমরা। কিন্তু এ ধরনের আত্মত্যাগই তো মানব জীবন, প্রচেষ্টা ও সমাজের প্রাণ। এমন প্রচেষ্টা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
৫. আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের মানুষ জাতি-ধর্মনির্বিশেষে পরস্পর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। আর তাই সম্প্রতি কক্সবাজার এলাকার নিরীহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলা আমাদের ব্যথিত করে। আমরা এ ব্যাপারে বিনীতভাবে এই পরামর্শগুলো দিতে চাই:
ক. সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তি ও কল্যাণের প্রতি অঙ্গীকার ঘোষণা।
খ. হতবিহ্বল গ্রামবাসীর সুস্পষ্ট ও কার্যকর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
গ. এটা মেনে নেওয়া যে একটি ধর্মের প্রকৃত অবমাননা ধর্মে অবিশ্বাসী কিছু লোকের হঠকারী আচরণ থেকেই হয় না, বরং ধর্মবিশ্বাসীদেরই অধার্মিক আচরণ ও সহিংসতা তার জন্য দায়ী।
ঘ. দুর্ভাগ্যের শিকার রোহিঙ্গাদের বর্তমান দুঃখজনক পরিস্থিতিতে তাদের সহায়তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। এর জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সরকারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রয়োজন। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের জাতীয়তার বিষয়টি নির্ধারণ করতে প্রসঙ্গটি কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তোলা যেতে পারে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার অধিকার নিয়ে যেমনটা হয়েছে। এরপর রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও সমঝোতার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ।

৬. সবশেষে প্রথম আলোর কর্মী ও বাংলাদেশের জনগণের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরা সবার কল্যাণসাধন, দুর্নীতি নির্মূল এবং বিচারব্যবস্থাকে সত্যিকারের স্বাধীন ও ন্যায়পরায়ণ করে তোলার জন্য সব রাজনৈতিক দলের প্রতি পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের অঙ্গীকারের আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ, আমাদের সবার ঈশ্বর একটিই, যিনি কিনা চির করুণাময় ও পরম ক্ষমাশীল। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের চিরন্তন মুক্তিই তাঁর কামনা।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
 ড. এডরিক বেকার: নিউজিল্যান্ডের নাগরিক। ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশে কাজ করছেন। টাঙ্গাইলের কাইলাকুরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন