বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনা দেখেছি
পথশিশুদের সঙ্গে ব্রাদার লুসিও বেনিনাতি
ছবি: হাসান রাজা
বাংলাদেশে এসেছি প্রায় ১৩ বছর আগে। সে সময় এসেই এক অদ্ভুত অবস্থার মুখোমুখি হলাম। দেখলাম, অনেক শিশু রাস্তার বাসিন্দা। তারা রাস্তায় ঘুমায়। তারা বিভিন্ন জিনিস রাস্তায় ফেরি করে। ভিক্ষা করে। তাদের জীবনে নিরাপত্তা, শিক্ষা, বাসস্থান ও পরিবারের স্নেহ নেই। বেশ অস্বস্তি হলো। মনটা কেঁদে উঠল। মনে হলো, এই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু একটা করা দরকার।
২০০৭ সালের শেষের দিকে অর্পা কুজুর, প্রদীপ রায়, রেজাউল করিমসহ আমরা সাতজন পথশিশুদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী কাজ করা শুরু করলাম। সংগঠনটির নাম দিলাম ‘পথশিশু সেবা সংগঠন’। আমরা কোনো দাতা সংস্থার সাহায্য নিই না। নিজেরা যে যা পারি, তাই দিয়ে শিশুদের সেবা করি। সামর্থ্যবানদের কাছে সাহায্য চাই। তাঁরাও আমাদের কথায় আশাতীত সাড়া দেন। বিভিন্ন দোকান, কোম্পানি, চিকিৎসক, পুলিশ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিও আমাদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন।
আমরা মূলত ‘স্ট্রিট এডুকেটর’ হিসেবে কাজ করি। এই কাজের অংশ হিসেবে আমরা শিশুদের সঙ্গে খেলা করি। পথশিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিই। অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান করি। যাদের পরিবার আছে, তাদের পরিবারে বসবাসের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ ও সাহায্য দেওয়ার চেষ্টা করি। আর যাদের অবস্থা সত্যিই অনেক করুণ, যারা নেশাগ্রস্ত, তাদের আমরা পুনর্বাসনকেন্দ্র বা আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। এসব কাজের মাধ্যমে আমরা সত্যিকার অর্থেই যা করতে চাই, সেটা হচ্ছে, মানুষের মধ্যে মানবতাবোধ জাগাতে চাই। ভালোবাসা জাগাতে চাই। শিশুদের অধিকার পূরণ করতে চেষ্টা করি। তাদের ভালোবাসার চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করি। সেই সঙ্গে শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসটা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করি।
আমরা সপ্তাহে সাত দিনই এই কাজ করে থাকি। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় যেমন রাস্তা, ফুটপাত, রেলস্টেশন, মার্কেট, সিগন্যাল পয়েন্ট, উদ্যান থেকে পথশিশুদের নিয়ে এসে আমরা একটি জায়গায় জড়ো করি। সেখানেই তাদের সঙ্গে খেলাধুলা করি ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবা দিই। সত্যি বলতে কি, তাদের সঙ্গে যখন মেমোরি গেম, ফ্রিজবি, দড়ি লাফানো, ড্রয়িং ইত্যাদি খেলা করি, তখন বুঝতে পারি তাদের জীবনে অনেক কিছুই অপূর্ণ রয়ে গেছে। ধীরে ধীরে এই পথশিশুরা আমাদের বিশ্বাস করতে শুরু করে। তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। তারা স্নেহের পরশ পেতে শুরু করে। তারা নিজেদের জীবনের গল্প বলতে শুরু করে। নানা ধরনের কষ্ট আর সংকটের গল্প। আমরা তাদের সংকট দূর করতে চেষ্টা করি। অনেক ক্ষেত্রে সেটাও সাধ্যের বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। তবু আমরা হাল ছাড়ি না। আমরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিবারে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। আমি একটা ছেলেকে চিনি। সে একদিন তার বাসার টেলিভিশন ভেঙে ফেলেছিল। ভয়ে সেদিনই সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। আজ প্রায় পাঁচ বছর ধরে সে পথে পথেই রয়েছে। আমরা তাকে সঙ্গে নিয়ে তার বাবা-মায়ের কাছে গেলাম। তাঁদের বোঝালাম। তাঁরাও তাঁদের ছেলেকে ফিরে পেলেন। এ রকম আরও অনেকের জীবনের নানা গল্প রয়েছে। অনেকেই রয়েছে, যারা অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশে নেশাগ্রস্ত হয়ে যায়। আমরা তাদের পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করি। আমাদের সংগঠন থেকে বর্তমানে ৩২টি শিশু বিভিন্ন পুনর্বাসনকেন্দ্রে রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, তারা অবশ্যই সুস্থ জীবনে ফিরে আসবে।
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার দেশ সেই সুদূর ইতালিতে, তুমি কেন এত দূরে এসে সেবায় নিয়োজিত হয়েছ! আমি তাদের বলি, সুখ আর দুঃখের বিপরীত অবস্থা আমার ভেতরে দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। সেটা আমার মধ্যে মানবতার জন্য কাজ করার চেতনা তৈরি করেছে। আমার চেতনা থেকেই আমি সেবা করার প্রেরণা পেয়েছি। আহ্বান পেয়েছি। আমার অনুপ্রেরণার মূলে আমার যিশু। যিশু মানুষকে সেবা করার আহ্বান জানিয়ে গেছেন। আমি মিশনারি। আমার কাজই মানবতার সেবা করা। বাংলাদেশে আসার আগে আমি ব্রাজিল, আইভরি কোস্ট, ভারতেও সেবা করতে গিয়েছি। সেসব দেশে আমার বিচিত্র ধরনের অভিজ্ঞতাও হয়েছে। কিন্তু সব দেশেই আমার মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—মানুষের সেবা করা, মানুষকে ভালোবাসা।
বাংলাদেশে কাজ করতে এসে আমি একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি। বাংলাদেশের মানুষ মূলত অনুভূতিপ্রবণ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষই সমাজের জন্য কিছু করতে চায়। এ দেশের মানুষ নিশ্চুপভাবে ভালোবাসতে চায়। তারা তাদের অনুদান-অবদানকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে। এ দেশের মানুষ আর্তদের জন্য সেবা করতে ভালোবাসে। আমি এ দেশের মানুষের অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। এ জন্যই বাংলাদেশের মধ্যে আমি অনেক সম্ভাবনা দেখেছি।
বাংলাদেশে আসার আগেই জানতাম, এ দেশের মানুষের ভাষা বাংলা। আর এখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হলে আমাকে বাংলাটা শিখতেই হবে—এই চিন্তা থেকে আমি বাংলাদেশে এসেই একটি ভাষা প্রশিক্ষণ সেন্টারে ভর্তি হয়ে গেলাম। প্রায় আট মাস লেগেছে আমার বাংলা ভাষা শিখতে। এখনো শিখছি। এখন মোটামুটি বাংলা বলতে পারি। বাংলা কবিতা পড়ি মাঝেমধ্যে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকেও আমি অনুপ্রেরণা পাই।
আমি বেশ অবাক হয়েই লক্ষ করছি, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আগে সরকার একা স্লোগান দিত—ঘুষ খারাপ। এখন সমাজের প্রতিটি মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন। এটা বাংলাদেশের আশার দিক। বাংলাদেশে ডিজিটালাইজেশন হচ্ছে, এটাকেও আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আমি চাই, এ দেশের গরিবেরাও যাতে কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে। হয়তো অচিরেই সে আশাও পূরণ হয়ে যাবে। এ দেশে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। এটাও আশার কথা। গার্মেন্টস সেক্টরে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, এটা বাংলাদেশের জন্য একটা সম্ভাবনার দিক।
বাংলাদেশেরই একজন আমাকে বলেছিল, এ দেশের মানুষ একেকজন একেকটা দ্বীপের বাসিন্দা। কারও সঙ্গে কারও যোগাযোগ নেই। আমার মধ্যেও এই ধারণাটা কিছুদিন ছিল। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখলাম, কথাটা মোটেই সত্য নয়। অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারপর ধারণাটা আরও পাল্টে গেল ২০০৯ সালে। সে বছর প্রথম আলোর ছুটির দিনে ম্যাগাজিনে আমাদের সংগঠনকে নিয়ে একটি ফিচার ছাপা হয়। তার পরই আমি অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। অনেকেই সে সময় মনি অর্ডার পাঠিয়ে দেয়, তাদের আমরা চিনি না। শুধু প্রথম আলো পড়েই মানুষের মধ্যে এই জাগরণ ঘটেছে। এটা আমাকে সত্যিই অবাক করেছে। তখন আমার মনে হয়েছে, প্রথম আলো দ্বীপ নয়, প্রথম আলো মানুষের মধ্যে একতা সৃষ্টি করার দায়িত্ব পালন করে। প্রথম আলোর ‘বদলে যাও বদলে দাও’ স্লোগান আমাকে সব সময়ই অনুপ্রেরণা দেয়। অদম্য মেধাবীদের জন্য প্রথম আলোর যে শিক্ষাবৃত্তি, সেটাও গরিবদের শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে আসার জন্য পাথেয়র ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া সমাজের বিভিন্ন আলোকিত দিকে প্রথম আলো অবদান রাখছে। এটাও চোখে পড়ার মতো। প্রথম আলো সমাজকে বদলে দিতে যেভাবে এগিয়ে এসেছে, অন্যদেরও এ রকম কাজে অংশ নেওয়া দরকার।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
ব্রাদার লুসিও বেনিনাতি: ইতালির নাগরিক। সেবাকাজে নিবেদিত। ১৩ বছর ধরে বাংলাদেশে কাজ করছেন। ‘পথশিশু সেবা সংগঠন’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এর আগে ব্রাজিল, আইভরি কোস্ট ও ভারতে কাজ করেছেন
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






