ছিলেন শিক্ষক। শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পুরস্কারও পেয়েছিলেন। শিক্ষকতা ছেড়ে শুরু করেন আদিবাসী বস্ত্র উন্নয়নের কাজ। প্রতিষ্ঠা করেন আদিবাসী বস্ত্রের প্রতিষ্ঠান ‘বেইন টেক্সটাইল’। তরতর করে পৌঁছে যান সাফল্যের দরজায়। পেয়েছেন ‘শিলু আবেদ পুরস্কার’ ও ডেইলি স্টার-ডিএইচএল-এর নারী উদ্যোক্তা পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। তাঁর কাছেই জানা যাক এই সফলতার ইতিবৃত্ত
আদিবাসী বস্ত্র এখন সমাদর পাচ্ছে
কাপড় বোনার নির্দেশনা দিচ্ছেন মঞ্জুলিকা চাকমা (বাঁয়ে)
ছবি: সুপ্রিয় চাকমা
আদিবাসী বস্ত্রের আধুনিকায়ন শুরু হয়েছিল বেশ আগে থেকে। তবে তা ছিল ধীরগতির। কিন্তু ২০০৫ সালে যখন প্রথম আলোতে ‘আদিবাসী বস্ত্রের সমতল জয়’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তখন সবার দৃষ্টি কাড়ে। ওই সময় দেশ-বিদেশ থেকে অনেকে আমাকে ফোন করেন। তাঁরা আদিবাসী বস্ত্রের আধুনিকায়নের নানা দিক জানতে পারেন। এরপর আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া আরও জোরদার হয়, প্রচার ও প্রসার লাভ করে দ্রুত।
চাহিদার কারণে বর্তমানে রাঙামাটি শহরের সিদ্ধিভবন, কাঁঠালতলী এলাকাসহ বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা শহরে বেশ কয়েকটি আদিবাসী বস্ত্রের বিপণিকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এমনকি ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আদিবাসী বস্ত্র বিক্রি হয়। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস আদিবাসী বস্ত্রে নানা ডিজাইনের পোশাক তৈরি করছে। আমাদের আদিবাসী প্রবাসীরা দেশে এলে অনেক কাপড় নিয়ে যান। অনেক সময় ই-মেইল অথবা ফোন করে তাঁদের চাহিদার কথা জানান। তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজেদের পোশাক পরে আদিবাসী ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
পার্বত্য তিন জেলায় বিভিন্ন আদিবাসী বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বর্তমানে সাত হাজারের বেশি মানুষ জড়িত বলে ধারণা করা যায়। তাঁদের ৯০ ভাগই নারী। এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রামে নিজেদের বাড়িতে কোমর-তাঁতে কাপড় তৈরি করেন আরও কয়েক হাজার নারী।
আমরা জানি, একসময় নানা সমস্যা ও বৈচিত্র্যের অভাবে আদিবাসী বস্ত্রের ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত। শুধু গ্রামীণ নারীরা পিনোন (নিচের অংশ) ও হাদি (ওড়না) হিসেবে এর ব্যবহার করতেন। পিনোনের রং ছিল কালো আর হাদির রং লাল। নির্দিষ্ট কিছু নকশায় এসব তৈরি হতো। সে কারণে শহরে-বন্দরে, বড় কোনো অনুষ্ঠানে এসব কাপড় পরা ছিল রীতিমতো অকল্পনীয়। তবে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে আমি দেখতাম, আমার মা পঞ্চলতা খীসা কোমর-তাঁতে তৈরি কাপড়ে টেবিল ও পর্দার কাপড়, নারীদের শাল প্রভৃতি তৈরি করে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে বিক্রি করতেন। ওই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে এসেছিলেন আবদুল করিম। তিনি আমার মায়ের তৈরি কাপড় দেখে মুগ্ধ হন। আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের বিকাশে তিনি উৎসাহ দেন।
মাকে দেখে আমি নিজেও আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের আধুনিকায়ন নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করি। এ শিল্প টিকিয়ে রাখার চিন্তাভাবনা শুরু করি। তখন পরীক্ষামূলকভাবে আদিবাসীদের কোমর-তাঁতের সঙ্গে আধুনিক তাঁতের মিশ্রণ ঘটিয়ে কাপড় বোনার প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করতে থাকি। তাতে আমি সফলতাও লাভ করি। দেখা গেল, সেই প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে অনেক বেশি কাপড় তৈরি করা সম্ভব হয়। এতে আদিবাসী বস্ত্রের বুননশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে মিহি সুতার কাপড় তৈরিও সহজ হয়। এভাবে আদিবাসী বস্ত্রের আধুনিকায়নে মাইলফলক সৃষ্টি হয়। সমাদর লাভ করতে শুরু করে আদিবাসী বস্ত্র।
আগে আদিবাসী বস্ত্রের সব কাজ হতো কোমর-তাঁতে। এতে ১০ কাউন্টের ওপরে সুতা হলে বুনতে কষ্ট হতো। ফলে কাপড় হতো খুবই মোটা। এখন আধুনিক তাঁতের সহযোগিতায় ৮০ কাউন্টের সুতাও ব্যবহার করা যায়। ফলে কোমর-তাঁতের বুননরীতি ঠিক রেখেই কাপড় তৈরি সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে একসঙ্গে ২০ থেকে ২৫টি কাপড়ও তৈরি করা যাচ্ছে। এতে হাতের বদলে পায়ের প্যাডেল ব্যবহূত হয় বলে কাজও সহজ হয়েছে। তবে ফুল, ফল, পাখি, প্রাকৃতিক দৃশ্য ইত্যাদি নকশা করা হয় হাতে কোমর-তাঁতে। হাত দিয়ে কাজ করতে হয় বলে কোমর-তাঁতে বুননে অনেক সময় নেয়।
আমার পেশাগত জীবন শুরু হয় শিক্ষকতা দিয়ে। রাঙামাটির শাহ বালক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। পরে পেশাগত দক্ষতা দেখিয়ে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতিও লাভ করি। এর পরও ১৯৭৬ সালে শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের উন্নয়নে মনোযোগ দিই। প্রতিষ্ঠা করি আদিবাসী বস্ত্রের প্রতিষ্ঠান ‘বেইন টেক্সটাইল’। আদিবাসী নারীরা বিভিন্ন মাপের বাঁশ দিয়ে কোমর-তাঁত বোনার যে সরঞ্জাম তৈরি করে, তা হলো ‘বেইন’। সেই বেইন থেকে নাম দিই বেইন টেক্সটাইল। এখন আমার এ প্রতিষ্ঠান পার্বত্য এলাকাসহ দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। অনেকে আমার প্রতিষ্ঠান থেকে কাজ শিখে নিজেরা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এভাবে আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের প্রসার ঘটেছে। আমি নিজে আদিবাসী বস্ত্র নিয়ে জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, থাইল্যান্ড, ভারত, ইতালিসহ বেশ কয়েকটি দেশে বিভিন্ন মেলায় অংশ নিয়েছি। আদিবাসী বস্ত্রের উন্নয়নে অবদান রাখা ও নারী উদ্যোক্তার স্বীকৃতি হিসেবে আমি ২০০১ সালে শিলু আবেদ পুরস্কার, ২০০৩ সালে ডেইলি স্টার-ডিএইচএল উইমেন্স এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেছি।
আদিবাসী বস্ত্রের চাহিদা আদিবাসী নারীদের স্বাবলম্বী করে ক্ষমতায়নে অবদান রাখছে। বস্ত্র তৈরিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামে গড়ে উঠেছে নারীদের সংগঠন। তেমন একটি সংগঠন রয়েছে রাঙামাটির শহরতলি রাঙাপানিতে। গত ৮ সেপ্টেম্বর রাঙাপানি কোমর-তাঁত মহিলা কল্যাণ সমিতির সদস্যদের কাছে গিয়ে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বৈশ্বিক নারীবিষয়ক বিশেষ দূত মেলান ভারভিয়্যর ও বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা। এ সময় মেলান ভারভিয়্যর আদিবাসী নারীদের কোমর-তাঁতে বোনা কাপড় দেখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আমি কোমর-তাঁতে ফুল বা বিভিন্ন নকশা তৈরির বুনন পদ্ধতি ‘আলাম’ এখনো সংগ্রহ ও সংরক্ষণের চেষ্টা করি। আমার বিশ্বাস, আদিবাসী বস্ত্রের ডিজাইন জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় পুরোনো বুননরীতি বা কোমর-তাঁতে তৈরি বস্ত্রের চাহিদাও বাড়ছে। তবে এসব কাপড়ের দাম তাঁতে বোনা কাপড়ের চেয়ে বেশি। তার পরও আদিবাসী বস্ত্রের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে আদিবাসী বস্ত্র যে সমাদর পাচ্ছে, তাতে আর এ শিল্পের বিলুপ্তির আশঙ্কা নেই। এ শিল্প টিকে থাকলে দেশের বৈচিত্র্যও রক্ষিত হবে।
আদিবাসী বস্ত্রের চাহিদা বেড়েছে, তা সত্যি। কিন্তু আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের প্রসারে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি। সরকারের এদিকে দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
অনুলিখিত
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






