১০ বছর বয়স থেকে গাছ লাগানো শুরু করেন। জীবনভর গাছ লাগাচ্ছেন এবং অন্যদের গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তাঁর বসতভূমির ধু-ধু বালুচরে এখন সবুজের সমারোহ। চিরসবুজ সেই মানুষটি বলেছেন তাঁর জীবনকথা
গাছ লাগানো অনেক পুণ্যের কাজ
-
গাছের সান্নিধ্যে
-
কার্তিক পরামানিক: গাছের সঙ্গেই সখ্য
ছবি: প্রথম আলো
আগে বাড়ি ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের রাধাকান্তপুর গ্রামে। আত্মীয়স্বজন গ্রাম থেকে ভারত পাড়ি দিলে আমরা একা হয়ে পড়ি। বাবা তখন আমাদের নিয়ে আসেন মনাকষা ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে। এটা পাকিস্তান হওয়ার দুই-তিন বছর পরের কথা। আমার বয়স তখন মাত্র নয় বছর।
কিন্তু নতুন জায়গায় এসে কিছুই ভালো লাগে না। চারদিকে ধু ধু বালুচর। নেই গাছপালা। ঝড়-বাতাসে চোখে-মুখে ধুলা-বালুতে ভরে যায়। বাজার-হাট করতে মনাকষা যেতে হয়। ১২-১৩ কিলোমিটার রাস্তা। পায়ে জুতা-স্যান্ডেল নেই, মাথায় নেই ছাতা। রাস্তার গরম ধুলায় পায়ে ফোসকা পড়ার মতো অবস্থা। মাথার গামছা পায়ে দিয়ে একটু আরাম পাওয়ার চেষ্টা করি। বাবাকে কেঁদে কেঁদে বলি, ‘বাবা, কোন দেশে নিয়ে এলে। চলো, অন্য জায়গায় চলে যাই।’ বাবা সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘দুঃখ করিস না বাবা, দেখবি কেউ একজন ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে। গাছ লাগাবে, ওর দেখাদেখি তখন আরও কেউ গাছ লাগাবে। দেশ গাছে গাছে ভরে যাবে। গাছ লাগানো অনেক পুণ্যের কাজ। কী হবে গয়া-কাশি গিয়ে? তার থেকে বেশি পুণ্য হবে গাছ লাগালে।’ বাবার এ কথা আমার কচি মনে গেঁথে যায়। মনে মনে বলি, আমিই দাঁড়াব গাছ লাগানোর জন্য।
একদিন মা আমাকে নিয়ে কাকার বাড়ি বেড়াতে যান। গিয়ে দেখি, এক পাকুড়গাছের তলায় বীজ পড়ে চারা গজিয়েছে। সেখান থেকে চারা নিয়ে আসি। লাগাই শ্যামপুর গ্রামের তিন রাস্তার মোড়ে। তখন আমার বয়স ১০ বছর। সেই আমার গাছ লাগানো শুরু। ওই চারাগাছই এখন এলাকার বড় গাছের একটি। গাছের বয়স ৬২ বছর। অনেক কষ্ট করে গাছটিকে যত্ন করি, রক্ষা করি ঝড়-বৃষ্টি থেকে। যেন ছোট গাছটা ভেঙে না পড়ে। এ জন্য কখনো-সখনো ভিজতে ভিজতে গাছটি ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছি।
গাছটি কিছুটা বড় হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় প্রতিবছর আমার গাছ লাগানো। গ্রামের রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, ঈদগাহ-গোরস্থান, বিডিআর (বতর্মানে বিজিবি) সীমান্ত ফাঁড়ি কোনো স্থানই বাদ যায়নি। হাট-বাজারে নাপিতের কাজ করি। সেই উপার্জনের টাকা দিয়ে গড়ে তুলি নার্সারি। গাছে ঠেকা দেওয়ার জন্য কিনি বাঁশ। গাছ লাগানোর সময় মজুর লাগাই। মানুষজন আমাকে পাগল বলে। ঠাট্টা-মশকরা করে বলে, গরিবের ঘোড়ারোগ ধরেছে। আরও বলে, বছর বছর গাঁটের পয়সা খরচ করে গাছ লাগিয়ে তোমার কী লাভ? মনে মনে বলি, ইহকালে লাভ না হোক পরকালে তো হবে। মানুষ যদি দোয়া না করে তো কি। পাখ-পাখালি তো করবে। তারা বট-পাকুড়-জামগাছে বসবে। ফল খাবে। তাদের জন্যও তো গাছ দরকার। বছর বছর গাছ লাগাতে লাগাতে এলাকার ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাছে গাছে ভরে যায়। আমরা দেখি লোকে এখন বাড়ির ফাঁকা জায়গায়ও গাছ লাগায়। অনেক দিন আগে থেকেই এলাকা সবুজে ভরে গেছে। একদিন এখানে যে ধু ধু বালুর চর ছিল, তা বোঝাই যায় না।
গাছ লাগানো শুরুর ৫৩ বছর পর প্রথম আলো আমাকে আবিষ্কার করে। ২০০৩ সালের ২ নভেম্বর আমাকে নিয়ে খবর প্রকাশ করে। প্রথম পাতায় খবরের শিরোনাম ছিল, ‘বিরাট বিরাট বৃক্ষ যেন একেকটি কার্তিকনামা’। খবর প্রকাশের পর আমাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বন্ধুসভা প্রথম সংবর্ধনা দেয়। এরপর রাজশাহী সিটি মেয়র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিডিআর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক। গাছ লাগানোর জন্য আমি জাতীয় পুরস্কার পাই। ২০০৭ সালে চ্যানেল আই আমাকে কৃষি পদক দেয়। ঢাকায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠান করে। সেখানে মেজর জেনারেল (অব.) আনোয়ারুল ইকবালসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরও কয়েকজন উপদেষ্টা ছিলেন। অনুষ্ঠানে পদক দেওয়ার পর উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবাল জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমাদের কাছে আপনার আর চাওয়া-পাওয়া কী?’ আমি বলেছিলাম, আমার ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। শিবগঞ্জের মনাকষার রানীনগর থেকে গ্রাম তারাপুর ঠুটাপাড়া যেতে রাস্তাটা কাঁচা। মানুষজনের খুব কষ্ট হয়। বর্ষাকালে কষ্টের সীমা থাকে না। জনপ্রতিনিধিরা বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেন, কিন্তু রাস্তা করে দেন না। আমি শুধু রাস্তাটা চাই। রাস্তাটা হলে এলাকার মানুষ আমার জন্য অনেক দোয়া করবে। আমার এ কথা বলার পর হলভর্তি মানুষ করতালিতে ফেটে পড়েন। আমার চোখে জল এসে যায়। আনোয়ারুল ইকবাল আমার অনুরোধ মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। দুটি সাঁকোসহ আট কিলোমিটার রাস্তার আশ্বাস পেয়ে তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি মনে হয়।
২০১০ সালের মধ্যেই আমার গ্রাম পর্যন্ত রাস্তাটি পাকা করে দেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কিন্তু একটি ৪০ ফুট ও একটি ১২ ফুট লম্বা সাঁকো এখনো নির্মাণ করা হয়নি। সাঁকো দুটির জন্য মানুষকে এখনো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রাস্তাটা পাকা হওয়ায় এলাকার লোকজন আমাকে খুব সম্মান করেন। কাছে ডেকে কৃতজ্ঞতা জানান। প্রশাসনের লোকজনও আমাকে সম্মান করেন। আমার কথা রাখেন। এলাকার লোকজন কোনো সমস্যায় পড়লে আমার কাছে ছুটে আসেন। আমি স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলি। মানুষের উপকার করতে পেরে আনন্দ পাই।
আগে মনে হতো, গাছ লাগানোর ফল পরকালেই পাব। কিন্তু প্রথম আলোয় সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর আমার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তার ফল এ জীবনেই পেতে শুরু করি। প্রথম আলোর ১০ বছর পূর্তিতে আমার ছবিসহ বড় বড় সাইনবোর্ড ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে লাগায় তারা। ঢাকায় কর্মরত এলাকার লোকজন এসে আমাকে জানান সে কথা। আমি নিজে গিয়ে দেখে আসি। আনন্দে-গর্বে আমার বুক ভরে যায়। এ জীবনে এত সম্মান আর এত ভালোবাসা পাব কখনো ভাবিনি। যদিও সম্মান বা কোনো কিছু পাওয়ার আশায় গাছ লাগাইনি। পথক্লান্ত পথিক, পাখপাখালিকে একটু শান্তি দিতে ও এলাকার ধু ধু পরিবেশ দূর করতেই গাছ লাগিয়েছি। এই শরীর যত দিন চলবে, গাছ লাগানোও তত দিন চলবে।
সবার কাছে আমার আবেদন, বেশি বেশি গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান। না হলে আমরা ভালোভাবে বাঁচতে পারব না। পাখপাখালিও বাঁচতে পারবে না। এ ছাড়া, গাছই তো জীবন।
অনুলিখিত
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






