মা ও শিশু: মাতৃ, শিশু ও পুষ্টির ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য অনেক

শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমছে

মো. নজরুল ইসলাম | তারিখ: ২৩-১১-২০১২

  • ০ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • Share on Facebook
মো. নজরুল ইসলাম

মো. নজরুল ইসলাম

গত এক দশকে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। শিশুদের টিকাদানের হার ৯০ শতাংশের ওপরে, যা শিশুমৃত্যুর হার কমিয়েছে। এই সময়ে মাতৃমৃত্যুর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দেশের এ সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে, স্বীকৃতি মিলেছে। দেশের মানুষের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী পুরস্কারও গ্রহণ করেছেন।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিও সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে টিএফআর (মোট প্রজনন হার) ছিল ৬ দশমিক ৩। জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে টিএফআর কমতে থাকে। ২০১১ সালের বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস ২০১১) বলছে, টিএফআর এখন ২ দশমিক ৩। টিএফআর কমে যাওয়ার ফলে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও কমেছে।
সরকার ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করেছে। একটু বিলম্ব হলেও জনসংখ্যানীতি মন্ত্রিসভা পরিষদে পাস হয়েছে। এসবই ইতিবাচক লক্ষণ। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা। এই উদ্যোগ সফল হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য এই মডেল অন্য দেশের জন্যও অনুকরণীয় হবে। তবে স্বাস্থ্য খাতে প্রতিবন্ধকতা এখনো চোখে পড়ে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বৈষম্য। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ, গরিব-ধনী এবং শহর-গ্রামে বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করেন, সচেতনভাবে অগ্রসর না হলে এই বৈষম্য বাড়বে। নগর স্বাস্থ্যের দিকে সরকার নজর কম দিচ্ছে—এমন অভিযোগও পাওয়া যায়। দক্ষ জনবলের যে সংকট আছে তা পূরণের চেষ্টা করছে সরকার। এই চেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। তবে স্বাস্থ্যকর্মীরা, বিশেষ করে চিকিৎসকেরা, দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সেবার মান বাড়বে না, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার হবে না।

শিশুমৃত্যুর হার কমছে
জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, ডায়রিয়াজনিত রোগনিয়ন্ত্রণ এবং ভিটামিন এ বিতরণ কর্মসূচির কারণে দেশের শিশুদের বেঁচে থাকার হার ও সম্ভাবনা আগের চেয়ে বেড়েছে। বিডিএইচএস ২০১১ বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার এক হাজার জীবিত জন্মে ৫৩। ১৯৯১ সালে এই হার ছিল ১৪৬। পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, বাংলাদেশ শিশুমৃত্যু-সম্পর্কিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে সঠিক পথে আছে। ২০১৫ সালের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে ৪৮ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করলেও বাংলাদেশ নবজাতক মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে কোথায় যেন আটকে আছে। এক থেকে ২৮ দিন বয়সী হচ্ছে নবজাতক। ১৯৯৩ সালে নবজাতক মৃত্যুর হার ছিল ৫২। ১৯৯৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪৮-এ। ২০০৩ সালে ছিল ৪১ এবং ২০০৭ সালে ৩৭। আর বিডিএইচএস ২০১১ বলছে, বর্তমানে তা ৩২। অর্থাৎ গত দুই দশকে নবজাতক মৃত্যুর হার কমেছে ঠিকই, কিন্তু তা অত্যন্ত ধীরগতিতে। এর প্রধান কারণ বার্থ এক্সপেকসিয়া, সেপসিস। এসব সমস্যা সমাধানেরও পথের সন্ধান দেওয়া হয়েছে। আমাদের সবার উচিত সেই পথে সঠিকভাবে চলা।

কোনো মাতৃমৃত্যু কাম্য নয়
২০১০ সালের বাংলাদেশ মাতৃস্বাস্থ্য জরিপ বলছে, নয় বছরে মাতৃমৃত্যু কমেছে ৪০ শতাংশ। ২০০১ সালে এক লাখ জীবিত জন্মে ৩২২ জন মায়ের মৃত্যু হতো। ২০১০ সালে মাতৃমৃত্যুর হার কমে দাঁড়ায় ১৯৪। আশা করা হচ্ছে, মাতৃমৃত্যু-সম্পর্কিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ ঠিক পথে আছে। ২০১৫ সালে মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে ১৪৩ করার কথা।
মাতৃস্বাস্থ্য জরিপ বলছে, গর্ভধারণ জটিলতার কারণে মৃত্যু ও প্রসব-পরবর্তী মাতৃমৃত্যু আগের চেয়ে অনেক কমেছে। মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ রক্তক্ষরণ ও অ্যাকলাম্পশিয়া। এখন মাতৃমৃত্যুর অর্ধেকই হয় মূলত এই দুটি কারণে। গর্ভপাতজনিত মাতৃমৃত্যুও আগের চেয়ে কমেছে।
মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কম হয় যদি প্রসবের সময় প্রসূতির কাছে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন, আর প্রসব যদি হয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে (একে বলা হচ্ছে ইনস্টিটিউশনাল ডেলিভারি)। সরকার চেষ্টা করছে, একাধিক কর্মসূচিও আছে। এর ফলও পাওয়া যাচ্ছে। ২০১০ সালের পরিসংখ্যান বলছে, ২৭ শতাংশ প্রসবের সময় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর (চিকিৎসক, নার্স, ধাত্রী, প্যারামেডিক, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা, কমিউনিটি স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট) সহায়তা পাওয়া যায়। ১৯৯১ সালে এই হার ছিল মাত্র পাঁচ শতাংশ।
তবে এ ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগের বিষয়ও আছে। বর্তমানে ১৭ শতাংশ প্রসব হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। এর অর্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে যেসব প্রসব হচ্ছে, তার প্রতি পাঁচটির তিনটি হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। ধনিক শ্রেণী এবং শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার বেশি হচ্ছে।

সফল পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি
একটি সাধারণ কথা হচ্ছে, গর্ভধারণ কম হলে গর্ভধারণ জটিলতার কারণে মৃত্যু কম হবে। প্রসবকালীন মৃত্যু কম হবে। প্রসব-পরবর্তী মৃত্যু কম হবে। গর্ভপাতজনিত মৃত্যু কম হবে। অর্থাৎ মাতৃমৃত্যু কম হওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। মোট প্রজনন হার বা টিএফআর কমলে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি কমে। টিএফআর কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল দেশগুলোর একটি। ১৯৭৫ সালে টিএফআর ছিল ৬ দশমিক ৩। অর্থাৎ একজন মা ছয়টির বেশি সন্তানের জন্ম দিতেন। ১৯৯১ সালে কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩-তে। ২০০৪ সালে হয় ৩ এবং বর্তমানে ২ দশমিক ৩। এখন কোনো কোনো জেলায় একজন মা দুটির কম সন্তান জন্ম দিচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৯৭৫ সালে বিবাহিত মহিলাদের আট শতাংশ কোনো না কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী ব্যবহার করতেন। এখন (২০১১) সেই হার ৬১ শতাংশ। গত চার বছরে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার পাঁচ শতাংশ মান বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয় খাবার বড়ি (২৭ শতাংশ)। এরপর ইমপ্লান্ট (১১ শতাংশ)।
অভিযোগ শোনা যায়, পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা দৃশ্যমান নয়, অনেকে মনে করেন দুই দশক আগের চেয়ে কমে গেছে। এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন টিভি চ্যানেলগুলোকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতার কথাও বলা দরকার। কিছু মানুষের চাহিদা থাকলেও তাঁরা সময়মতো জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী পান না। এই ‘অপূর্ণ চাহিদা’ (আনমেট নিড) ১২ শতাংশ মহিলার মধ্যে। ২০০৭ সালে এটা ছিল ১৭ শতাংশ। ‘অপূর্ণ চাহিদা’ বর্তমানে যা আছে তা পূরণ করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

পুষ্টি নিয়ে বিভ্রান্তি
পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা। টিকাদানের হার বেড়েছে, শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, শালদুধ এবং ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ছে। এসব বলে দিচ্ছে দেশে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। অন্যদিকে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা, কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুর সংখ্যা দেশে অনেক বেশি। এসব ক্ষেত্রে আফ্রিকার কিছু দেশের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।
বিডিএইচএস ২০১১ বলছে, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪১ শতাংশের বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম (স্টানটিং)। ২০০৪ ও ২০০৭ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫১ ও ৪৩ শতাংশ। খর্বকায় শিশুর সংখ্যা কমছে, তবে অত্যন্ত ধীরগতিতে। উচ্চতার তুলনায় ওজন কম এমন শিশুদের ক্ষেত্রে কিছু সামঞ্জস্যহীন পরিস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০০৪ সালে উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের শিশু ছিল ১৫ শতাংশ। ২০০৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে তা ১৬ শতাংশ। গত চার বছরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ২০০৪ সালের তুলনায় তা খারাপ। এটা কেন হলো তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
গত চার বছরে শিশু পুষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জন্মের পর থেকে শিশুকে জীবনের প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ ছাড়া কিছুই খাওয়ানোর দরকার নেই, এমনকি পানিও না। এ ক্ষেত্রে মাকে বুকের দুধ খাওয়ানো শিখতে হবে। মা না পারলে তাঁকে শেখাতে হবে, সহায়তা করতে হবে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৭ সালে শুধু বুকের দুধ খাওয়া শিশু ছিল ৪৩ শতাংশ, বর্তমানে তা ৬৪ শতাংশ। এই ২১ শতাংশ মান বেড়ে যাওয়া খুবই বড় ঘটনা।
শিশু পুষ্টি প্রায় পুরোটাই নির্ভর করে মায়ের ওপর। তাই মায়ের অপুষ্টি দূর করা বা মায়ের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি। এই দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের। মাতৃ, শিশু ও পুষ্টির ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য অনেক। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিছু কিছু সমস্যাও দেখা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধানের পথগুলোও জানা আছে। এখন দরকার সমস্যা সমাধানে কার্যকর পন্থা ও উদ্যোগ, তা পৃথিবীর যে প্রান্তেরই হোক, নিজেদের মতো করে ব্যবহার করা।
অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম: সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

পাঠকের মন্তব্য

পাঠকদের নির্বাচিত মন্তব্য প্রতি সোমবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আপনার মতামত দিন