বাংলাদেশে তিন যুগ
তেরেস ব্লঁশে
ছবি: প্রথম আলো
মানুষের সমাজে মেয়েদের জায়গা নিয়ে আমার আগ্রহ ও মনোযোগ আমার সারা জীবনের চিন্তা ও গবেষণাকর্মের একটি প্রধান সূত্র। আজ থেকে ৩৪ বছর আগে ১৯৭৮ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসি এই দেশের মানুষের জন্ম-রীতিনীতি নিয়ে গবেষণা করার উদ্দেশ্যে। মনে পড়ে, ঢাকার ছোট্ট বিমানবন্দরটিতে ছিল অনেক ভিড়। কিন্তু শহরের রাস্তাঘাটে মোটরযানের সংখ্যা ছিল বেশ কম, তবে রিকশা ছিল প্রচুর। রাস্তাঘাটে মেয়েদের দেখাও পাওয়া যেত বেশ কম, বাজারগুলোতেও তাঁদের দেখা তেমন মিলত না। সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল নিউমার্কেট।
কিন্তু রাজধানী ঢাকায় আমি বেশিদিন থাকিনি। মাস তিনেক ধরে একটু-আধটু বাংলা শেখার পর চলে যাই জামালপুর জেলার একটি গ্রামে। গামারিয়া নামের সেই গ্রামটিই হয়ে ওঠে আমার নতুন নিবাস; সেখানেই কিছু সময়ের জন্য আমার বাংলাদেশের ‘বাড়ি’।
প্রথম গবেষণা শেষ করার পরও আমার গামারিয়া যাওয়া-আসা বন্ধ হয়নি। গ্রামটি ছিল আমার কাছে একটি জানালার মতো, ওই জানালা দিয়ে আমি যেন তাকিয়ে দেখতাম সারা বাংলাদেশের দিকে, বোঝার চেষ্টা করতাম এ দেশের গ্রামীণ সমাজে নিরন্তর ঘটমান পরিবর্তনগুলো। আজ মেয়েরা বিদ্যালয়ে ও কলেজে যাচ্ছে; নারীরা অর্থনীতির মূলধারায় আরও বেশি করে যুক্ত হচ্ছেন। অল্পবয়সী মেয়েরা তৈরি পোশাকশিল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কাজ করতে গ্রাম থেকে ঢাকা যাচ্ছে। আমার প্রথম দেখা বাংলাদেশের সমাজের চেহারাটি এভাবে গত তিন দশকে অনেকখানিই বদলে গেছে। এ কথা সবাই জানে, এই পরিবর্তনগুলো এতটাই ইতিবাচক হয়েছে যে এসবের ফলে নারীর দিগন্ত প্রসারিত হয়েছে, তাদের উপার্জনের সুযোগ ও সম্ভাবনা বিস্তৃত হয়েছে। এসব ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নারী স্বল্প মাত্রায় হলেও স্বকীয়তা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করেছে। বলা যায়, নারীর জীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিময় হয়েছে। কিন্তু এর জন্য তাকে মূল্যও দিতে হয়েছে। যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন এখনো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এসবের ফলে কিশোরী-তরুণীদের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং এই অজুহাতে তাদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়। যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন এড়াতে অনেক মেয়ে চলাফেরা সীমিত করতে বাধ্য হয়, এমনকি অনেক মেয়ের বিদ্যালয়ে যাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশে আসার আগে এই সমাজ সম্পর্কে আমার যে ধারণা ছিল, এ দেশে এসে জামালপুরের গামারিয়া গ্রামে দুই বছর কাটানোর পর আমি বুঝতে পারি এই সমাজ আমার ধারণার থেকে অনেক বেশি জটিল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ, যাকে বুঝতে পারা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবুও গামারিয়ায় আমি যেসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই, তা আমার মনে গভীর ছাপ ফেলে। গ্রামটির অবয়ব, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গাগল নদ, যে নদকে প্রথম বছরেই দেখেছিলাম অনেক জমি আর ঘরবাড়ি গ্রাস করতে; এই দেশের ঋতুবৈচিত্র্য, ধানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গ্রামীণ সংস্কৃতি, আত্মীয়-স্বজন-জ্ঞাতি-গোষ্ঠীনির্ভর সামাজিক ব্যবস্থা; এ দেশের মানুষের দর্শন ও অন্যান্য চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় শুধু বাংলা ভাষায়, যার অতি সামান্যই আমি বুঝতে পারতাম। কিন্তু তাতেই আমার মনের যে জানালা খুলে গিয়েছিল, সেই জানালায় তাকিয়ে আমি আভাস পেয়েছিলাম বাঙালির সংস্কৃতি কত সমৃদ্ধ, কত বৈচিত্র্যময়। বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি হিন্দু যে অভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বয়ে চলেছে, তাতে বিভাজনের চেয়ে বড় হয়ে আমার চোখে ধরা পড়েছিল মিলন, তাদের মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে বেশি সাদৃশ্য; তারা একে অপরের থেকে যতটা ভিন্ন, তার থেকে বেশি অভিন্ন। আমার প্রথম বইয়ে ‘বাঙালি’ ও ‘বাংলাদেশি’ দুটো শব্দই ব্যবহার করেছি; গ্রামের যেসব নারী ছিলেন আমার শিক্ষকের মতো তাঁরা এই দুটো কথার পার্থক্য আমার কাছে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করেননি। ওই গ্রামের প্রায় ৮৩ শতাংশ মানুষই ছিলেন নিরক্ষর, কিন্তু আমার মনে হয়, তাঁরা অজ্ঞ বা মূর্খ ছিলেন না।
এ দেশে আসার পর পরই গ্রামে চলে যাওয়া ও দীর্ঘ দুই বছর গ্রামেই কাটানোর ফলে বাংলা ভাষার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে বই-খাতার বাইরে, সরাসরি মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মধ্য দিয়ে। তাই কাগজে-কলমে বাংলা ভাষা শেখার প্রয়োজন বা উৎসাহ তখন বোধ করিনি। পরে প্রয়োজনটা অনুভব করলেও শেখা আর হয়ে ওঠেনি। তাই বাংলা সাহিত্য পাঠের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি ভেবে খারাপ লাগে। লেখক-সাহিত্যিক বন্ধুদের সঙ্গে গল্প-আড্ডা ও যৎসামান্য ইংরেজি অনুবাদে বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে যেটুকু জেনেছি, তাতে মনে হয়েছে এ সাহিত্য বিষয়-বৈচিত্র্য ও আত্ম-উন্মোচনে ভরপুর, যা আমাদের তথাকথিত উন্নয়নবিষয়ক লেখালেখি ও আলোচনা থেকে একেবারেই ভিন্ন রকম। উন্নয়নবিষয়ক লেখালেখিকে আমার অত্যন্ত অগভীর বলে মনে হয়, পরিমাপ-পরিসংখ্যানে ভরা ওই সব গবেষণা-লেখালেখির লক্ষ্য থাকে একটি দেশকে তার পশ্চাৎপদতার পরিমাপে তুলে ধরা।
মানুষের মুখে কথ্য বাংলা শুনে শুনে বাংলা শেখার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন স্থানে, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে একই কথার ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনা বোঝার চেষ্টা করেছি। আমি যে বাংলা বলি, একজন শিক্ষিত নগরবাসী মানুষের কাছে তা হয়তো মার্জিত মনে হবে না। কিন্তু এ ভাষাতেই আমার দিব্যি কাজ চলেছে এবং চলছে। বাংলা আমার মাতৃভাষা নয় বলে এই ভাষায় ব্যবহূত বিভিন্ন শব্দের অর্থ-প্রেক্ষিত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাওয়ার দিকে আমাকে সব সময়ই লক্ষ রাখতে হয়েছে। একটি প্রত্যন্ত গ্রামে শিশুজন্মের সঙ্গে জড়িত লৌকিক রীতিনীতি, সংস্কার, বিশ্বাস অথবা কোনো পতিতাপল্লিতে নারীর জীবন-জীবিকা বা ছিন্নমূল পথশিশুদের বেঁচে থাকার নানা কলাকৌশল নিয়ে নিবিড় গবেষণায় লিপ্ত থাকার সময় ব্যবহারিক বাংলা বোঝা আমার জন্য অনেক সহায়ক হয়েছে। ‘খারাপ’ ভাষা শুদ্ধ করার ইচ্ছা আমার কখনো হয়নি। যারা ওই সব তথাকথিত ‘মূর্খ’ মানুষদের ভাষা শুদ্ধ করে দিতে চায়, তাদের বিরোধিতা করার মতো মনের জোরও আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে।
সামাজিক নৃতত্ত্ববিদ হিসেবে আমি আমার কর্মজীবনে আকৃষ্ট হয়েছি বঞ্চিত, পীড়িত, প্রান্তিক মানুষদের প্রতি: পতিতালয়ের নারীরা, পথশিশুরা এবং পরের দিকে কাজ ও জীবিকার সন্ধানে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া নারীরা। সাধারণভাবে এসব নারীকে ‘মানব পাচারের শিকার’ বলে মনে করা হয়, তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থাটাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না। কেউ কেউ তাঁদের নষ্ট বা বিপথগামী মেয়ে বলেও মনে করে, পরিবার ও সমাজের জন্য তাঁদের অবদান স্বীকৃতি পায় না; তাঁদের যেন ভিন্ন একটা শ্রেণীতে ফেলে দেওয়া হয়। পুরুষদের বিদেশ যাওয়া আর মেয়েদের বিদেশ যাওয়াকে যে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়, তাতে বাস্তব সত্য বিকৃত হয়ে যায়। অনেক পুরুষও পাচারের শিকার হয়, নানা রকম নিপীড়নের শিকার হয়, কিন্তু সেটা প্রায় স্বীকার করাই হয় না।
প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই দেশে বাস করছি, কাজ করছি। যেন এক সম্পূর্ণ জীবন। ইউরোপ-আমেরিকা থেকে যে তরুণ-যুবা গবেষকেরা এ দেশে আসেন, আমি তাঁদের জন্মেরও আগে থেকে এ দেশের মাটিতে আছি। তবু আমাকে আজও ‘বিদেশি’ বলা হয়। কিন্তু এই শব্দটি আমার কাছে দুর্ভার লাগে, এই ভার সইতে আমার কষ্ট হয়। প্রান্তিক মানুষজন আর বিতর্কিত নানা বিষয় নিয়ে সারা জীবন ধরে গবেষণা করে আসছি বলেই কি বাংলাদেশের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আজও ঠিক স্থির হলো না? বোঝা গেল না যে আমি আপন না পর? কিন্তু কে বাংলাদেশের সমাজের আপন মানুষ? কে কথা বলতে পারে এই সমাজের হয়ে, এই সমাজের নামে? শহুরে সুবিধাভোগী একটা শ্রেণী যখন দাবি করে যে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার কেবল তাদেরই আছে, তখন আমার জটিল লাগে, বেশ গোলমেলে বোধ হয়।
কিন্তু আপন মানে কী? কীভাবে আপন হওয়া যায়?
ইংরেজি থেকে অনূদিত
তেরেস ব্লঁশে: কানাডীয় বংশোদ্ভূত সামাজিক নৃতত্ত্ববিদ ও গবেষক। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং তখন থেকেই এ দেশে কর্মরত আছেন। বঞ্চিত, পীড়িত, প্রান্তিক মানুষ, পতিতালয়ের নারী, পথশিশু এবং কাজ ও জীবিকার সন্ধানে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া নারীদের নিয়ে তিনি কাজ করছেন। লস্ট ইনোসেন্স, স্টোলেন চাইল্ডহুড ও উইমেন, পলিউশন অ্যান্ড মারজিনালিটি: মিনিংস অ্যান্ড রিচুয়ালস অব বার্থ ইন রুরাল বাংলাদেশ তাঁর রচিত দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






