পরিবেশ: এসব সংকটকে মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাচ্ছেন পরিবেশকর্মীরা
বুড়িগঙ্গা মরুক এটাই কি ওরা চায়?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
পরিবেশ সুরক্ষার আন্দোলন এখন বাংলাদেশে বেশ সুপরিচিত। নিকট অতীতে এর বিস্তৃতিও ঘটেছে বেশ সুসংহতভাবে। এর মূল কারণ কেবল যে আন্দোলনের ভেতরকার শক্তি, তা-ই নয়, বরং পরিবেশ বিপর্যয়ের যে ভয়াবহ চিত্র প্রতিদিন জনসমক্ষে আসছে তার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তনের বা প্রথম আলোর ভাষায় বদলে দেওয়ার প্রয়োজনেই এ আন্দোলন গতিশীল হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এ দেশের প্রকৃতি ও মানুষ, যাদের অস্তিত্ব পরস্পর এতটাই নির্ভরশীল যে এতে কোনো সংযোগচ্যুতির অর্থ হবে দেশের জন্য চরম অনিষ্টকর। পরিবেশ আন্দোলন তাই এ দেশে দ্রুততার সঙ্গেই বিস্তার লাভ করছে এবং তা সাধারণ মানুষকেও কাছে টানতে সক্ষম হচ্ছে। আন্দোলনের সাফল্য নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতেই পারে, তবে এ কথা সত্য যে সাধারণ কৃষক বা জেলে থেকে শুরু করে এমনকি রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা পর্যন্ত সবাই এখন পরিবেশ সমুন্নত রাখার পক্ষে কথা বলছেন। এমনকি যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘকাল ধরে পরিবেশকে উপেক্ষা করে ব্যবসা করে এসেছে তারাও এখন নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ‘পরিবেশবান্ধব’ দাবি করতে তৎপর।
তবে কি দেশের পরিবেশ প্রশাসনে জনমুখী পরিবর্তন এসেছে? আমরা কি আমাদের বহুল আলোচিত পরিবেশদূষণের ক্ষেত্রগুলোতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের ধারা সূচনা করতে পেরেছি? এসব প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর নেই। এ কথা সত্য যে জনমতের চাপে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছে, তবে তার অর্থ এই নয় যে অগ্রগতির পথ অত্যন্ত মসৃণ বা স্বচ্ছ বা অগ্রগতির ধারা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের। বরং বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারের সার্বিক চেতনা এখনো বহুলাংশে একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট।
নদী রক্ষার কথাই ধরা যাক, সেই ১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ঢাকা শহরের চারপাশের নদীগুলোকে দখল ও দূষণ থেকে বাঁচাতে দাবি জানিয়ে আসছেন পরিবেশবাদীরা। প্রধান প্রধান গণমাধ্যমও এ বিষয়ে একধরনের প্রচারসংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এমনকি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত নদীগুলোকে দখলমুক্ত করতে স্পষ্ট ও সময়ভিত্তিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করতে সুপ্রিম কোর্ট হাজারীবাগ ট্যানারি স্থানান্তর ও ব্যর্থ হলে বন্ধের নির্দেশও দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে সরকারের নিদ্রাভঙ্গ হলেও রাজনৈতিক বিবেচনা এবং আমলাতন্ত্রের জটিলতায় নদীর সীমানা চিহ্নিতকরণ, দখলদার উচ্ছেদ কিংবা ট্যানারি স্থানান্তর—কোনোটির কার্যক্রমই আশানুরূপ গতি পায়নি। দখলদারদের রক্ষায় প্রশাসন যে কতটা তৎপর তা তুরাগ ও শীতলক্ষ্যার অঙ্কিত সীমানা থেকেই স্পষ্ট হয়ে পড়ে। উচ্ছেদ তো দূরে থাক, তুরাগের বুকে নির্মাণাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ শেষ করে প্রভাবশালীরা যেন নিজেদের অশুভ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতারই জানান দিচ্ছেন।
ট্যানারির মালিকেরা তো আরও এক ধাপ এগিয়ে নিজেদের শিল্পবর্জ্য পরিশোধনের দায় সরকার তথা জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দিয়েও ক্ষান্ত নন। সরকার জমি দিয়েছে, বর্জ্য শোধনাগার গড়ে দিতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, কিন্তু এবার চাই স্থানান্তরের ক্ষতিপূরণ! না দিলে হাজারীবাগ এলাকা ছাড়বেন না শিল্পপতিরা। আবার বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা আয় করলেও বর্জ্য শোধনের কোনো দায়িত্ব তাঁরা নেবেন না। ঢাকা শহরের মানুষের পানীয় জলের সম্ভাবনার আধার বুড়িগঙ্গা নদী মরে যাক, তবু পরিবেশ অধিদপ্তর হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকায় প্রবেশ করবে না। তবে কি অলিখিত কোনো আদেশ রয়েছে হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকাকে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতামুক্ত বিবেচনা করতে?
চলমান পরিবেশ আন্দোলনের কাছে এ প্রশ্নের যেমন কোনো স্পষ্ট জবাব নেই, তেমনি জানা নেই কেন আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও জাহাজভাঙা শিল্পে থামছে না মৃত্যুর মিছিল। কে করছে এসব মৃত্যুর তদন্ত আর কেইবা নিশ্চিত করছে শিল্পমালিকদের জবাবদিহিতা? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত না হয়ে উল্টো বরং বিকশিত হচ্ছে জীবন-সংহারক এ শিল্প। বেড়ে গিয়েছে জাহাজভাঙা ইয়ার্ড এবং আমদানিকৃত বিষাক্ত জাহাজের সংখ্যা। কঠোর নিরাপত্তার কারণে মৃত্যুর পর শ্রমিকদের লাশও এখন খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একই সরকারের দুই মন্ত্রণালয়ের দুই বিধিমালার বিপরীতধর্মিতার সুযোগে অবাধে চলছে জাহাজ আমদানি। এক দেশে, এক বিষয়ে, একই সরকারের দুই মন্ত্রণালয়ের দুই আইন! এমন বৈপরীত্য কার স্বার্থে এবং কিসের বিনিময়ে তা জানেন বলেই জাহাজভাঙা শিল্প মালিকেরা এত বেশি আত্মবিশ্বাসী। সরকার পাশে থাকলে আর আইন আদালতের ভয় কী?
এ বছর মর্মান্তিক যে ঘটনাটি দেশের মানুষের বিবেককে চরমভাবে নাড়া দিয়ে গিয়েছে এবং পরিবেশ প্রশাসনের দুর্বলতা ও অবহেলা স্পষ্ট করে জনসমক্ষে এনে দিয়েছে তা হলো, আবারও পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি। কোথায় নেই রাজনীতি? এমনকি পাহাড়ের গা কেটে বসতি স্থাপনে দীনহীন পরিবারের কাছে ভাড়া প্রদানেও বিস্তৃত আমাদের গণতন্ত্র ও রাজনীতি। পরিবেশবাদীদের তাই এ দেশে নীরব বসে থাকার উপায় নেই। বরং এ দেশে সবচেয়ে ব্যস্ত তো তাঁদেরই থাকার কথা!
রাজনীতির সঙ্গে, গণতন্ত্রের সঙ্গে, পরিবেশের ও পরিবেশগত অধিকারের সংযোগ ঘটাতে আকুল পরিবেশপ্রেমীরা। এবার তাঁরা বেশ বড় হোঁচট খেয়েছেন সরকারের কিছু জনবিচ্যুত আইন পাসের উদ্যোগে। এযাবৎকাল যে সংগ্রাম ছিল আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার, এ বছর তাতে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে বিতর্কিত নতুন বন্য প্রাণী আইন পাসে সরকারের উদ্যোগে। বনবাসী ও পরিবেশবাদীদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত এ আইন বেশ নাটকীয়ভাবে সংসদের শেষ অধিবেশনে পাস হয়ে যায়। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও বন, বন্য প্রাণী ও বনবাসীবিরুদ্ধ যে আইন অনুমোদন করাতে সফল হয়নি বন বিভাগ, এবার পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অসচেতনতার সুযোগে সে আইন পাস করাতে উদ্যত হলেন বন অধিদপ্তরের বহুল পরিচিত এবং বিতর্কিত আমলারা। সফলও হলেন বন বিষয়ে কোনো দায়িত্ব লিপিবদ্ধ না করিয়েই বনের ওপর নিজেদের অশুভ নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে। মাত্র তিন ধরনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থ বন বিভাগ এবার দেশবাসীকে মোট নয় ধরনের রক্ষিত এলাকা উপহার দিল! আর সহব্যবস্থাপনা নামক এক বিরল ব্যবস্থাপনার আলোকে সাধারণ জনগণের কাঁধে কুড়াল রেখে বন কাটার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো।
বন্য প্রাণী আইনের ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করার কিছুটা সুযোগ পেলেও একটি ক্ষেত্রে কিন্তু পরিবেশবাদীদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখতে সক্ষম হয়েছে বর্তমান সরকার। অবৈধ আবাসন প্রকল্পগুলো অনুমোদনে সরকার অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পাস করিয়েছে বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা, ২০০৪-এর কিছু সংশোধনী। আর এসব সংশোধনী পাসের মাত্র চার মাসের মাথায় অননুমোদিত আবাসন প্রকল্পগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বড় বেশ কিছু প্রকল্প অনুমোদন পেয়ে গেছে। বলাই বাহুল্য, প্রকল্পগুলোকে অনুমোদন দিতেই এসব সংশোধনী, জনস্বার্থকে রক্ষা করতে নয়, যা ২০০৪-এর বিধিমালার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল। ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ বলতে কী বোঝায়, জাতি তা এবার স্পষ্ট করে জানল।
পরিবেশ ব্যবস্থাপনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই এমন বৈপরীত্য এবং অসাধুতা দৃশ্যমান। আইন, আদালত এমনকি নির্বাচনী অঙ্গীকারও এখন হয়তো আর পাঠ করছেন না বর্তমানের শাসকেরা। ফলে সংকট থেকে উত্তরণ সহজ হচ্ছে না মোটেও।
আশার কথা এই যে এসব সংকটকে মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাচ্ছেন পরিবেশকর্মীরা। সোচ্চার রয়েছেন ভূমিদস্যুতা, জলাশয় ভরাট, বন উজাড়সহ সব পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এবং এসব নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা, উদাসীনতা ও অবহেলার বিরুদ্ধে। নগরকেন্দ্রিক ও সুশীল সমাজকেন্দ্রিক পরিবেশবাদ এখন যৌক্তিকভাবেই পৌঁছে গেছে গ্রামে-গঞ্জে। এমন কোনো দিন নেই যেদিন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকগুলো পরিবেশ বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করছে না। দেশের আইন ও আদালত এগিয়ে এসেছে মানুষের পরিবেশগত অধিকার রক্ষায় এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়, ন্যায্যতার স্বার্থে, সাম্যের স্বার্থে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে। এখন প্রয়োজন সহযোগী সব শক্তির মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং হিতকর উদ্যোগ গ্রহণে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: পরিবেশবিদ, ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে ভূষিত।
পাঠকের মন্তব্য
- আপনার মতামত দিন






