বাংলাদেশের সীমানাঘেঁষা একটি আদিবাসী অঞ্চলে তাঁর বাস। ছিলেন পল্লিচিকিৎসক। কিন্তু অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকা স্থানীয় মানুষের ছেলেমেয়েদের জন্য গড়ে তুলেছিলেন বিদ্যালয়, চালচুলোহীন বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়ে এখন টিনের চাল, পাকা দেয়াল। গত বছর ১৬ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তাঁর কাছেই শোনা যাক এই অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প

‘কানাই ডাক্তার’ থেকে ‘কানাই মাস্টার’

কানাই চন্দ্র দাস | তারিখ: ২৪-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
নিজের স্কুলে পড়াচ্ছেন কানাই চন্দ্র দাস

নিজের স্কুলে পড়াচ্ছেন কানাই চন্দ্র দাস

ছবি: প্রথম আলো

চারপাশে ছোট-বড় টিলা বা ডাইংঘেরা বরেন্দ্রভূমির গহিনে ‘কোল’ আদিবাসীদের গ্রাম বাবুডাইং। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমানাঘেঁষা রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নে এই গ্রামের অবস্থান। ৭৫-৮০টি পরিবারের মধ্যে দু-একজন ছাড়া সবাই খেতমজুর।
২০০৭ সালের গোড়ার কথা। এ গ্রামে তখন কোনো শৌচাগার ছিল না। অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকত। কালাজ্বরে আক্রান্ত রোগী ছিল কয়েকজন। এর আগে এ রোগে কয়েকজন মারাও গেছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যেত না কেউ। জীবিকার তাগিদে বরেন্দ্রভূমির লাল মাটির উঁচু-নিচু এবড়োখেবড়ো রাস্তায় বাইসাইকেল চালিয়ে সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে পল্লিচিকিৎসক হিসেবে আমিই সেখানে চিকিৎসা দিতে যেতাম। দিনে দিনে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমিই হয়ে উঠলাম একমাত্র ভরসা। গ্রামে তখন সবাই আমাকে ডাকতে শুরু করে ‘কানাই ডাক্তার’ নামে। এতটা পথ সাইকেল চালিয়ে গ্রামে ঢোকার পথে আমি কোনো গাছের ছায়ায় বসে জিরাই, তারপর গ্রামে ঢুকি। কিছুদিন পর দেখি গাছের ছায়ায় জিরানোর সময় গ্রামের শিশুর দল, বিশেষ করে মেয়েশিশুরা আমার চারপাশ ঘিরে বসে। এ গল্প সে গল্প করে। রোদে-তাপে ক্লান্ত শরীরে আমারও সময় কাটে। মাঝেমধ্যে আমি ওদের জন্য লজেন্স নিয়ে যাই। ওদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ওদের কাছ থেকেই আমি খবর পেয়ে যাই কোন বাড়িতে কার অসুখ। ওদের সঙ্গে নিয়েই এবাড়ি-ওবাড়ি ঘুরি।
একদিন সাইকেল ঠেলে গ্রামের সীমানা পার হচ্ছিলাম। পেছনে শিশুর দল। নিজেকে তখন মনে হচ্ছিল হ্যামিলনের বংশীবাদক। হঠাৎ গ্রামের দিবাস কোলের মেয়ে চন্দনী (১০) বলে উঠল, ‘ডাক্তার কাকা, আপনি তো লেখাপড়া জানেন, হামরাকে লেখাপড়া শেখাবেন?’ চন্দনীর পড়তে চাওয়ার আকুতি মনে লাগে আমার। চন্দনীর পাশে তখন সজলী (১২), পারভীন (১০), পাবর্চি (১২), বিলিস (৮) ও আরও কয়েকজন। পড়তে চাওয়ার আকুতি তাদেরও চোখে-মুখে। এ দৃশ্য দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের দিকে সাইকেল ঘোরাই। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি মদন কোলের বাড়িতেই আছে কেবল একটি অতিরিক্ত বেড়াহীন ছোট চালাঘর। সেদিনই সেখানে খেজুর পাতার ছেঁড়া পাটি বিছিয়ে শুরু করি ওদের লেখাপড়া। উদ্বোধনী দিনে চন্দনী-সজলীরা কয়েকটি বর্ণ পরিচয়ের বই নিয়ে এসে বসল নিঃসংকোচেই। কেউ আনল পেনসিল ছাড়াই স্লেট। প্রথম দিন শুধু কিচিরমিচিরই হলো। সেদিন তেমন পাঠ না দিয়ে আমি ওদের বললাম অন্য কথা, ‘যত দিন তোমাদের লেখাপড়ার আগ্রহ থাকবে আর আমি যত দিন সুস্থ থাকব, তত দিনই চলবে তোমাদের পড়ালেখা। এর বিনিময়ে তোমাদের মা-বাবাকে কিছুই দিতে হবে না।’
পরদিন থেকে নিজের পয়সায় চক-পেনসিল কিনে ওদের পাঠ দিতে শুরু করলাম। সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন দুই-তিন ঘণ্টা করে চলতে থাকল আমার পাঠশালা। এর মধ্যেই চন্দনী, পার্বতী ও পারভীন শিখে ফেলল ছোট ছোট যোগ-বিয়োগ। ছোট ছোট শব্দ লেখা। শিখল নিজেদের নাম লেখা। এগুলো শিখেই ওদের আনন্দের আর সীমা নেই। রোগা-পটকা, অপুষ্টিতে ভোগা কালো আদিবাসী শিশুদের চোখে-মুখে আলোর ঝিলিক। ওদের আনন্দ আমাকেও উদ্বেলিত করল। কিছুদিন পর দেখি তিন কেজি খেসারি ও দেড় কেজি গম নিয়ে হাজির এক অভিভাবক। আমি কিছুতেই নিতে চাইলাম না দেখে বলল, ‘হামরা কাঙাল মানুষ, এটাই দুই-তিন বাড়ি থ্যাক্যা চ্যাহা লিয়া এ্যাসাছি। গুরুদক্ষিণা না দিলে কি চলে? না লিলে মনে বড় কষ্ট পাব।’ তার এ কথা শুনে তাৎক্ষণিক কী যে আনন্দ পাই! তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দারুণ অনুপ্রাণিত বোধ করি। মনে প্রতিজ্ঞা জন্ম হয়, এ হতভাগ্য শিশুদের পাঠ দেওয়া আমাকে চালিয়ে যেতেই হবে। আমি ওই অভিভাবককে বললাম, ‘আমাকে এর পর থেকে কিছু দিতে হবে না। তার থেকে বরং চাঁদা তুলে একটি চালাঘর তোলার ব্যবস্থা করো, যেখানে আমার পাঠশালাটা চলতে পারে।’ কেননা তত দিনে মদন কোল তার চালাঘরটি গোয়ালঘরে পরিণত করেছে। আর আমার পাঠশালার ঠাঁই হয়েছে দরিদ্র খেতমজুর ফাগুয়া কোলের একচালা রান্নাঘরের মেঝেয়। ফাগুয়ার স্ত্রীর রান্না শেষ হওয়ার পরই বসে পাঠশালা। পাঠশালা যেখানেই বসুক, তত দিনে গ্রামের মানুষের কাছে আমার ‘কানাই ডাক্তার’ পরিচয় ছাপিয়ে নতুন পরিচয় হয়েছে ‘কানাই মাস্টার’ হিসেবে। তখন গ্রামের বেশির ভাগ লোকই আমাকে ডাকতে শুরু করেছে নতুন নামে। এই পরিচয়ে আমি গর্ব অনুভব করি।
এ সময় একদিন ফাগুয়া কোলের রান্নাঘরের মেঝেতে শিশুদের পাঠদানের সময় আমি ধরা পড়ি প্রথম আলোর ক্যামেরায়। কথা হয় প্রথম আলোর স্থানীয় প্রতিনিধির সঙ্গে। এ নিয়ে ২০০৭ সালের ৪ মে ‘তিনি আজ কানাই মাস্টার’ শিরোনামে প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঢাকা থেকে প্রথম আলোর এক হূদয়বান পাঠক (পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক) প্রথম আলোর প্রতিনিধিকে নিয়ে বাবুডাইং গ্রাম পরিদর্শন করেন। এ গ্রামের হতদরিদ্র মানুষ ও তাদের শিশুদের সরকারি সুবিধা ও শিক্ষাবঞ্চনার কথা জেনে ব্যথিত হন তিনি। প্রথম পরিদর্শনে এসেই পাঠশালার জন্য ঘর ও আমার মাসোহারার ব্যবস্থা করার জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে যান। মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ-কঞ্চির বেড়ায় মাটি লেপে, ওপরে ঢেউটিনের দোচালা দিয়ে ঘর ওঠে গ্রামের প্রান্তে সরকারি খাসজমিতে। স্থায়ী ঠিকানা পায় আদিবাসী শিশুদের পাঠশালা।
৩০ জন শিশু নিয়ে প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু হয় পাঠশালা। শিক্ষক কেবল আমি একজন। যখন ওই শিশুরা দ্বিতীয় শ্রেণীতে ওঠে তখন যোগ হয় আরও একজন শিক্ষক। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০০৮ সালে প্রথম আলোর অর্থায়নে বিদ্যালয়ে ওঠে মাটির দেয়ালের ওপর ঢেউটিনের আরেকটি ঘর। প্রথম আলো দুজন শিক্ষকের জন্য অল্প কিছু সহায়তা দিতে শুরু করে। এখন এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক চারজন।
বিদ্যালয়কে ঘিরে পর্যায়ক্রমে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, সরস্বতী পূজা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে থাকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। আর এসব অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে গ্রামের সব বয়সী নারী-পুরুষ অংশ নিতে থাকে। তারা এসব অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের হারিয়ে যেতে বসা আদিবাসী নাচ-গান করে আনন্দে মাতোয়ারা হয়। বিদ্যালয়কে ঘিরেই গ্রামবাসী মিলিত হতে পারে। গ্রামবাসীর নিস্তরঙ্গ জীবনে আনন্দের ঢেউ তুলতে সক্ষম হয় এই ছোট্ট বিদ্যালয়।
এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় প্রথম আলোয়। এলাকার জনপ্রতিনিধিদের চোখে পড়ে এ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। কয়েক দফায় পাওয়া যায় টেস্ট রিলিফের চাল। তা দিয়ে নির্মাণ করা হয় বিদ্যালয়ের আরও একটি শ্রেণীকক্ষ ও একটি অসমাপ্ত অফিসকক্ষ। পাওয়া যায় আলমিরা ও ১৫ সেট বেঞ্চ।
২০১১ সালে এ বিদ্যালয়ের ১৬ জন শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়। সবাই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়। ওই ১৬ জনই ভর্তি হয় সাত-আট কিলোমিটার দূরের উচ্চবিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের পোশাক পরে ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরা যখন বেণি দুলিয়ে মেঠোপথ বেয়ে দূরের উচ্চবিদ্যালয়ে যায়, তখন এ দৃশ্য দেখে চোখ জুড়ায় যেমন আমার, তেমনি গ্রামবাসীরও। এ দৃশ্য এ গ্রামের মানুষের কাছে একেবারেই নতুন। কেননা মাত্র একজন ছাড়া এ গ্রাম থেকে কেউ কখনো দূরের উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তে যায়নি। এ বছর বিদ্যালয়ে ১৩ জন শিক্ষার্থী সমাপনী পরীক্ষা দেবে এবং সবাই ভালোভাবে উত্তীর্ণ হবে বলেই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। দিনে দিনে উচ্চবিদ্যালয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মিছিল বড় হবে। একদিন এরাই বদলে দেবে এ গ্রামের আর্থসামাজিক অবস্থা।
 অনুলিখিত

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন