মা-বাবা চেয়েছিলেন শিক্ষাদীক্ষায় বড় হবেন। কিন্তু খেলাধুলাই বুঝি ছিল তাঁর নিয়তিনির্দিষ্ট বিধান। খেলাপাগল এই মানুষটি বিভিন্ন স্কুলের ছেলেমেয়েদের অ্যাথলেটিকস প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নড়াইলের লোহাগড়াসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক পান। নিজের কথা বলেছেন তিনি
আমার ছেলেমেয়েরা একদিন অলিম্পিকে অংশ নেবে
মেয়েদের ক্রীড়া প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন দিলীপ চক্রবর্তী
ছবি: মারুফ সামদানি
লক্ষ্যহীন জীবন উত্তাল সাগরে মাঝিবিহীন নৌকার মতো। লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ধারায় যারা উঠতে পারেনি, তারাই নিজের জন্য, সমাজের জন্য ও দেশের জন্য বোঝা হয়ে আছে। কোনো কোনো মানুষের ঘটনাক্রমে লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। তেমনই ঘটেছিল আমার জীবনে। আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি; কিন্তু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারাটাই ছিল আমার জীবনে অন্যকে প্রতিষ্ঠিত করার সোপান। আর এখন অন্যকে তৈরি করে নিজে তৃপ্ত হচ্ছি। অন্যকে তৈরি বা প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়েই এখন আসছে আমার পরিচিতি। আমার সাফল্য।
জীবনের এই ৫১ বছর বয়সসীমায় এসে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় শনিবারের বিশেষ প্রতিবেদনে গত ১৫ সেপ্টেম্বর আমাকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে যাদের তৈরি বা প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে হাল ধরেছিলাম; এখন মনে হচ্ছে, তাদেরও ছাপিয়ে গেছি আমি। আমি প্রতিষ্ঠা পেয়েছি। অন্যের সাফল্যের ক্ষেত্র তৈরি করার মাঝে যে আনন্দ, তৃপ্তি, তা-ই যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। অন্যদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের চাওয়া-পাওয়া ছিল না। এখনো নেই। এখন দেখছি, না চেয়েই অনেক পেয়েছি।
ঘটনার শুরু শিশুকালেই। তখন থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। বুঝতে শেখার পর থেকেই খেলার মাঠ খোঁজার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার অভিভাবকেরা চেয়েছিলেন, শিক্ষাদীক্ষায় বড় হব। কিন্তু সেদিকে মন না থাকার বিষয়টি সে সময়ই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁরা। তখন, বিশেষ করে বাবা হিমাংশু চক্রবর্তী নিজেই আমাকে খেলার মাঠে নিয়ে যেতেন। এতে বাধা দেননি মা হিমালয়া চক্রবর্তী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় খেলার মাঠে যেতাম নিত্যদিন। খেলার প্রতিযোগিতা শুরু করি পঞ্চম শ্রেণী থেকে। বিজয়ীও হয়েছি। থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কৃতিত্ব অর্জন করেছি।
বিভাগীয় পর্যায়ে বিজয়ী হয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম অংশ নিই শীতকালীন অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায়, ১৯৮২ সালে। তখন নড়াইলের লোহাগড়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে পারিনি। একই ঘটনা পরের বছরও। আর তখনই মনের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। উপলব্ধি আসে, সাফল্য পেতে দরকার যথাযথ প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ ছাড়া নিজের চেষ্টায় বিভাগীয় পর্যায়ে বিজয়ী হয়েছি। জাতীয় পর্যায়ে হতে পারিনি। এ জন্য প্রশিক্ষণের অভাব সব সময় নিজেকে তাড়া করে ফিরত। খেলাধুলার আগ্রহ, তাই মাঠ ছাড়িনি। পড়ার টেবিলেও বসতে ইচ্ছা হয় না। এসএসসি পাস করি। কলেজে ভর্তি হলেও লেখাপড়া আর হয়নি। দিনের অধিকাংশ সময়ই কাটত ফুটবলের সঙ্গে। সঙ্গে অ্যাথলেটিকসও। তখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি পাই।
খেলে বেড়াই দেশের বিভিন্ন জেলায়, বিভিন্ন দলের হয়ে। তাতে টাকাপয়সাও আসতে থাকে। বিভিন্ন জেলায় গিয়ে খেলার মজাটাও ছিল অন্য রকম। আর বিভিন্ন স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিকেলে অ্যাথলেটিকসসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করি। এ ক্ষেত্রে নিজের প্রশিক্ষণের অভাবটা উপলব্ধিতে আসে। স্বেচ্ছাশ্রমে চালিয়ে যাই ছাত্রছাত্রীদের প্রশিক্ষণ। লক্ষ্য থাকে এদের জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী করার।
তেমনটিই হয়। লোহাগড়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র নাঈম মুসল্লী ১৯৯১ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় উচ্চ লাফে স্বর্ণপদক পায়। পরের বছর একই প্রতিযোগিতায় এ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র বিষ্ণুপদ সরকার দীর্ঘ লাফে স্বর্ণপদক পায়। এ পর্যায়ে ভবিষ্যতের কথা ভেবে একটি এনজিওতে চাকরি নিই। কর্মস্থল ছিল লোহাগড়াতেই। চাকরির কারণে ছেলেমেয়েদের সেভাবে সময় দিতে পারিনি। তবে খেলার মাঠের নেশা দূর করতে পারিনি।
ভাবতে থাকি নিজে যা পারিনি, সেই অর্জন আমার দেওয়া প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে হতে পারে। এরই মধ্যে ডাক পড়ে লোহাগড়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে। এ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক শক্তিপদ সরকার, সিনিয়র শিক্ষক মোল্লা মনিরুজ্জামান ও এস এম হায়াতুজ্জামান তখনকার প্রধান শিক্ষক মুন্সী মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে প্রস্তাব দেন আমাকে দিয়ে স্কুলের ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ দেওয়ানোর জন্য। রাজি হন প্রধান শিক্ষক।
২০০২ সালের কথা। প্রধান শিক্ষক আমাকে কাজ শুরু করতে বলেন। আমি লক্ষ্য ঠিক করি, লোহাগড়ার ছেলেমেয়েদের জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিজয়ী করে আনব। শুরু করি নিবিড় প্রশিক্ষণ। ওই বছরই জাতীয় শীতকালীন অ্যাথলেটিকসে স্বর্ণপদক পায় বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। পরের বছর স্বর্ণপদক আসে চারটি। এর পরের বছর ২০০৪ সালে আমাকে স্কুলের খণ্ডকালীন ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন এনজিও থেকে ইস্তফা দিই। ২০০৪ সালে চারটি ও ২০০৫ সালে পাঁচটি স্বর্ণপদক পায় এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ২০০৬ সালে বিকেএসপিতে এক মাসের অ্যাথলেটিকসের ওপর কোসেস কোর্স করি। ২০০৬ সালে এ বিদ্যালয় মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে জাতীয় শীতকালীন অ্যাথলেটিকসে চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ২০০৮ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত পর পর পাঁচবার জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসছে বিদ্যালয়টি। এ বিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষা বোর্ড পর্যায়ে যশোর শিক্ষা বোর্ড এবং বিভাগীয় পর্যায়ে খুলনা বিভাগ দেশে চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে প্রতিবছর।
অ্যাথলেটিকস ছাড়াও এ বিদ্যালয়ে ছাত্র ও ছাত্রী উভয় বিভাগে ক্রিকেট, হকি, ফুটবল, হ্যান্ডবল ও ভলিবল দল আছে। এর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিই আমি। আমাকে সহযোগিতা করেন বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক মোহাসিন আলী ও শিক্ষক সুজিৎ সিংহ। গত মাসে আমার লোহাগড়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী পদ্মাবতী সমাদ্দার অনূর্ধ্ব-১৯ বাংলাদেশ দলের হয়ে মালয়েশিয়ায় ফুটবল খেলে এসেছে। মহিলা হকিতে জেলা দলের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলছে এ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। ১০ জন শিক্ষার্থী ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনে (বিজেএমসি) নিয়োগ পেয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন খেলায় প্রতিযোগিতা করছে। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীতে খেলোয়াড় হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে আমাদের বেশ কয়েকজন ছেলে। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন দিকের বিভিন্ন অর্জন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রত্যন্ত অঞ্চলের এ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আগ্রহী করে তুলতে পেরেছি। জাতীয় পর্যায়ে এ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরাই বেশি কৃতিত্ব দেখাচ্ছে। বর্তমান ৩০ জন ছাত্রী ও ২২ জন ছাত্র নিয়মিত অনুশীলন করছে। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত এ অনুশীলন হয়। বিদ্যালয় চত্বর ও খেলার মাঠে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় শনিবারের বিশেষ প্রতিবেদনে আমি শিরোনাম হই ‘সব অর্জন দিলীপ স্যারের জন্য’। এরপর প্রতিক্রিয়া হয় বিভিন্ন মহলে। প্রতিবেদন যেদিন ছাপা হয়, সেদিন ছিলাম খুলনা জেলা স্কুল মাঠে নিজেদের ছেলেমেয়েদের বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার লড়াইয়ে। এখানে হ্যান্ডবলে আমার মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন হয়। ফুটবলে হয় রানার্সআপ। পরদিন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রথম আলোয় প্রতিবেদন ছাপা হওয়ায় বিভাগীয় কমিশনার এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালকের উদ্যোগে দেওয়া হয় কৃতী ক্রীড়া শিক্ষকের পুরস্কার। প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় আমার বন্ধুমহল ও লোহাগড়া ক্লাব সংগঠিত হয়ে ৩০ হাজার টাকার ক্রীড়াসামগ্রী কিনে দিয়েছে। এ ছাড়া মাছরাঙা টেলিভিশন সরাসরি সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে। বিটিভিতেও প্রচারের জন্য সাক্ষাৎকার নিয়েছে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগ বিভিন্নভাবে উৎসাহ দিচ্ছে। অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ নিতে ঝুঁকে পড়ছে। তাদের বঞ্চিত করছি না।
এখন উৎসাহ আরও বেড়ে গেছে। এখন লক্ষ্য আমার ছেলেমেয়েদের দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করা। সাফ গেমসে অংশ নেওয়া। আন্তর্জাতিক অলিম্পিকে অংশ নেওয়া। তবে সীমাবদ্ধতা আছে। বিদ্যালয়ে নেই জিমনেসিয়াম। বিদ্যালয়ের খেলার মাঠটি উপযুক্ত নয়। রয়েছে খেলার সামগ্রীর অভাব। এগুলোর সমাধান দরকার। নিজ বিদ্যালয়ের খেলার ইভেন্টের পরিসর বৃদ্ধি করতে চলেছি। খেলায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছি। ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ বাড়ছে।
এদিকে অন্য বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা আগ্রহ দেখাতে আমার কাছে আসছে। সে জন্য পরিকল্পনা নিয়েছি, উপেজলার প্রতিটি বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষকদের নিয়ে উদ্বুদ্ধকরণ সভা করব। যাতে ক্রীড়া শিক্ষকেরা পাঠ্য বিষয়ের ক্লাস দুপুরের পরে না নেন। প্রতিদিন বিকেলে নিয়মিতভাবে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অনুশীলন করান। তবে এ পরিকল্পনায় সাড়া দিতে হবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদকে।
সর্বোপরি বলতে চাই, নিয়মিত নিবিড় অনুশীলনের মাধ্যমেই সফল হওয়া সম্ভব। খেলাধুলা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আছি। এটা আমার পেশা নয়, নেশা। আমার পরিবার ত্যাগ স্বীকার না করলে এটা সম্ভব ছিল না। বাবা নেই। মা হিমালয়া চক্রবর্তী (৭৫) আগের মতো এখনো বাধা দেন না এসব কর্মকাণ্ডে। স্ত্রী রানী বালা মজুমদার লোহাগড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। তিনিও উৎসাহ দিচ্ছেন। ছেলে রৌদ্রদীপ চক্রবর্তী সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। সে এখন বাবার গর্বে গর্বিত। ছোট ছেলে সৌহার্দ্য চক্রবর্তী (৭)। দুই ছেলেই নিয়মিত খেলার মাঠে আসে। হয়তো বা আমার দুই সন্তানও পড়ার টেবিল ছেড়ে আসবে খেলার মাঠে।
অনুলিখিত
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






